ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নেগেভ মরুভূমির দিমোনা শহরেই এবার তাঁর বিরুদ্ধে ভোটের প্রচারে নেমেছেন সাবেক লিকুদ সমর্থকদের একটি অংশ। তাঁদের লক্ষ্য, মঙ্গলবারের নির্বাচনে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকটের দল ইয়াশারের পক্ষে ভোটারদের সমর্থন আদায় করা। হামাসের ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর এই প্রথম জাতীয় নির্বাচনে যাচ্ছে ইসরায়েল। ওই হামলায় দেশটির নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ওঠে এবং গাজা, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়।
নির্বাচনের আগে জনমত জরিপে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী, কট্টর ডানপন্থী ও অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে মধ্যপন্থী নেতা আইজেনকটেরও সরকার গঠনের নিশ্চিত পথ নেই। ভোট যত এগিয়ে আসছে, দুই পক্ষের লড়াই তত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নেতানিয়াহুর পুরোনো সমর্থকদের মধ্যে অসন্তোষ
দিমোনায় দীর্ঘদিন লিকুদ পার্টির শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে। ২০২২ সালের নির্বাচনে শহরটির প্রায় অর্ধেক ভোটার দলটিকে ভোট দিয়েছিলেন। এবার সেই ভোটব্যাংকে ভাঙন ধরানোর চেষ্টা করছেন নেতানিয়াহুর সাবেক সমর্থকেরা।
৭৪ বছর বয়সী ইয়োসি আসায়াগ তাঁদের একজন। জীবনের অধিকাংশ সময় লিকুদকে সমর্থন করলেও এখন তিনি আইজেনকটের পক্ষে প্রচার করছেন। তাঁর ভাষায়, ইসরায়েলে পরিবর্তন দরকার এবং নেতানিয়াহু দেশটির জন্য বিপর্যয় ডেকে এনেছেন।
তবে দীর্ঘদিনের সমর্থকদের সবাই দল বদলাতে রাজি নন। উত্তর আফ্রিকা থেকে ছয় দশকেরও বেশি সময় আগে ইসরায়েলে আসা অবসরপ্রাপ্ত রুতি ওহানা জানিয়েছেন, তিনি কখনো লিকুদকে বিশ্বাসঘাতকতা করবেন না। তাঁর মতে, নেতানিয়াহু প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক এগিয়ে এবং ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য তাঁকে দায়ী করা অন্যায্য।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকীয় বংশোদ্ভূত ইহুদিরা, যারা মিজরাহি নামে পরিচিত, দীর্ঘদিন লিকুদের গুরুত্বপূর্ণ ভোটারগোষ্ঠী। ইউরোপীয় প্রভাবাধীন মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির কাছ থেকে অবহেলার অনুভূতি থেকেই এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ একসময় লিকুদের দিকে ঝুঁকেছিল। ইসরায়েলের রাজনীতি আরও ডানপন্থী হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে লেবার পার্টির প্রভাব কমেছে, তবে পুরোনো সমর্থকদের সঙ্গে লিকুদের সম্পর্ক এখনো দৃঢ়।
আইজেনকটের ব্যক্তিগত পরিচয় ও নিরাপত্তা ভাবমূর্তি
আইজেনকটের নির্বাচনী কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে লিকুদের সেই ভোটাররা, যারা এখনো সিদ্ধান্ত নেননি বা দলটির প্রতি আস্থা হারিয়েছেন। দিমোনায় তাঁর প্রচার পরিচালনা করছেন মিখাল এলমালেম আবু। তিনি একসময় লিকুদের প্রার্থী হিসেবে নগর পরিষদে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের ভিটারবি ফ্যামিলি সেন্টার ফর পাবলিক ওপিনিয়ন অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ১৩ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্ত নেননি কাকে ভোট দেবেন। ২০২২ সালে লিকুদকে ভোট দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এবার মাত্র ৫৫ শতাংশ আবার দলটিকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। ১৫ শতাংশ নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোকে সমর্থন করবেন; তাঁদের মধ্যে ৮ শতাংশ আইজেনকটের দল ইয়াশারের পক্ষে। আরও ১৪ শতাংশ বিকল্প ডানপন্থী দলগুলোকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন, আর ৯ শতাংশ এখনো অনিশ্চিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎস আসা-এলের মতে, দিমোনার মতো শহরগুলোতেই লিকুদের ভোটব্যাংকে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সুযোগ রয়েছে। মরক্কো থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের সন্তান আইজেনকট সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন পদ পেরিয়ে ইসরায়েলের চিফ অব স্টাফ হয়েছিলেন। তাঁর সাধারণ পারিবারিক পটভূমি এবং মিজরাহি পরিচয় লিকুদের ঐতিহ্যগত ভোটারদের একটি বড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
গাজায় যুদ্ধে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে তাঁর ছেলের নিহত হওয়ার ঘটনাও ভোটারদের মধ্যে আবেগ তৈরি করেছে। দিমোনায় এক জনসভায় কেউ কেউ তাঁকে জড়িয়ে ধরেছেন, আবার অনেকে ছেলের মৃত্যুতে সমবেদনা জানিয়েছেন।
উন্নয়ন ও দীর্ঘ শাসনের প্রশ্ন
নেতানিয়াহুও নেগেভ অঞ্চলে নিজের সমর্থন ধরে রাখতে সক্রিয়। তাঁর দল দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে উন্নয়ন তহবিল ও অবকাঠামোগত বিনিয়োগের কথা তুলে ধরে আসছে। এক অনুষ্ঠানে নেতানিয়াহু স্থানীয়দের নিজেদের এলাকার পরিবর্তন ও উন্নয়ন দেখে কোন সরকার বিনিয়োগ করেছে, তা বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
তবে তাঁর প্রতি সহানুভূতিশীল কিছু ভোটারও মনে করছেন, এবার নেতৃত্বে পরিবর্তন দরকার। ইসরায়েলের সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম নির্বাচিত হওয়ার প্রায় ৩০ বছর পর ৭৭ বছর বয়সী নেতানিয়াহু দেশটির সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ছয় মেয়াদে মোট ১৮ বছর সরকার পরিচালনা করেছেন।
দিমোনার সফটওয়্যার প্রকৌশলী ডেভিড ইসকালির মতে, নেতানিয়াহু ইসরায়েলের জন্য অনেক কিছু করলেও তাঁর শাসন আর চলতে পারে না। বয়সের বিষয়টিও ভোটের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
নির্বাচনের আগে দিমোনায় লিকুদের পুরোনো সমর্থকদের এই অবস্থান পরিবর্তন নেতানিয়াহুর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। তবে দীর্ঘদিনের দলীয় আনুগত্য, আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি এবং বিরোধীদের সরকার গঠনের অনিশ্চয়তার কারণে শেষ পর্যন্ত ভোটের ফল কোন দিকে যাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।












