এআইয়ের সহায়তায় সফটওয়্যারের নিরাপত্তা ত্রুটি আগের চেয়ে দ্রুত শনাক্ত হচ্ছে। এই প্রযুক্তি যেমন ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার করার নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি সাইবার অপরাধীদের হাতেও তুলে দিতে পারে হামলার নতুন উপায়। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, একের পর এক দুর্বলতা সামনে আসায় সরকারি ওয়েবসাইট, গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো ও অনলাইন সেবায় বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিতে পারে। এআই ও সাইবার নিরাপত্তার এই দ্বিমুখী সম্পর্ক এখন আলোচনার কেন্দ্রে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সবচেয়ে উদ্বেগের দিক হলো ত্রুটি শনাক্ত করা এবং তা কাজে লাগিয়ে হামলার প্রস্তুতি নেওয়ার মধ্যবর্তী সময় দ্রুত কমে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসভিত্তিক সাইবার হুমকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ভালনচেকের প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা এক গবেষণায় দেখা গেছে, এক বছরের ব্যবধানে শনাক্ত হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা ত্রুটির সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।
ডিজিটাল অবকাঠামো সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ক্লাউডফ্লেয়ারের প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ প্রিন্স জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ সফটওয়্যারে আরও বেশ কিছু গুরুতর দুর্বলতা রয়েছে, যেগুলো সামনে আসতে পারে। বৃহস্পতিবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আগামী কয়েক বছর এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যখন প্রায় প্রতি সপ্তাহেই বড় কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দেবে।
পিএইচপির দুর্বলতায় বন্ধ ওয়েবসাইট
চলতি সপ্তাহে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি ওয়েবসাইটে যে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে, তার পেছনে ছিল পিএইচপি প্রোগ্রামিং ভাষার নিরাপত্তা ত্রুটি। কিছু প্রতিষ্ঠান সময়মতো নিজেদের ব্যবস্থা নিরাপদ করতে না পারায় সাময়িকভাবে ওয়েবসাইট বন্ধ রাখে।
ভালনচেকের গবেষক প্যাট্রিক গ্যারিটি জানান, একই সপ্তাহে নোড.জেএস, ভিডিও ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার প্লেক্স, এআইভিত্তিক সংযোগব্যবস্থা লাইটএলএলএম এবং সফটওয়্যার উন্নয়ন প্ল্যাটফর্ম রেলওয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নিরাপত্তা ত্রুটি বা লঙ্ঘনের ঘটনাও সামনে এসেছে। ভারতের ডিজিটাল সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ইমুদ্রার ব্যবহৃত একটি অত্যন্ত দুর্বল সাংকেতিক চাবির বিষয়টিও প্রকাশিত হয়েছে।
এআই বদলে দিচ্ছে হামলার সময়সূচি
আগে দুর্বলতা খুঁজে বের করতে অভিজ্ঞ প্রযুক্তিবিদদের দক্ষতা ও দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হতো। ত্রুটি শনাক্তের পর তা কাজে লাগিয়ে হামলার পদ্ধতি তৈরিতেও কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস লেগে যেতে পারত। এই সময়ে নিরাপত্তা দলগুলো ত্রুটি সংশোধন ও সফটওয়্যার হালনাগাদের সুযোগ পেত। এখন এআই মডেল বিপুল পরিমাণ কোড পরীক্ষা করে সম্ভাব্য দুর্বলতা শনাক্ত করতে পারে, আর হামলার পদ্ধতি তৈরির কাজও দ্রুত হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়াভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান রানসেফ সিকিউরিটির প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা শেন ফ্রাই বলেন, শুধু ত্রুটি শনাক্তের সময়ই কমছে না, প্রতিপক্ষ কত দ্রুত সেই দুর্বলতাকে হামলার উপযোগী করতে পারে, সেই সময়সীমাও বদলে যাচ্ছে।
বেশি ত্রুটি মানেই কি বেশি সফল হামলা?
সব বিশেষজ্ঞ মনে করেন না যে ত্রুটি শনাক্ত বাড়লে হামলাও একই হারে বাড়বে। ফাইল আদান-প্রদানের সফটওয়্যার কার্লের প্রধান উন্নয়নকারী ড্যানিয়েল স্টেনবার্গের মতে, এআইয়ের সাহায্যে শনাক্ত হওয়া কিছু ত্রুটি বেশ জটিল ও অস্বাভাবিক, তাই সেগুলো সহজে কাজে লাগানো সম্ভব নয়। সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান আর্মরকোডের জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী রামি রহমানও একই মত দেন।
সাইবার হুমকি বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান হান্ট ডট আইওর গবেষণা বিভাগের প্রধান এস্তেবান বোর্হেস জানান, বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় দুপুর ২টা পর্যন্ত পিএইচপির ত্রুটি কাজে লাগানোর মতো কার্যকর সরঞ্জাম তৈরি হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
দীর্ঘমেয়াদে সুফলের আশা
ম্যাথিউ প্রিন্স মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে এআই নিরাপত্তা বাড়াতেও ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘদিন অজানা থাকা দুর্বলতা শনাক্ত করা গেলে প্রতিষ্ঠানগুলো তা সংশোধনের সুযোগ পাবে। তবে এই সুফল পেতে দ্রুত সংশোধন, নিয়মিত সফটওয়্যার হালনাগাদ ও কার্যকর নজরদারি জরুরি। দুর্বলতা আবিষ্কারের গতি সংশোধনের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে গেলে এআই ও সাইবার নিরাপত্তার এই অগ্রগতিই নতুন সংকটের কারণ হয়ে উঠতে পারে।












