ভারতের বিভিন্ন শহরে কর্মীরা এখন নিজেদের দৈনন্দিন কাজের ভিডিও ধারণ করে বাড়তি আয় করছেন। কেউ চুল কাটছেন, কেউ পোশাক সেলাই করছেন, আবার কেউ রান্না, ঘর পরিষ্কার কিংবা কাপড় ভাঁজ করার মতো সাধারণ কাজের দৃশ্য ধারণ করছেন। তবে এসব ভিডিও তৈরির উদ্দেশ্য শুধু স্মৃতি ধরে রাখা নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-চালিত রোবটকে বাস্তব জগতের কাজ শেখানোর জন্য এসব ভিডিও সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বেঙ্গালুরুর ২২ বছর বয়সী মোহাম্মদ আশিম গত চার বছর ধরে চুল কাটা ও দাড়ি ছাঁটার কাজ করছেন। সম্প্রতি তাঁর কাজের তালিকায় যুক্ত হয়েছে নতুন একটি বিষয়—মাথায় বিশেষ ক্যামেরা লাগিয়ে নিজের কাজের ভিডিও ধারণ করা। প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা ক্যামেরা পরে কাজ করেন তিনি। এতে নিয়মিত কাজের পাশাপাশি বাড়তি অর্থও পাচ্ছেন।
আশিমের কাছে বিষয়টি যেমন আয়ের নতুন সুযোগ, তেমনি প্রযুক্তির ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতাও। তিনি জানিয়েছেন, এই কাজ থেকে ভালো অর্থ পাওয়া যায়। তবে নিজের চুল কাটার দক্ষতা যে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কাজে লাগতে পারে, তা আগে কখনো কল্পনা করেননি।
আশিমের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কর্মীরা এখন অর্থের বিনিময়ে নিজেদের দৈনন্দিন কাজের ভিডিও ধারণ করছেন। স্থানীয় কিছু প্রতিষ্ঠান এসব ভিডিও সংগ্রহ করে প্রযুক্তি কোম্পানি ও গবেষণা সংস্থার কাছে বিক্রি করছে। এসব তথ্য ব্যবহার করে এআই ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, বিশেষ করে এমন রোবট তৈরিতে, যেগুলো বাস্তব পরিবেশে মানুষের মতো বিভিন্ন শারীরিক কাজ করতে পারবে।
দৈনন্দিন কাজ থেকেই এআইয়ের প্রশিক্ষণ
মানুষের কাজের ভিডিও সংগ্রহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি রাশদান টেকনোলজিস। প্রতিষ্ঠানটি শিল্পকারখানার কাজ, কৃষিকাজ, ঘরের দৈনন্দিন কাজ এবং ছোট ব্যবসার বিভিন্ন কার্যক্রমের ভিডিও সংগ্রহ করে। এসব ভিডিওর গ্রাহক হলো এআই ও রোবট তৈরির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
রাশদান টেকনোলজিসের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী শাহিল বেইগের ভাষ্য, প্রতিটি রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবং উন্নত এআই নিয়ে কাজ করা গবেষণাগারের তথ্যের চাহিদা আলাদা। কোনো প্রতিষ্ঠান শিল্পকারখানার কাজের ভিডিও চায়, কোনোটি কৃষিকাজের, আবার কেউ মৃৎশিল্প, পোশাক তৈরি, সূচিকর্ম কিংবা মোমবাতি তৈরির মতো কাজের ভিডিও সংগ্রহ করতে আগ্রহী।
চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের কাছ থেকে ভিডিও সংগ্রহ করে প্রতিষ্ঠানটি। সাধারণত আট থেকে দশ ঘণ্টার কাজের ভিডিও ধারণের জন্য কর্মীদের পাঁচ থেকে দশ ডলার দেওয়া হয়।
বেইগ জানিয়েছেন, ভিডিও ধারণের ক্ষেত্রে কর্মীদের সম্মতি ও স্বাচ্ছন্দ্যকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। সাধারণত ক্যামেরায় হাতের কাজ ধারণ করা হয়। শরীরের আরও বেশি অংশ কিংবা আশপাশের পরিবেশ দেখা গেলে মুখমণ্ডল ঝাপসা করে দেওয়া হয়। গ্রাহকদের কাছে পাঠানো তথ্য থেকে কর্মীদের নাম ও যোগাযোগের বিবরণও বাদ রাখা হয়।
তবে এখন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদা আরও বাড়ছে। শুধু হাতের নড়াচড়া নয়, একটি কাজের পুরো পরিবেশ ও বিভিন্ন দিক থেকে তার বিবরণ ধারণ করতে চাইছে তারা। এ কারণে কোনো কোনো গ্রাহক কর্মীর মাথায় চার থেকে ছয়টি ক্যামেরা বসানোর ব্যবস্থাও চাইছেন।
একাধিক ক্যামেরা ব্যবহার করলে কর্মীরা তুলনামূলক বেশি পারিশ্রমিক পান। তবে একটির বদলে একাধিক ক্যামেরা পরতে রাজি করানোও কঠিন বলে জানিয়েছেন বেইগ।
বাস্তব জগতের কাজ শিখতে মানুষের তথ্য কেন দরকার
কম্পিউটারে তৈরি কৃত্রিম পরিবেশে রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব। কিন্তু শুধু এমন অনুশীলনের ওপর নির্ভর করে রোবটকে বাস্তব জগতের জটিল কাজ নির্ভরযোগ্যভাবে শেখানো কঠিন। কারণ বাস্তবে বস্তু ধরার ধরন, চাপ প্রয়োগ, হাতের নড়াচড়া এবং আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো নানা বিষয় রয়েছে।
হিউমিন ল্যাবসের প্রতিষ্ঠাতা মনীশ আগরওয়ালের মতে, এসব সীমাবদ্ধতা কাটাতে মানুষের বাস্তব কাজের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রতিষ্ঠান মূলত ভিডিওসহ মানুষের তৈরি বিভিন্ন ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করে। কিছু কর্মী হাত ও আঙুলে বিশেষ যন্ত্র ব্যবহার করেন, যাতে কোনো বস্তু স্পর্শ করা বা ধরার সময় শারীরিক সংস্পর্শের তথ্যও সংগ্রহ করা যায়।
হিউমিন ল্যাবসের তথ্য সংগ্রহকারী কর্মীর সংখ্যা ৯৬ হাজার। তাঁদের কার্যক্রম লাতিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত। বেঙ্গালুরু ও সান ফ্রান্সিসকোতেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটি হাজার হাজার ঘণ্টার ভিডিও পর্যালোচনা করে। এরপর রোবট প্রশিক্ষণের জন্য উপযোগী অংশ বেছে নেওয়া, কাজের ধরন শনাক্ত করা এবং তথ্যগুলোকে নির্দিষ্টভাবে সাজানোর কাজ করা হয়। পরে এসব তথ্য গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ করা হয়।
তবে শুধু ভিডিও সংগ্রহ করলেই হয় না; রোবট যে পরিবেশে কাজ করবে, সেই পরিবেশের সঙ্গে তথ্যের মিল থাকাও জরুরি। উদাহরণ হিসেবে আগরওয়াল বলেছেন, ভারতের কোনো বাড়ির রান্নাঘর বা ঘরের কাজের ভিডিও যুক্তরাষ্ট্রের বাড়িতে ব্যবহারের জন্য তৈরি রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সব সময় উপযুক্ত নাও হতে পারে। দুই দেশের বাড়িঘর, আসবাব, যন্ত্রপাতি ও কাজের ধরনে পার্থক্য রয়েছে।
যে কাজ শেখাচ্ছেন, সেই কাজই কি একদিন কেড়ে নেবে রোবট?
মানুষের কাজের ভিডিও দিয়ে রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার এই উদ্যোগ নতুন কর্মসংস্থান ও বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও উঠে আসছে—যেসব কর্মী এখন রোবটকে কাজ শেখাচ্ছেন, ভবিষ্যতে তাঁদের কাজই কি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের দখলে চলে যাবে?
মুম্বাইয়ের টাটা ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বিনো পলের মতে, এআই ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি মানুষের কাজ সহজ করতে পারে, আবার অন্য ক্ষেত্রে মানুষের পরিবর্তে যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে পারে।
পল সতর্ক করে বলেছেন, কর্মীরা যখন বুঝতে পারবেন যে তাঁরা ঠিক কী ধরনের প্রযুক্তি তৈরিতে সহায়তা করেছেন, তত দিনে পরিস্থিতি অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। তাই এ ধরনের কার্যক্রমের জন্য সরকারি নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
এই উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে কর্মীদের তথ্য ব্যবহারের অধিকার, ভবিষ্যতে তাঁদের কাজের ওপর প্রযুক্তির প্রভাব এবং তথ্য সংগ্রহের সময় দেওয়া সম্মতি কতটা অর্থবহ—এসব প্রশ্ন।
বাড়তি আয়ের তাগিদেই ক্যামেরার সামনে শ্রমিকেরা
বেঙ্গালুরুর বস্ত্রশিল্পে প্রায় ১০ বছর ধরে কাজ করছেন মোহাম্মদ আরমান। সম্প্রতি তিনি পোশাক কাটা ও সেলাই করার সময় নিজের কাজের ভিডিও ধারণ করতে শুরু করেছেন।
বিহারে থাকা পরিবারের জন্য বাড়তি আয়ের গুরুত্ব অনেক। তাই দীর্ঘদিন ধরে যে কাজ করছেন, সেই একই কাজের সময় ক্যামেরা পরার বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার সুযোগকে তিনি সহজে প্রত্যাখ্যান করতে চান না। আরমানের বক্তব্য, একই কাজ করে যদি বাড়তি অর্থ পাওয়া যায়, তাহলে তিনি কেন সেই সুযোগ নেবেন না?
তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রযুক্তি নিয়ে ভবিষ্যতের উদ্বেগ থাকলেও অনেক কর্মীর কাছে তাৎক্ষণিক আয়ের প্রয়োজনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সংসারের খরচ মেটানো এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য তাঁরা এই নতুন কাজ গ্রহণ করছেন।
একই ধরনের কাজ করছেন গুন্টাকালের বাসিন্দা জলি আরিফুর। তিনি পেশায় বিজ্ঞানবিষয়ক শিক্ষক। ছোট ছেলের যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি পড়ানো এবং ঘরের কাজও সামলান। গত সাত মাস ধরে রান্না করা, ঝাড়ু দেওয়া ও কাপড় ভাঁজ করার মতো দৈনন্দিন কাজের ভিডিও ধারণ করছেন তিনি।
আরিফুর জানান, প্রতি ঘণ্টায় দুই থেকে তিন ডলার পান তিনি। প্রতিদিন তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টা ভিডিও ধারণ করতে পারলে উল্লেখযোগ্য বাড়তি অর্থ হাতে আসে। শিক্ষকতার আয়ের পাশাপাশি এটি তাঁর পরিবারের জন্য অতিরিক্ত আয়ের একটি উৎস হয়ে উঠেছে।
শুধু ভিডিও সংগ্রহ নয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতাও বাড়াতে হবে
মানুষের দৈনন্দিন কাজের ভিডিও সংগ্রহের বাজার বাড়লেও ভারতের সামনে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার প্রশ্ন রয়েছে। হিউমিন ল্যাবসের প্রতিষ্ঠাতা আগরওয়ালের মতে, ভারত যদি শুধু ভিডিও ধারণ করে বিদেশি এআই গবেষণাগারগুলোর কাছে কাঁচা তথ্য সরবরাহ করে, তাহলে এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন হবে।
তাঁর মতে, তথ্য পরিষ্কার করা, সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো, ভুল শনাক্ত করা এবং তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করার মতো দক্ষতা গড়ে তোলা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে সক্ষমতা বাড়াতে পারলে ভারত শুধু তথ্য সরবরাহকারী হিসেবে নয়, এআই প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারবে।
মানুষের কাজের ভিডিও দিয়ে রোবটকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার এই নতুন ব্যবস্থা একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, কর্মসংস্থান এবং শ্রমিকের অধিকার নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি করছে। আপাতত অনেক কর্মীর কাছে এটি বাড়তি আয়ের সুযোগ। কিন্তু ভবিষ্যতে এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি রোবট কত ধরনের কাজ করতে পারবে এবং তার ফলে মানুষের কর্মজীবনে কী পরিবর্তন আসবে, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তির অগ্রগতি, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা ও কর্মীদের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত রাখা হচ্ছে তার ওপর।












