ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ঘটিয়ে চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় নির্বাচিত হয়েছেন বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা। রোববার (২৫ অক্টোবর) দেশটির নির্বাচনী আদালত তাঁর বিজয় নিশ্চিত করে। প্রথম দফার ভোটে এগিয়ে থাকা ডানপন্থী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে দ্বিতীয় দফায় ৪০ লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন ৮০ বছর বয়সী এই নেতা। এই জয় লাতিন আমেরিকায় ডানপন্থীদের ধারাবাহিক নির্বাচনী সাফল্যের প্রবণতায়ও নতুন মোড় তৈরি করেছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ ছেলে ফ্লাভিও নির্বাচনের ফল বাতিলের আবেদন করার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল ভোটের ব্যবধান এবং তাঁর নিজের শিবিরের ভোটের সময় বাড়ানোর দাবি থাকায় ফল উল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
ফল বাতিলের দাবি, রাজনৈতিক উত্তেজনার আশঙ্কা
ফ্লাভিও বলসোনারো বলেছেন, রোববার সুপ্রিম কোর্টের একটি আদেশে ভোট গ্রহণের সময় দুই ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছিল। এ কারণ দেখিয়ে তিনি নির্বাচনের ফল বাতিলের আবেদন করবেন। তবে বৃষ্টির কারণে দক্ষিণাঞ্চলে ভোটের সময় বাড়ানোর অনুরোধ তাঁর নিজের প্রচারশিবিরও করেছিল।

এর আগে ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে হেরে জইর বলসোনারো ফল মেনে নেননি। ক্ষমতায় থাকার জন্য অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে পরে তাঁর ২৭ বছরের কারাদণ্ড হয়। ফ্লাভিওর পরাজয়ের ব্যবধান তাঁর বাবার পরাজয়ের ব্যবধানের দ্বিগুণেরও বেশি। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আগামী দিনগুলোতে ডানপন্থী সমর্থকদের বিক্ষোভ হতে পারে। তবে এতে নির্বাচনের ফল পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।
কারাবাস থেকে প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রত্যাবর্তন
লুলার রাজনৈতিক জীবন বারবার ঘুরে দাঁড়ানোর নজিরে ভরা। ২০১৮ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুর্নীতির অভিযোগে কারাবন্দি ছিলেন তিনি। পরে ওই অভিযোগে তাঁর দণ্ড বাতিল হয়। এর পথ ধরেই ২০২২ সালের নির্বাচনে জইর বলসোনারোকে হারিয়ে ক্ষমতায় ফেরেন তিনি।
একসময় ধাতুশ্রমিক ও শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হিসেবে পরিচিত লুলা ব্রাজিলের রাজনীতিতে কয়েক দশক ধরে প্রভাবশালী। তবে এবারের নির্বাচনের আগে তাঁর জনপ্রিয়তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। দুর্নীতির একাধিক কেলেঙ্কারি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল অর্থনীতিতে অনানুষ্ঠানিক কর্মীদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির কারণে তাঁর দল ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ভোটার উপস্থিতি লুলার জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছেন জরিপ বিশ্লেষকেরা। ভোটারদের একাংশ নতুন রাজনৈতিক পথের অনিশ্চয়তার পরিবর্তে পরিচিত নেতৃত্বকে বেছে নিয়েছেন।

দারিদ্র্য ও সামাজিক সুরক্ষায় জোর
প্রচারের সময় লুলা তাঁর সরকারের সামাজিক উন্নয়নের রেকর্ড তুলে ধরেন। তাঁর তৃতীয় মেয়াদে দারিদ্র্য ও বৈষম্য কমার পাশাপাশি বেকারত্ব, নিরক্ষরতা ও বন উজাড়ের হার রেকর্ড নিম্নপর্যায়ে নেমেছিল বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি সতর্ক করেন, ফ্লাভিও বলসোনারো ক্ষমতায় এলে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ব্যয় কমতে পারে এবং আগের সামাজিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রভাবের কাছে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্ব দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও তুলে ধরেন লুলা।
লুলার বিজয়ে লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের ডানপন্থী মিত্র সরকারগুলোর বলয় আরও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা কমেছে। তাঁর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সেলসো আমোরিমের মতে, অঞ্চলটির রাজনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় লুলার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সামনে কঠিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

চতুর্থ মেয়াদে লুলার সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে কংগ্রেস। ব্রাজিলের গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পর এবার সবচেয়ে রক্ষণশীল কংগ্রেস নির্বাচিত হয়েছে। বলসোনারোর লিবারেল পার্টি ও তাদের মিত্ররা নিম্নকক্ষে ২৮০টির বেশি এবং সিনেটে সর্বোচ্চ ৫০টি আসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এতে বাজেট, গুরুত্বপূর্ণ আইন ও নিয়োগের মতো বিষয়ে প্রেসিডেন্টের ওপর কংগ্রেসের প্রভাব বাড়তে পারে।
অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সরকারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছর ব্রাজিলের প্রবৃদ্ধি হতে পারে মাত্র ২ দশমিক ৩ শতাংশ। উচ্চ সুদের হার ও সরকারি ঋণ বৃদ্ধির চাপ রয়েছে। মহামারির পর প্রথমবারের মতো সরকারি ঋণ মোট দেশজ উৎপাদনের ৮২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। পাশাপাশি পরিবারের ঋণ বেড়ে যাওয়াও অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
নির্বাচনী প্রচারে লুলা সপ্তাহান্তে দেশজুড়ে বিনা মূল্যে গণপরিবহন চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর পরিচিত সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিতে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধির উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। তবে নতুন মেয়াদে এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি রক্ষণশীল কংগ্রেসের বিরোধিতা সামলানোই হবে তাঁর বড় পরীক্ষা।












