ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের প্রণীত ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছে দেশটির ২১টি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান। তাদের অভিযোগ, আইনটির বিভিন্ন বিধান অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সংকুচিত করতে পারে, সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্মতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি করতে পারে এবং সাংবাদিকদের গোপন সূত্রের পরিচয় প্রকাশের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
চ্যালেঞ্জ জানানো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতের দুই ধনকুবের মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির মালিকানাধীন সংবাদমাধ্যমও। আম্বানির নেটওয়ার্ক১৮, আদানির এনডিটিভি ছাড়াও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও টাইমস ইন্টারনেটের মতো প্রতিষ্ঠান এই উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টে ৬ অক্টোবর করা আবেদনটির কথা প্রথম প্রকাশ করেছে রয়টার্স। মঙ্গলবার মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা। মোদি সরকারের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের বিরুদ্ধে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আলোচিত আইনি চ্যালেঞ্জ।

সাংবাদিকতায় সম্মতির বাধ্যবাধকতা নিয়ে উদ্বেগ
ভারত সরকার ডিজিটাল ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার উদ্দেশ্যে গত বছর আইনটি বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়। এর ফলে মেটা ও গুগলের মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি তথ্য ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপরও নতুন নিয়ম মানার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।
তবে ডিজিটাল নিউজ পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডিএনপিএ) সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া গোপনীয় আবেদনে বলেছে, সংবাদমাধ্যমকে আইনের আওতার বাইরে না রাখায় সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংগঠনটির অন্যতম উদ্বেগ, কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির আগে সাংবাদিকদের যদি তাঁর সম্মতি নিতে হয়, তাহলে তদন্তের বিষয়বস্তু আগেই প্রকাশ হয়ে যেতে পারে। এতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি প্রমাণ নষ্ট করতে বা সাক্ষীদের ভয় দেখাতে পারেন।
আবেদনে আরও বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি যেকোনো সময় তাঁর সম্মতি প্রত্যাহার করে ব্যক্তিগত তথ্য মুছে ফেলার দাবি জানাতে পারবেন। জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদের ক্ষেত্রে এই ক্ষমতার ব্যবহারে সুস্পষ্ট সুরক্ষা না থাকলে সংবাদমাধ্যমকে প্রতিবেদন সরিয়ে নিতে বা গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিতে বাধ্য করা হতে পারে।
ডিএনপিএর মতে, এসব বিধান অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাকে কার্যত দুর্বল করে দিতে পারে।

গোপন সূত্রের পরিচয় প্রকাশের আশঙ্কা
আইনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলো। নতুন বিধান অনুযায়ী, ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে কাজ করা কোনো প্রতিষ্ঠানকে সরকার প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দিতে পারবে। সংবাদমাধ্যমের আশঙ্কা, এই ক্ষমতা ব্যবহার করে সাংবাদিকদের কাছে থাকা গোপন নথি কিংবা তথ্যদাতার পরিচয় জানতে চাওয়া হতে পারে।
ডিএনপিএ বলেছে, দুর্নীতি, করপোরেট অনিয়ম কিংবা নির্বাচনী কারচুপি সম্পর্কে তথ্য দিতে আগ্রহী ব্যক্তিরা এতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন। একই সঙ্গে আইন অমান্যের অভিযোগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জরিমানা আরোপ করতে পারবে এবং জনস্বার্থের কথা উল্লেখ করে নির্দিষ্ট তথ্যের প্রবেশাধিকার বন্ধ করার ক্ষমতাও পাবে।
সংগঠনটির দাবি, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সিঙ্গাপুর ও যুক্তরাজ্যের মতো সাংবাদিকতার জন্য সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম বা সুরক্ষা ভারতে রাখা হয়নি। আগস্টে সরকারের সঙ্গে বৈঠকে সংবাদমাধ্যমগুলো আশ্বাস পেলেও লিখিত সুরক্ষা না থাকায় তাদের উদ্বেগ কাটেনি।

২০২৭ সালের মে থেকে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা আইনের বিতর্কিত অধিকাংশ বিধান বাতিলের দাবি জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমগুলো।
ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক
মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কমেছে বলে অভিযোগ করে আসছেন সমালোচকেরা। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের বিশ্ব সংবাদমাধ্যম স্বাধীনতা সূচকে ভারতের অবস্থান ২০২৬ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৫৭তম, যা ২০১৪ সালে ছিল ১৪০তম।
তবে ভারত সরকার এসব মূল্যায়ন প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, দেশটিতে শত শত সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল নিয়ে প্রাণবন্ত সংবাদমাধ্যমের পরিবেশ রয়েছে এবং বিদেশি সংস্থার স্বীকৃতির প্রয়োজন নেই।
মামলার বিষয়ে ডিএনপিএ, সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠান এবং ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়ার অনুরোধে সাড়া দেয়নি।












