একটি সমাজে মানুষের জীবনের মূল্য কতটা, তা বোঝার জন্য শুধু হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা গুনলেই চলে না। দেখতে হয়, মানুষ কীভাবে এসব মৃত্যুকে গ্রহণ করছে, অপরাধের প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্র কী করছে এবং জনপরিসরে সহিংসতার পক্ষে কত সহজে যুক্তি দাঁড় করানো হচ্ছে। পাকিস্তানে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এই প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। ভয়াবহ অপরাধের পর ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে, অপরাধীদের শাস্তির দাবি উঠছে, কিন্তু সেই শাস্তি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হবে কি না, সে বিষয়ে উদ্বেগজনক উদাসীনতাও দেখা যাচ্ছে।
মুলতানে ১৪ বা ১৫ বছর বয়সী এতিম কিশোর ওয়াসিম আব্বাসকে একটি গাড়ির ধাক্কায় দেয়ালের সঙ্গে পিষে ফেলার দৃশ্য এ সপ্তাহে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। একটি আবাসন এলাকায় ঠিকাদার তৌকির নাজিরের অধীনে শিক্ষানবিশ ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ করত ওয়াসিম। সোমবার অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগ করার পর তৌকির গাড়ি নিয়ে তার পিছু নেন। এরপর যে ঘটনা ঘটে, তার দৃশ্য সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে দেয়। ওয়াসিম ঘটনাস্থলেই মারা যায়। পুলিশ পরে তৌকিরকে আটক করে।
কিন্তু ঘটনাটির পরিণতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বুধবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের (সিসিডি) এক মুখপাত্র জানান, বাহাওয়ালপুরে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে তৌকির নিহত হয়েছেন। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রিমান্ডে থাকা অবস্থায় তিনি হেফাজত থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পরে নর্দার্ন বাইপাস এলাকায় মোটরসাইকেলে থাকা দুজনকে থামানোর চেষ্টা করলে গোলাগুলি শুরু হয়। এতে তৌকির আহত হন এবং পরে মারা যান।
এভাবে একটি কিশোরের মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া ক্ষোভ দ্রুত আরেকটি প্রশ্নে গিয়ে ঠেকে: অভিযুক্ত ব্যক্তির মৃত্যুই কি ন্যায়বিচারের সমাপ্তি, নাকি বিচারব্যবস্থার সামনে আরও বড় সংকটের সূচনা?
বিচারবহির্ভূত হত্যার পক্ষে জনসমর্থনের বিপদ
পাকিস্তানে পুলিশের কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ অভিযুক্তদের মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। অপরাধের বিচার নিয়ে মানুষের আস্থাহীনতা, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের শাস্তি না পাওয়ার ধারণা এসব ঘটনার পক্ষে জনমত তৈরি করতে ভূমিকা রাখে। অনেকের কাছে মনে হয়, আদালতের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না; ফলে পুলিশি অভিযানে অভিযুক্তের মৃত্যু যেন দ্রুত প্রতিশোধের একটি গ্রহণযোগ্য উপায়।

কিন্তু এই যুক্তির মধ্যেই বিপদ রয়েছে। অপরাধের অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, অভিযুক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করে দেওয়া এবং আদালতের মাধ্যমে তাঁর অপরাধ প্রমাণ করা এক বিষয় নয়। বিচারবহির্ভূত হত্যার ক্ষেত্রে অভিযোগ, প্রমাণ, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং বিচারিক পর্যালোচনার সুযোগ কার্যত বিলুপ্ত হয়। এতে অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত হওয়ার বদলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি আরও দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
মানবাধিকারকর্মীরা তাই এসব মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের দাবি জানান। তাঁদের বক্তব্যের মূল কথা হলো, অপরাধ দমনের নামে রাষ্ট্র নিজেই যদি আইনগত সীমা অতিক্রম করে, তাহলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে মানুষের হতাশাকেও উপেক্ষা করা যায় না। অপরাধীরা যদি প্রভাব, অর্থ বা দুর্বল তদন্তের সুযোগ নিয়ে শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারে, তাহলে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ জমা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্ষোভের সমাধান বিচারবহির্ভূত হত্যাকে স্বাভাবিক করে তোলা নয়। বরং অপরাধ তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়া এবং শাস্তি কার্যকরের ব্যবস্থাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা জরুরি।
বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, সহিংসতার বিস্তৃত চিত্র
মুলতানের ঘটনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে, যখন পাকিস্তানে আরও কয়েকটি নৃশংস অপরাধ জনমনে আলোড়ন তুলেছে। ইসলামাবাদের আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থী লাইবার আত্মহত্যার ঘটনা দেশজুড়ে শোক ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। অভিযোগ রয়েছে, এক প্রতারক তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং দেশটির ভিসা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছিলেন। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং অভিযুক্তকে বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু মঙ্গলবার ইসলামাবাদ পুলিশ জানায়, লাইবার সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে আটক ব্যক্তি লুট করা অর্থ উদ্ধারের জন্য নেওয়ার সময় পুলিশের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় নিহত হয়েছেন। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মোটরসাইকেলে আসা তাঁর সহযোগীরা তাঁকে ছিনিয়ে নিতে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।
এখানেও একই প্রশ্ন সামনে আসে। অভিযুক্তের মৃত্যু কি প্রতারণার শিকার ব্যক্তির পরিবারকে ন্যায়বিচার দিতে পারে? প্রতারণার অর্থ উদ্ধার, অপরাধের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত করা এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের প্রয়োজন কি এতে শেষ হয়ে যায়? অভিযুক্তের মৃত্যু ঘটনার সব প্রশ্নের উত্তর দেয় না; বরং অনেক ক্ষেত্রে সেগুলোর নিষ্পত্তি আরও কঠিন করে তোলে।
সহিংসতার এই পরিবেশকে শুধু পুলিশি বন্দুকযুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেও দেখা যায় না। মিয়ানওয়ালিতে বোরকা না পরার কারণে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে তার ১৬ বছর বয়সী চাচাতো ভাই হত্যার ঘটনা ঘটেছে। মেয়েটির বাবার সামনেই রাস্তায় তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। গুজরাটে সামান্য উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধের জেরে এক যুবককে তাঁর ভাই নির্মমভাবে হত্যা করেছেন বলেও আরেকটি ঘটনা সামনে এসেছে।
ঘটনাগুলোর পটভূমি আলাদা। কোথাও প্রতারণা, কোথাও পারিবারিক বিরোধ, কোথাও ব্যক্তিগত ক্ষোভ কিংবা পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধ। কিন্তু এসব ঘটনার মধ্যে একটি উদ্বেগজনক মিল রয়েছে: মানুষের জীবন কেড়ে নেওয়ার প্রবণতা ক্রমেই সহজ ও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

যখন প্রতিশোধকে ন্যায়বিচার বলে মনে হয়
মুলতানের অভিযুক্তের মৃত্যুর পর পাঞ্জাব প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিনা পারভেজ বাট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন, মেরিয়াম নওয়াজ শরিফের সরকারে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হচ্ছে। মন্তব্যটি প্রকাশ্যে আসার পর সমালোচনা শুরু হলে তিনি সেটি মুছে ফেলেন। তবে প্রাদেশিক তথ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করার পরও তিনি নিজের অবস্থান সমর্থন করেন।
এ ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ হিনা বাট শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণির প্রতিনিধি এবং উদারপন্থী চিন্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচিত। তা সত্ত্বেও অভিযুক্তের বিচারবহির্ভূত মৃত্যুকে দ্রুত ন্যায়বিচার হিসেবে উপস্থাপনের প্রবণতা দেখা গেছে। রাজনৈতিক পরিচয় বা শিক্ষাগত অবস্থান যে কাউকে সহিংসতার প্রতি সামাজিক সহনশীলতা থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্ত রাখে না, ঘটনাটি তারই ইঙ্গিত দেয়।
এখানে মূল সমস্যা কোনো একজন রাজনীতিকের মন্তব্যের চেয়েও বড়। যখন মানুষ আদালতের রায়, প্রমাণের মূল্যায়ন এবং আইনি প্রক্রিয়ার বদলে অভিযুক্তের তাৎক্ষণিক মৃত্যুকে সন্তোষজনক পরিণতি হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন ন্যায়বিচারের ধারণাই বদলে যেতে থাকে। অপরাধের বিচার আর আইনের প্রয়োগের বিষয় থাকে না; তা প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে মিশে যায়।
এই প্রবণতা বিপজ্জনক, কারণ বিচারবহির্ভূত হত্যাকে একবার গ্রহণযোগ্য বলে মেনে নিলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার ঠেকানোর নৈতিক ও আইনি ভিত্তি দুর্বল হয়। আজ যে ব্যক্তিকে অপরাধী বলে মনে হচ্ছে, কাল অন্য কারও বিরুদ্ধে একই পদ্ধতি প্রয়োগ হতে পারে। যথাযথ তদন্ত ও বিচার ছাড়া কারও অপরাধ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের কোনো সংস্থার হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না।
সমাজের নিষ্ঠুর হয়ে ওঠার অর্থ কী
সমাজের নিষ্ঠুর হয়ে ওঠা বলতে শুধু সহিংস ঘটনার সংখ্যা বৃদ্ধি বোঝায় না। এর অর্থ হলো, চরম সহিংসতা, নিষ্ঠুরতা এবং মানুষকে অমানবিকভাবে বিবেচনা করার প্রবণতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে গৃহীত হতে থাকে। অন্যের যন্ত্রণা দেখে মানুষের প্রতিক্রিয়া কমে যায়, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সামাজিক বাধা দুর্বল হয় এবং জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা ক্ষয়ে যেতে থাকে।
পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের জায়গাটি এখানেই। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অপরাধ এবং মানসিক চাপ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে কঠিন করে তুলছে। দুর্বল শাসনব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি আস্থার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এসব বাস্তবতা সহিংসতার প্রতিটি ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে না, কিন্তু সমাজে হতাশা ও ক্ষোভ জমে থাকার পরিবেশটি বুঝতে সাহায্য করে।
তবে সামাজিক সংকটকে সহিংসতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বরং মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধের কার্যকর তদন্ত, ন্যায়সংগত বিচার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা এখন আরও জরুরি। অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে হেফাজতে মৃত্যু কিংবা কথিত বন্দুকযুদ্ধের প্রতিটি ঘটনা স্বাধীনভাবে তদন্তের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কোনো সমাজের সংকট শুধু তখনই গভীর হয় না, যখন মানুষ পরস্পরকে হত্যা করে। সংকট আরও গভীর হয়, যখন সেই মৃত্যু দেখে অন্যরা মনে করে—এটাই যথাযথ পরিণতি। পাকিস্তানের সামনে তাই প্রশ্নটি কেবল অপরাধ দমন নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, দেশটি কি ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনবে, নাকি সহিংসতাকে সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসেবে মেনে নেওয়ার দিকে এগোবে?
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবে শুধু বিচারব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নয়, মানুষের জীবনের মূল্য সম্পর্কে সমাজের অবস্থানও।













