প্রায় এক বছর নির্বাসনে থাকার পর রোববার নিজ দেশ ভেনেজুয়েলায় ফিরেছেন দেশটির প্রধান বিরোধী আন্দোলনের নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো। ২০২৫ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণের জন্য দেশ ছাড়ার পর তাঁর এই প্রত্যাবর্তন এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। মাচাদোর লক্ষ্য অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করা। তবে দেশে ফেরার পর তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কোন দিকে এগোবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার দীর্ঘদিনের সমাজতান্ত্রিক শাসনের বিরোধী মাচাদো ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর আত্মগোপনে চলে গিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করলেও বিরোধীরা ভোটের ফল নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ তোলে। পরে নরওয়েতে নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহণ করতে গোপনে দেশ ছাড়েন মাচাদো। নির্বাসনে থেকেও তিনি দেশে ফিরে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরও মাচাদোর প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত রোববার তিনি দেশে ফেরার খবর জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, “আমি এখানে। আপনাদের সঙ্গে।”
মাচাদো কে, কীভাবে উঠে এলেন রাজনীতিতে

৫৯ বছর বয়সী মাচাদো কারাকাসের একটি প্রভাবশালী পরিবারের সন্তান। তিনি প্রকৌশল ও অর্থায়ন বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং পরে পরিবারের ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সিভেনসায় কাজ করেন। ২০১০ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের সরকারের জাতীয়করণ কর্মসূচির আওতায় প্রতিষ্ঠানটির কিছু অংশ অধিগ্রহণ করা হয়।
২০০০-এর দশকের শুরুতে রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন মাচাদো। তিনি ভোটাধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন সুমাতে প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। সংগঠনটি চাভেজকে ক্ষমতা থেকে সরাতে গণভোটের উদ্যোগ নিয়েছিল, যদিও সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
২০১০ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়ে রেকর্ডসংখ্যক ভোট পান মাচাদো। পরে তিনি ভেনতে ভেনেজুয়েলা বিরোধী দলের নেতৃত্ব দেন এবং ২০২৩ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দেন।
তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে তাঁকে প্রার্থী হতে দেওয়া হয়নি। তৎকালীন সরকারের দাবি ছিল, জাতীয় পরিষদের সদস্য থাকাকালে আর্থিক অনিয়মের কারণে তাঁর প্রার্থিতা অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। মাচাদো একে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দেন। তাঁর সমর্থনে তুলনামূলকভাবে অপরিচিত সাবেক কূটনীতিক এদমুন্দো গনসালেস নির্বাচনে অংশ নেন।
মাদুরো বিজয় দাবি করলেও বিরোধীরা নিজেদের সংগ্রহ করা ভোটের হিসাব প্রকাশ করে জানায়, গনসালেস বড় ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা কার্টার সেন্টারও বিরোধীদের প্রকাশিত হিসাবকে সঠিক বলে উল্লেখ করেছে।
গত বছর নোবেল কমিটি মাচাদোকে পুরস্কার দেওয়ার কারণ হিসেবে ভেনেজুয়েলায় ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদের মুখে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকার কথা তুলে ধরে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে সমর্থন, কিন্তু সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ
মাদুরোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ বাড়ানোর পক্ষে ছিলেন মাচাদো। তাঁর বক্তব্য ছিল, মাদুরো আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি। মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হলে তাঁর আন্দোলন ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ড ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রস্তুত বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে নিজের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তুলে ধরে মাচাদো বলেছিলেন, তাঁর আন্দোলনের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে ১৫ বছরে ভেনেজুয়েলায় ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলারের সম্পদ সৃষ্টি করা সম্ভব। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তেলশিল্প বেসরকারীকরণের কথাও তিনি বলেছিলেন।
জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযানে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস আটক হন। তাঁরা এখন যুক্তরাষ্ট্রে মাদক-সন্ত্রাসবাদ, মাদক পাচার ও বন্দীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগে বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। মাদুরোকে সরিয়ে দেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প বেসরকারীকরণের উদ্যোগ নিয়েছে। একই সময়ে মাদুরোর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেসের প্রশাসন তেল নিয়ে বিভিন্ন আর্থিক চুক্তি করেছে। এসব চুক্তির একটির সমালোচনা করেছেন মাচাদো। তবে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে ভেনেজুয়েলার আইন মেনে করা চুক্তি সম্মান করার কথা বলেছেন তিনি।
জানুয়ারিতে এক বৈঠকে মাচাদো নিজের নোবেল পদক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেন। তবে নোবেল কমিটির নিয়ম অনুযায়ী, শান্তি পুরস্কার হস্তান্তরযোগ্য নয়।
তা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসন মাচাদোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলেনি। জুনে ভেনেজুয়েলায় ভয়াবহ দুটি ভূমিকম্পের পর দেশে ফেরার জন্য সহায়তা চাইলে তাঁকে জানানো হয়, তাঁর প্রত্যাবর্তন পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। এ নিয়ে দুই পক্ষের সম্পর্কে টানাপোড়েন দেখা দেয়।
দেশে ফেরার পর নির্বাচনের দাবি

মাচাদোর প্রত্যাবর্তনকে গণতান্ত্রিক উত্তরণ ও অবাধ, সুষ্ঠু এবং যাচাইযোগ্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করেছেন তাঁর মুখপাত্র ডেভিড স্মোলানস্কি।
রোববার মাচাদোর দেশে ফেরার বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ট্রাম্প তাঁকে “খুব ভালো একজন নারী” বলে বর্ণনা করেন। তবে ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বে মাচাদোর ভূমিকার প্রতি সরাসরি সমর্থন জানাননি তিনি। ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ড ভালোভাবে এগোচ্ছে এবং মাচাদো নিরাপদে থাকবেন বলে তিনি আশা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ভেনেজুয়েলায় সমঝোতার যে প্রচেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থন করছে, তার ফলেই মাচাদোর নিরাপদে ফেরার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচনের কোনো সময়সীমা তিনি জানাননি। রুবিওর ভাষ্য, ভেনেজুয়েলার সব রাজনৈতিক পক্ষের স্বাধীনতা ও অধিকার সম্মান করতে হবে এবং চলমান আলোচনায় অংশ নিতে হবে। তাঁর মতে, গত ৩০ বছরের মধ্যে এই আলোচনাই শান্তিপূর্ণভাবে অবাধ নির্বাচন ও স্থায়ী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বড় সুযোগ।
মাচাদোর মুখপাত্রও তাঁর প্রত্যাবর্তনে সহযোগিতার জন্য ট্রাম্প, রুবিও, যুক্তরাষ্ট্র সরকার, কংগ্রেস এবং মিত্র দেশগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তবে দেশে ফেরার মধ্য দিয়ে মাচাদো নির্বাচনের দাবি কতটা এগিয়ে নিতে পারবেন, তা নির্ভর করবে ভেনেজুয়েলার চলমান রাজনৈতিক সমঝোতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী অবস্থানের ওপর।












