দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ায় ডেটা সেন্টার নির্মাণে বড় ধরনের বিনিয়োগ আসছে। তবে এসব প্রকল্প ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে অসন্তোষও বাড়ছে। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি বাটাম দ্বীপে পানির সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। খরার প্রভাব ও এল নিনোর কারণে পানির উৎস সংকুচিত হওয়ায় নতুন ডেটা সেন্টারগুলোর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বাটাম দ্বীপের একটি গ্রামের বাসিন্দা ৫৩ বছর বয়সী জুনিয়াদি আদিন্দা জানিয়েছেন, ২৬ বছর ধরে সেখানে বসবাস করলেও আগে কখনো পানির সরবরাহ নিয়ে সমস্যায় পড়েননি। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে কাছের নংসা ডিজিটাল পার্কে একটি ডেটা সেন্টার চালু হওয়ার সময় থেকেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। সম্প্রতি পানির সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
আদিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, বছরের শুরুতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পানি পাওয়া গেলেও গত তিন সপ্তাহ ধরে শুধু রাতের বেলায় পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতির প্রতিবাদে চলতি মাসের শুরুতে তিনি ও আরও প্রায় ৪০০ গ্রামবাসী শিল্পপার্কের বাইরে বিক্ষোভ করেন। তবে তাতে কোনো সমাধান হয়নি।
ডেটা সেন্টার বিনিয়োগে নতুন কেন্দ্র বাটাম
সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে বাটাম এখন ডেটা সেন্টার বিনিয়োগের গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠছে। সিঙ্গাপুরে জমি, বিদ্যুৎ ও নিয়ন্ত্রক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিবেশী দেশগুলোতে সম্প্রসারণ করছে। মালয়েশিয়ার জোহর রাজ্যেও একই ধরনের বিনিয়োগ বাড়লেও সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে।
সম্পত্তিবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কুশম্যান অ্যান্ড ওয়েকফিল্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে ইন্দোনেশিয়ায় চালু ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা ছিল ৪৬৮ মেগাওয়াট। একই সময়ে মালয়েশিয়ায় এই সক্ষমতা ১ দশমিক ৩ গিগাওয়াট এবং সিঙ্গাপুরে ১ দশমিক ১ গিগাওয়াট। তবে ইন্দোনেশিয়ায় আরও প্রায় ২ গিগাওয়াট সক্ষমতার ডেটা সেন্টার নির্মাণাধীন বা পরিকল্পনাধীন রয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএমআইয়ের ২২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাটামে বর্তমানে চালু ডেটা সেন্টারের সক্ষমতা ৭০ মেগাওয়াট। আগামী কয়েক বছরে সেখানে আরও ৭৪৭ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা প্রকাশ করা হয়েছে।
নংসা ডিজিটাল পার্কে হংকংভিত্তিক গাও ক্যাপিটাল পার্টনার্স ও স্থানীয় প্রতিষ্ঠান সিনার প্রিমেরা ৫ দশমিক ২ মেগাওয়াটের একটি ডেটা সেন্টার পরিচালনা করছে। এর সক্ষমতা চার গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সিঙ্গাপুরভিত্তিক ডেঅন ৭২ মেগাওয়াটের একটি স্থাপনা তৈরি করছে। নরওয়ের বিএডব্লিউ গ্রুপের ডিজিটাল অবকাঠামো প্রতিষ্ঠান বিএডব্লিউ ডিজিটাল সেখানে ১৪৪ মেগাওয়াটের একটি ক্যাম্পাস নির্মাণ করছে।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়ার ফার্মাস জুন মাসে এনভিডিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্বের ঘোষণা দেয়। এই উদ্যোগের আওতায় বাটামে ৩৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতার ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাস গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম তালিকাভুক্ত ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিসিআই ইন্দোনেশিয়া পাশের বিনতান দ্বীপে প্রায় ১ গিগাওয়াট সক্ষমতার একটি প্রকল্পের পরিকল্পনা করছে। ভবিষ্যতে এর সক্ষমতা দ্বিগুণ করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
জলাধারের কাছে প্রকল্প, পরিবেশগত অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন
জাকার্তার কাছাকাছি পশ্চিম জাভার পুরওয়াকার্তায় সিঙ্গাপুরভিত্তিক বিডিএক্স গত মাসে ৬৪০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাসের নির্মাণকাজ শুরু করে। প্রকল্পটি ইন্দোনেশিয়ার বৃহত্তম জলাধারযুক্ত জলবিদ্যুৎ বাঁধ জাতিলুহুর বাঁধের কাছে অবস্থিত।
তবে ১ অক্টোবর পশ্চিম জাভার গভর্নর দেদি মুলিয়াদি প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে পরিবেশগত ও নির্মাণসংক্রান্ত অনুমতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর এক সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে কাজ বন্ধ হয়ে যায়। পুরওয়াকার্তার পরিবেশবিষয়ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরে পরিবেশগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে অন্যান্য অনুমতি এখনো প্রয়োজন।
প্রকল্প এলাকার প্রায় দুই কিলোমিটারের মধ্যে বসবাসকারী হিদায়াত জানিয়েছেন, প্রকল্প শুরুর আগেই এলাকায় পানির সরবরাহ অনিয়মিত ছিল। তাঁর মতে, ডেটা সেন্টারের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। তবে বাসিন্দাদের পানির চাহিদা ক্ষতিগ্রস্ত না হলে প্রকল্প নিয়ে তাঁদের আপত্তি নেই।
বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ
বাটাম দ্বীপে সম্প্রতি বারবার বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পিএলএনের স্থানীয় কার্যালয় জানিয়েছে, এসব বিভ্রাটের জন্য ডেটা সেন্টারকে দায়ী করা যায় না।
পিএলএন বাটামের প্রেসিডেন্ট কুইন ফো জানিয়েছেন, দ্বীপটির ৯৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৮০ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁর দাবি, ডেটা সেন্টারগুলোর চাহিদা মেটানোর মতো সক্ষমতা এখনো রয়েছে। ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ স্থানীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে আরও সর্বোচ্চ ৪০০ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাটাম মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, দ্বীপটিতে চালু, প্রতিশ্রুত ও পরিকল্পনাধীন ডেটা সেন্টার প্রকল্পগুলোর সম্মিলিত সক্ষমতা ১ দশমিক ৪৭ গিগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে।
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বনাম স্থানীয় মানুষের অধিকার
ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক সমন্বয়বিষয়ক মন্ত্রী এয়ারলাঙ্গা হার্তার্তো ৬ অক্টোবর বলেন, ডিজিটাল ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সেবার সম্প্রসারণ দেশটির ৮ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা করতে পারে। তাঁর মতে, ডেটা সেন্টার শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি, বিদ্যুৎ ও পানির সম্পদ ইন্দোনেশিয়ার রয়েছে।
তবে সিজিএস ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে ইন্দোনেশিয়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপযোগী ডেটা সেন্টারের চাহিদা থেকে বড় সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ, অর্থায়ন এবং গ্রাহক নিশ্চিত করা বিনিয়োগ পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জ্বালানি ও জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা সংস্থা ট্রেন্ড এশিয়ার গবেষক জাকি আমালি সতর্ক করে বলেছেন, ডেটা সেন্টারের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের পানি ও বিদ্যুৎ থেকে বঞ্চিত করা উচিত নয়। তাঁর মতে, কার্যকর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা না থাকলে এই শিল্প মানবাধিকার লঙ্ঘনের নতুন উৎস হয়ে উঠতে পারে।
ইন্দোনেশিয়ায় ডেটা সেন্টার বিনিয়োগ দ্রুত বাড়লেও পানির সংকট, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে এসব মৌলিক সেবার ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।












