মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে প্রায় ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সৌদি আরবে হুথিদের হামলা এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে (ইউএই) তেল ছড়িয়ে পড়ার খবর নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। শুক্রবার লেনদেন শেষে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম প্রতি ব্যারেল ১১৬ ডলার ছাড়িয়ে যায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ব্রেন্ট তেলের দাম বেড়েছে ৩ শতাংশের বেশি
শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুডের ভবিষ্যৎ সরবরাহ চুক্তির দাম ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলার ৫৫ সেন্ট বা ৩ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়ে ১১৬ ডলার ৭২ সেন্টে স্থির হয়। ২৯ এপ্রিলের পর এটিই ব্রেন্টের সর্বোচ্চ সমাপনী দর।
যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেলের দামও ব্যারেলপ্রতি ৩ ডলার ৮০ সেন্ট বা ৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে ১০৩ ডলার ২৭ সেন্টে দাঁড়ায়। পুরো সপ্তাহের হিসাবে ব্রেন্টের দাম বেড়েছে ৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ডব্লিউটিআইয়ের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ৩ শতাংশ।
সৌদি আরবে হুথিদের হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এই অঞ্চলের তেল উৎপাদন ও সরবরাহপথে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা বাড়ছে। ইউএইতে তেল ছড়িয়ে পড়ার খবরও বাজারের উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে।
তেলের দরবৃদ্ধিতে জ্বালানি খাতের শেয়ার চাঙা
তেলের দাম বাড়ার প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে জ্বালানি খাতের সূচক শুক্রবার ২ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে সামগ্রিকভাবে প্রধান মার্কিন শেয়ারসূচকগুলো দিন শেষে নিম্নমুখী ছিল।
ডাও জোন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাভারেজ ৬৫২ দশমিক ৮২ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ২৩ শতাংশ কমে ৫২ হাজার ২১৫ দশমিক ১৬ পয়েন্টে নেমেছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক কমেছে ৩৯ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ৫২ শতাংশ। দিন শেষে সূচকটির অবস্থান ছিল ৭ হাজার ৬২৩ দশমিক ৬৮ পয়েন্টে। নাসডাক কম্পোজিট ৫৩ দশমিক ৫২ পয়েন্ট বা শূন্য দশমিক ২১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৯৫৫ দশমিক ৩৪ পয়েন্টে।
সপ্তাহের হিসাবে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কমেছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ এবং নাসডাক কমেছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। তবে ডাও জোন্স ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এ নিয়ে টানা তিন সপ্তাহ সূচকটির সাপ্তাহিক দরবৃদ্ধি অব্যাহত থাকল।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ
প্রযুক্তি খাতে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের সুফল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ব্যয়ের স্থায়িত্ব নিয়ে বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগও শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলেছে। বৃহস্পতিবার বড় ধরনের পতনের পর ফিলাডেলফিয়া সেমিকন্ডাক্টর সূচক শুক্রবার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০-এর প্রযুক্তি সূচকও একই হারে বেড়েছে।
তবে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর শেয়ারে মিশ্র প্রবণতা দেখা গেছে। মেটার শেয়ারদর ১ শতাংশ কমেছে, আর মাইক্রোসফটের বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। অ্যালফাবেট ও অ্যামাজনের শেয়ারদর সামান্য কমেছে। আগামী সপ্তাহে অ্যালফাবেট, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজনের আয়-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের দিকে নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা। এসব কোম্পানির এআই খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনাও বাজারের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।
মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক বাজারে চাপ
আমেরিকান এক্সপ্রেসের ত্রৈমাসিক আর্থিক ফল প্রকাশের পর কোম্পানিটির শেয়ারদর ৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে সেলুলার অবকাঠামো প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে স্পেসএক্সের সম্ভাব্য ওয়্যারলেস সেবা চালুর আলোচনা টেলিযোগাযোগ খাতের শেয়ারে চাপ সৃষ্টি করেছে।
বন্ডবাজারে যুক্তরাষ্ট্রের ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ৩ দশমিক ৭ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৪ দশমিক ৯৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ৫ শতাংশের কাছাকাছি। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কাও বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
ইউরোপের শেয়ারবাজারেও পতন অব্যাহত ছিল। প্যান-ইউরোপীয় স্টক্স ৬০০ সূচক শূন্য দশমিক ৩১ শতাংশ কমে ৬৩৫ দশমিক ৭৭ পয়েন্টে নেমেছে। সপ্তাহজুড়ে সূচকটির পতন ছিল প্রায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ, যা সেপ্টেম্বরের শুরুর পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক পতন।
আগামী সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি, তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা, বড় প্রযুক্তি কোম্পানির আর্থিক ফল এবং মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্ববাজারের দিক নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।












