বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব, যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি না পাওয়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জন করলেই ভালো চাকরি ও আর্থিক নিরাপত্তা মিলবে—দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত এই ধারণা এখন প্রশ্নের মুখে। যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক সময়ে স্নাতক শেষ করা তরুণদের বড় একটি অংশ এমন কাজে যুক্ত, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির প্রয়োজনই নেই। অন্যদিকে নেপাল, ভারত ও ফ্রান্সে তরুণদের ক্ষোভ রূপ নিচ্ছে আন্দোলন ও বিক্ষোভে।
চাকরির বাজারে এই অসংগতি শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, বরং সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতারও কারণ হয়ে উঠছে। উচ্চশিক্ষা শেষ করেও প্রত্যাশিত কর্মজীবনে প্রবেশ করতে না পারা তরুণদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা। একই সঙ্গে সমাজে সুযোগের অসম বণ্টন, রাজনৈতিক পরিবারের সন্তানদের বিশেষ সুবিধা এবং শিক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।
যুক্তরাষ্ট্রে ৪২ শতাংশ স্নাতক যোগ্যতার চেয়ে নিচের চাকরিতে
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের শ্রমবাজারসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনে দেশটিতে ২২ থেকে ২৭ বছর বয়সী সাম্প্রতিক বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতকদের প্রায় ৪২ শতাংশ এমন চাকরিতে কাজ করছিলেন, যেসব পদের জন্য সাধারণত স্নাতক ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করেও তাঁদের বড় একটি অংশ শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ পাচ্ছেন না।
মে মাসে এই হার ছিল ৪১ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৫ সালের নভেম্বরে তা বেড়ে ৪২ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছেছিল। ২০২০ সালের অক্টোবরে মহামারিকালীন পরিস্থিতিতে হারটি ৪৩ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছিল। সাম্প্রতিক হার সেই সর্বোচ্চ অবস্থানের কাছাকাছি রয়েছে।
শুধু যোগ্যতার তুলনায় নিচের পদে কাজ করাই নয়, চাকরি না পাওয়ার সমস্যাও উদ্বেগজনক। ২০২৬ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক স্নাতকদের বেকারত্বের হার ছিল ৫ দশমিক ৭ শতাংশ। দেশটির সব বয়সের কর্মীর সামগ্রিক বেকারত্বের হার ছিল ৪ দশমিক ১ শতাংশ।
দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতাও পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয়। ১৯৯০ সালে তথ্য সংগ্রহ শুরুর পর থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত মাত্র আট মাস সাম্প্রতিক স্নাতকদের বেকারত্বের হার দেশের গড় বেকারত্বের চেয়ে বেশি ছিল। কিন্তু ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে প্রতি মাসেই তাঁদের বেকারত্বের হার সামগ্রিক হারের ওপরে রয়েছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলে দুই হারের ব্যবধান রেকর্ড ১ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্টে পৌঁছেছিল। এরপরও ব্যবধানটি সেই রেকর্ডের কাছাকাছি রয়েছে।
সব বিষয়ে পড়াশোনার পরিণতি এক নয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি থাকলেও কোন বিষয়ে পড়াশোনা করা হয়েছে, তার ওপর চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই নির্ভর করছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৪ সালের জনশুমারির তথ্য ব্যবহার করে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অপরাধবিচার বিষয়ে পড়াশোনা করা স্নাতকদের মধ্যে ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ এমন চাকরিতে ছিলেন, যেখানে সাধারণত স্নাতক ডিগ্রির প্রয়োজন হয় না। অভিনয় ও পরিবেশনশিল্পে এই হার ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং চারুকলায় ৫৮ দশমিক ৯ শতাংশ।
বেকারত্বের ক্ষেত্রেও কিছু বিষয়ে পড়াশোনা করা তরুণেরা বেশি সমস্যায় পড়ছেন। কম্পিউটার প্রকৌশলে স্নাতকদের বেকারত্বের হার ছিল ৭ দশমিক ৮ শতাংশ, যা বিভিন্ন শিক্ষাবিষয়ের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কম্পিউটার বিজ্ঞানে এই হার ছিল ৭ শতাংশ।
অন্যদিকে শিক্ষাবিষয়ক কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভালো। বিশেষ শিক্ষায় স্নাতকদের বেকারত্বের হার ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ। প্রাথমিক শিক্ষায় তা ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং নার্সিংয়ে ২ দশমিক ১ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, শুধু উচ্চশিক্ষা অর্জন করলেই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা তৈরি হয় না। কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করা হচ্ছে এবং শ্রমবাজারে সেই দক্ষতার চাহিদা কতটা, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চাকাঙ্ক্ষী মানুষের সংখ্যা বেশি, সুযোগ কম
সমাজবিজ্ঞানী ও জটিলতাবিষয়ক গবেষক পিটার টারচিন এই পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে ‘এলিট ওভারপ্রোডাকশন’ বা অভিজাত শ্রেণিতে অতিরিক্ত প্রতিযোগীর ধারণা ব্যবহার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক টারচিনের মতে, কোনো সমাজে প্রভাবশালী অবস্থানে পৌঁছাতে আগ্রহী ও সেই লক্ষ্যে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা যখন উপলব্ধ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায়, তখন হতাশা ও অসন্তোষ জমতে থাকে।
তাঁর ব্যাখ্যায়, এই ধরনের পরিস্থিতি সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ হতে পারে। এর সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়া এবং সরকারের আর্থিক সংকট যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
টারচিনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সমাজে উচ্চশিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে মর্যাদাপূর্ণ চাকরি তৈরি হচ্ছে না। ফলে যাঁরা ভালো অবস্থানে পৌঁছানোর জন্য বছরের পর বছর পড়াশোনা করেছেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছেন।
একসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিকে উন্নত জীবন ও ভালো আয়ের গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাকরির প্রতিযোগিতাও তীব্র হয়েছে। ফলে একটি সনদের বাজারমূল্য আগের মতো থাকছে না—এমন যুক্তি তুলে ধরেছেন টারচিন।
তাঁর বিশ্লেষণে, উচ্চশিক্ষিত কিন্তু প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে না পারা মানুষের মধ্যে হতাশা দীর্ঘস্থায়ী হলে তা রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভে রূপ নিতে পারে।
নেপালে ‘নেপো কিডস’ বিতর্ক থেকে গণবিক্ষোভ
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নেপাল সরকার ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধ করার পর দেশটিতে তরুণদের বিক্ষোভ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যে বিক্ষোভকারীরা সরকারি ভবন ও রাজনীতিকদের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন। পরিস্থিতির চাপে পদত্যাগ করেন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি। ওই সহিংসতায় অন্তত ৭৬ জনের মৃত্যু হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিক ক্ষোভের কারণ হলেও আন্দোলনের পেছনে আরও গভীর অসন্তোষ ছিল। তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ‘নেপো কিডস’ হ্যাশট্যাগ। এর মাধ্যমে রাজনীতিকদের সন্তানদের বিলাসবহুল জীবনযাপন ও বিশেষ সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়।
যে দেশে তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ২১ শতাংশ, সেখানে রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের পরিবারের সদস্যদের বিলাসী জীবন সামাজিক বৈষম্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। অনেক তরুণের প্রশ্ন ছিল, সাধারণ মানুষ যখন চাকরি ও জীবিকার সুযোগ পেতে লড়াই করছেন, তখন ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা কীভাবে এত সহজে সুবিধা পাচ্ছেন?
এই ক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয় কর্মসংস্থানের অভাব, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থার সংকট।
ভারতে ‘তেলাপোকা’ মন্তব্য থেকে নতুন প্রতিবাদী আন্দোলন
ভারতেও শিক্ষিত বেকার তরুণদের অসন্তোষ নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপ নিয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দেশটির প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কিছু কর্মী ও বেকার তরুণকে ‘তেলাপোকা’ এবং ‘সমাজের পরজীবী’ বলে তুলনা করেন। পরে তিনি ব্যাখ্যা দেন, তাঁর মন্তব্যটি ভুয়া ডিগ্রিধারীদের উদ্দেশে ছিল।
তবে মন্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। পরদিন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ৩০ বছর বয়সী অভিজিৎ দীপক এক্সে প্রশ্ন তোলেন, ‘সব তেলাপোকা যদি একসঙ্গে জড়ো হয়, তাহলে কী হবে?’
এই ব্যঙ্গাত্মক বক্তব্য থেকেই গড়ে ওঠে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা তেলাপোকা জনতা পার্টি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টিকে ব্যঙ্গ করে তৈরি এই উদ্যোগ পরে প্রতিবাদী আন্দোলনের রূপ নেয়।
আন্দোলনটির অন্যতম লক্ষ্য হয়ে ওঠে বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ। এসব পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে বহু তরুণের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের ভবিষ্যৎ। বিশেষ করে চিকিৎসক হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাকে ঘিরে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ায়।
পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই জুলাই মাসে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এই ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, চাকরি ও শিক্ষার সুযোগের সংকটের পাশাপাশি নিয়োগ ও পরীক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থার অভাবও তরুণদের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ফ্রান্সে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ নিয়ে ক্ষোভ
ফ্রান্সে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পদ্ধতি নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। দেশটির কিছু শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে ‘পারকুরসুপ’ নামের জাতীয় ভর্তি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ বণ্টন নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।
অক্টোবরের মধ্যে ফ্রান্সের প্রায় ৩ হাজার ৭০০টি উচ্চবিদ্যালয়ের এক-তৃতীয়াংশের কার্যক্রম কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়। ১৭ অক্টোবর দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমেছিলেন। আন্দোলন পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত হয়। কয়েকটি শহরে বিক্ষোভ সহিংস রূপও নেয়।
ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও ২ লাখ ৫০ হাজার আসন তৈরি করতে হবে। তবে উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ বাতিস্ত পারকুরসুপ ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিলের দাবিকে ‘খাঁটি জনতুষ্টিবাদ’ বলে মন্তব্য করেছেন।
এখানেও মূল দ্বন্দ্বটি সুযোগের বণ্টন নিয়ে। তরুণেরা আরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় আসন ও শিক্ষার সুযোগ চাইছেন। কিন্তু সরকারের পক্ষে সেই চাহিদা পূরণে অর্থ জোগাড় করা সহজ নয়। ফ্রান্সের সরকারি ঋণ আগামী বছর দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের ১২১ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে।
ফ্রান্সের বাইরেও বেলজিয়াম, আলবেনিয়া, গ্রিস ও ইতালিতে তরুণদের বিক্ষোভ ছড়িয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ ক্রমেই বড় সামাজিক আলোচনায় পরিণত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রও কি ইতালির পথে?
যুক্তরাষ্ট্রে এখনো নেপাল বা ফ্রান্সের মতো বড় আকারের তরুণ আন্দোলন দেখা যায়নি। তবে দেশটির শ্রমবাজারে তরুণদের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস-এর কলামিস্ট রানা ফোরুহার যুক্তি দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি কিছুটা ইতালির মতো হয়ে উঠছে। ইতালিতে বয়স্ক কর্মীরা ভালো চাকরি ধরে রাখছেন, অথচ তরুণেরা মানসম্মত কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছেন।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান প্রতিবেদনে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের বেকারত্বের হার ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। ২৫ থেকে ৫৪ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে তা ৩ দশমিক ৬ শতাংশ এবং ৫৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ।
ইতালিতে তরুণদের বেকারত্বের হার আরও বেশি—প্রায় ২০ শতাংশ। তবে দুই দেশের মধ্যে একটি মিল রয়েছে। মধ্যবয়সী কর্মীদের তুলনায় তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় দ্বিগুণ।
ফোরুহারের মতে, এ পরিস্থিতির পেছনে কর্মক্ষেত্রে অভিজ্ঞ কর্মীদের সুবিধাজনক অবস্থান একটি কারণ। পাশাপাশি এআইয়ের ব্যবহার বাড়ায় প্রবেশপর্যায়ের কিছু চাকরির সুযোগ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের জনশুমারি ব্যুরোর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এআইয়ের সংস্পর্শে বেশি থাকা ক্ষেত্রগুলোতে পড়াশোনা করা স্নাতকদের প্রথম চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা ৫ শতাংশ পয়েন্ট কমেছে। তাঁদের আয়ও ১৩ শতাংশ কম ছিল। তবে এই ফলাফল নির্দিষ্ট ক্ষেত্র ও সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে পাওয়া; তাই এআই একাই চাকরির সংকটের কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
টারচিনের তত্ত্ব ব্যাখ্যা করে, কেন উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণের সংখ্যা উপলব্ধ সুযোগের তুলনায় বেশি হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে ফোরুহারের বিশ্লেষণ সামনে আনে আরেকটি সমস্যা—কর্মক্ষেত্রে আগে থেকে অবস্থান তৈরি করা ব্যক্তিরা সহজে সরে না গেলে নতুনদের প্রবেশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।
স্নাতকদের যোগ্যতার সঙ্গে চাকরির ব্যবধান কি নতুন?
সাম্প্রতিক স্নাতকদের যোগ্যতার তুলনায় নিচের পদে কাজ করার সমস্যা অবশ্য নতুন নয়। স্ট্রাডা এডুকেশন ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ পরিচালক অ্যান্ড্রু হ্যানসনের মতে, স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণদের মধ্যে এই হার ঐতিহাসিকভাবে প্রায় ৪০ শতাংশের কাছাকাছি থেকেছে। সাধারণত তা প্রায় ১০ শতাংশ পয়েন্টের মধ্যে ওঠানামা করেছে।
নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের পর থেকে সাম্প্রতিক স্নাতকদের মধ্যে এই হার প্রায় ৩৮ থেকে ৪৭ শতাংশের মধ্যে ছিল।
তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন কী? মূল পরিবর্তনটি বেকারত্বের চিত্রে। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীরা সাধারণত অন্য কর্মীদের তুলনায় বেকার হওয়ার ঝুঁকিতে কম থাকতেন। পড়াশোনা শেষ করে কয়েক বছর সাময়িক বা কম যোগ্যতার চাকরি করার পর ভালো পেশায় প্রবেশের আশা করা যেত।
কিন্তু এখন বিভিন্ন দেশে তরুণদের সামনে প্রশ্নটি আরও কঠিন হয়ে উঠছে—সাময়িকভাবে যোগ্যতার নিচের চাকরি করার পর কি সত্যিই কাঙ্ক্ষিত কর্মজীবনে পৌঁছানো সম্ভব, নাকি সেই চাকরিই দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবতা হয়ে থাকবে?
নেপাল, ভারত ও ফ্রান্সের ঘটনাগুলো দেখায়, শিক্ষিত তরুণেরা যখন মনে করেন সুযোগ বণ্টনের ব্যবস্থা ন্যায্য নয়, তখন তাঁদের ক্ষোভ শুধু ব্যক্তিগত হতাশায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাব্যবস্থা এবং ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি অর্জনের পেছনে সময়, অর্থ ও শ্রম বিনিয়োগ করেন শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবার। সেই বিনিয়োগের বিনিময়ে সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও উন্নত জীবনের প্রত্যাশা থাকাই স্বাভাবিক। কিন্তু অর্থনীতি যদি পর্যাপ্ত মানসম্মত চাকরি তৈরি করতে না পারে, আর বিদ্যমান সুযোগের বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন বাড়তে থাকে, তাহলে উচ্চশিক্ষার প্রতিশ্রুতি তরুণদের কাছে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তরুণদের অসন্তোষ কমাতে তাই শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে আসন বাড়ানো বা আরও বেশি ডিগ্রি দেওয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দক্ষতার সঙ্গে চাকরির বাজারের চাহিদার সমন্বয়, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা, কর্মক্ষেত্রে নতুনদের প্রবেশের সুযোগ এবং অর্থনৈতিকভাবে টেকসই কর্মসংস্থান তৈরি করা। অন্যথায় ডিগ্রিধারী তরুণদের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের জন্ম দিতে পারে।












