ভারতে তরুণদের নেতৃত্বে চলমান বিক্ষোভ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনে বিরল রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতিতে আন্দোলনের গতি কমাতে সরকার একদিকে তরুণদের প্রতিবাদ দমনে কঠোর হচ্ছে, অন্যদিকে ঐতিহ্যবাহী বিরোধী দল কংগ্রেসকে মিছিল করার সুযোগ দিচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক কৌশল—তরুণদের দলনিরপেক্ষ আন্দোলনকে দুর্বল করে লড়াইকে পরিচিত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা, যেখানে মোদি বারবার জয়ী হয়েছেন।
গত গ্রীষ্মে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার অব্যবস্থাপনা ও প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে তরুণদের আন্দোলন শুরু হয়। শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে ক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশি লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে সরকার। কিন্তু তাতে আন্দোলন থামেনি। শেষ পর্যন্ত শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হয়। মোদির দীর্ঘ শাসনামলে এটি ছিল বিরল রাজনৈতিক পিছু হটা।
তরুণদের আন্দোলন কেন মোদির জন্য চ্যালেঞ্জ

ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের ৪০ শতাংশেরও বেশি বয়স ২৫ বছরের নিচে। ফলে তরুণদের অসন্তোষ দেশটির রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। এই আন্দোলনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো, এটি প্রচলিত দলীয় বিভাজন অতিক্রম করেছে। এমনকি মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সমর্থক মধ্যবিত্ত পরিবারের তরুণেরাও আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ সবার জন্য সমান কি না, সেই প্রশ্ন আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে। ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার অনিয়ম নিয়ে ক্ষোভ এমন একটি ইস্যু, যাকে সহজে দলীয় রাজনীতি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ভারতে দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয়কে উন্নত জীবনের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়। সেই ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ তরুণদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও উদ্বিগ্ন করেছে।
বিক্ষোভ ঠেকাতে সরকারের দ্বিমুখী কৌশল
চলতি মাসে দিল্লিতে নতুন করে তরুণদের বিক্ষোভের প্রস্তুতি শুরু হলে সরকার দ্রুত শহরের কেন্দ্রীয় এলাকার বড় অংশে ব্যারিকেড বসায় এবং বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করে। গ্রীষ্মের আন্দোলনের মতো বড় জমায়েত ঠেকানোই ছিল এর উদ্দেশ্য।

তবে কংগ্রেস ও তার মিত্রদের একটি সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিক্ষোভকারীরা সুপ্রিম কোর্টের দিকে মিছিল করেন। তাঁদের অভিযোগ, মোদি সরকার কর্তৃত্ববাদী কৌশল প্রয়োগ করছে এবং ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ মানুষের নাম বাদ দিয়ে গণতন্ত্রকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণে এই পার্থক্যকে মোদির কৌশলের অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তরুণদের আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কংগ্রেসের মতো পরিচিত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াইকে সামনে আনা—এই দুই পথে সরকার এগোচ্ছে। কংগ্রেসের বিরুদ্ধে নির্বাচনে মোদির দল অতীতে একাধিকবার জয় পেয়েছে। ফলে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাঁর জন্য তুলনামূলকভাবে পরিচিত।
রাহুল গান্ধীর সামনে সুযোগ, আবার ঝুঁকিও
তরুণদের আন্দোলন রাহুল গান্ধীর রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করেছে। মোদির শাসনপদ্ধতি নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সমালোচনা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। চলতি মাসে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় তাঁর কয়েকটি ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সুপ্রিম কোর্টমুখী মিছিলে তরুণ আন্দোলনকর্মী নেহা বোরার অংশগ্রহণও নজর কেড়েছে।

তবে তরুণদের আন্দোলনের সঙ্গে কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠতা বাড়লে তার দলনিরপেক্ষ চরিত্র দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আন্দোলনের শক্তির একটি বড় উৎস হলো, এটি কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কংগ্রেসের সঙ্গে জোট গড়ে উঠলে তরুণদের সেই বিস্তৃত সমর্থন কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
আপাতত মোদির সরকার আন্দোলনের গতি কমানোর চেষ্টা করছে, আর কংগ্রেস নিজেদের রাজনৈতিক সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে। আগামী ১ নভেম্বর কংগ্রেসের আরেকটি সমাবেশের পরিকল্পনা রয়েছে। তরুণদের আন্দোলন কোন পথে এগোবে এবং তা বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে কতটা যুক্ত হবে, তার ওপর ভারতের রাজনীতিতে পরবর্তী পরিস্থিতি অনেকটাই নির্ভর করছে।












