বাজারে ভেজাল মধুর দাপটে আসল মধু চেনা যখন ক্রেতাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে, তখন সাতক্ষীরার এক তরুণ উদ্যোক্তা দেখাচ্ছেন ভিন্ন পথ। তাঁর স্বপ্ন, দেশের প্রতিটি বাড়িতে থাকবে একটি করে মৌচাক। পরিবারের সদস্যরা নিজেরাই সংগ্রহ করবেন প্রাকৃতিক মধু, আর মৌমাছি সহায়তা করবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও কৃষির উৎপাদন বাড়াতে।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ছুপরিয়া গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা সাদ্দাম হোসেন গত এক দশকে মৌচাষের প্রতি নিজের আগ্রহকে ছোট পরিসরের ব্যবসায় রূপ দিয়েছেন। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ির ছাদে, মসজিদের কার্নিশে, প্রাতিষ্ঠানিক ভবনে এবং বাগানের পাশে কাঠের তৈরি ২০০টি মৌবাক্স স্থাপন করেছেন তিনি।
গাছের কোটর ও ফাঁকে স্বাভাবিকভাবে বাসা বাঁধে এমন ছোট প্রজাতির মৌমাছি এসব বাক্সে মধু জমা করে। সাদ্দাম সেই মধু সংগ্রহ করে বোতলজাত করেন এবং ‘মৌমাছি কুটির’ নামে নিজের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিক্রি করেন। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) অনুমোদন নিয়ে পরিচালিত এ উদ্যোগ থেকে বছরে তাঁর আয় প্রায় সাড়ে তিন থেকে চার লাখ টাকা।
তবে শুধু ব্যবসার প্রসার নয়, মানুষের কাছে প্রাকৃতিক মধু পৌঁছে দেওয়া এবং তরুণদের স্বাবলম্বী করে তোলাও তাঁর লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যে ১০ জন তরুণকে মৌচাষের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন তিনি।
প্রতিটি বাড়িতে মৌচাকের স্বপ্ন

সাদ্দামের বিশ্বাস, প্রতিটি বাড়িতে একটি করে মৌচাক থাকলে পরিবারের প্রয়োজনীয় মধু নিজেরাই সংগ্রহ করতে পারবে। এতে বাজারের মধুর বিশুদ্ধতা নিয়ে অনিশ্চয়তা কমবে এবং মানুষ খাবারের গুণমান সম্পর্কে আরও সচেতন হবে।
তাঁর উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়ে ইতিমধ্যে প্রায় ৮০ জন নিজেদের বাড়ি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে মৌবাক্স স্থাপন করেছেন। তাঁরা সেখান থেকে মধু সংগ্রহ করে পারিবারিক চাহিদা মেটাচ্ছেন।
মৌচাক থেকে সরাসরি মধু সংগ্রহের অভিজ্ঞতা অনেকের কাছেই নতুন। কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, এর আগে তিনি সরাসরি মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহের প্রক্রিয়া দেখেননি। সাদ্দামের কাছ থেকে পরিবারের জন্য মধুর পাশাপাশি একটি মৌবাক্সও কিনেছেন তিনি।
সাদ্দাম মনে করেন, এভাবে মানুষ মধু সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিজের চোখে দেখতে পারলে প্রাকৃতিক মধু সম্পর্কে আস্থা বাড়বে। একই সঙ্গে মৌমাছির পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কেও সচেতনতা তৈরি হবে।
কৃষিতে মৌমাছির অবদান
সাতক্ষীরায় মৌচাষের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী বিসিকের কর্মকর্তারাও। বিসিকের সাতক্ষীরা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক গৌরব দাস জানান, জেলায় বর্তমানে নিবন্ধিত প্রায় ৬০০ জন মৌচাষি রয়েছেন। তাঁদের প্রশিক্ষণ ও ঋণপ্রাপ্তির সুযোগের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে মৌমাছির সংখ্যা সংরক্ষণ ও বাড়ানোর গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি। সাতক্ষীরাসহ কয়েকটি উপকূলীয় জেলায় মৌচাষ, প্রশিক্ষণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ বিবেচনায় রয়েছে বলেও জানান গৌরব দাস।
কৃষির জন্যও মৌমাছির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ফুলে ফুলে বিচরণের সময় মৌমাছি পরাগায়ণে সহায়তা করে, যা ফসল উৎপাদনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক জামাল উদ্দিন জানান, শুধু সরিষা ও বরই ফুল থেকে জেলায় বছরে দুই কোটি টাকার বেশি মধু সংগ্রহ করা হয়। এ কার্যক্রম মৌচাষিদের আয়ের পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং পরাগায়ণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনেও অবদান রাখে।

ভুল ধারণায় বাধাগ্রস্ত মৌচাষ
সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও মৌচাষ সম্প্রসারণে বাধা রয়েছে। সাদ্দাম জানান, সাতক্ষীরার কিছু বরইবাগানের মালিক মৌবাক্স স্থাপনের অনুমতি দিতে চান না। তাঁদের আশঙ্কা, মৌমাছি ফুলের ক্ষতি করবে কিংবা ফলন কমিয়ে দেবে।
কিন্তু কৃষি কর্মকর্তাদের বক্তব্য ভিন্ন। জামাল উদ্দিন বলেন, মৌমাছি ফুল ও ফসলের জন্য উপকারী। সচেতনতার অভাবে কিছু সরিষা ও বরইচাষি কখনো কখনো মৌবাক্স নষ্ট করেন, এতে মৌচাষিরা ক্ষতির মুখে পড়েন। কৃষকদের মৌমাছির উপকারিতা বোঝাতে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সাদ্দামও গবেষক, কৃষি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ চান। তাঁর মতে, কৃষকদের ভুল ধারণা দূর করা গেলে বাগানমালিক ও মৌচাষিরা একসঙ্গে কাজ করতে পারবেন।
এদিকে বিশুদ্ধ মধুর চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীদের ভেজাল পণ্য বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। বিসিক কর্মকর্তারা ভেজাল মধু বিক্রির সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে প্রশাসনকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন।
সাদ্দামের কাছে সাফল্য মানে শুধু নিজের মৌবাক্সের সংখ্যা বাড়ানো কিংবা ব্যবসার আয় বৃদ্ধি নয়। আরও বেশি পরিবারকে মৌচাষে যুক্ত করা এবং তরুণদের বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করাই তাঁর বড় লক্ষ্য। ২০০টি মৌবাক্স দিয়ে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ কত দূর এগোবে, তা ভবিষ্যৎ বলবে। তবে তাঁর স্বপ্ন স্পষ্ট—প্রকৃতির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলে প্রতিটি পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়া প্রাকৃতিক মধু।












