সেন্ট মার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরে ছোট একটি দ্বীপ (ইংরেজিতে Saint Martin’s Island)। এটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফের কাছে, মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৯ থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে। আয়তন প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার, আর স্থানীয়ভাবে এর নাম নারিকেল জিঞ্জিরা।
এক নজরে
- অবস্থান: বঙ্গোপসাগর, কক্সবাজার জেলার টেকনাফের কাছে
- মূল ভূখণ্ড থেকে দূরত্ব: প্রায় ৯ থেকে ১০ কিলোমিটার
- আয়তন: প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার
- স্থানীয় নাম: নারিকেল জিঞ্জিরা
- পরিচিতি: দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ বলে পরিচিত, যদিও গবেষকেরা একে প্রবালসমৃদ্ধ পাথুরে দ্বীপও বলেন
- বাসিন্দা: বেশির ভাগই জেলে
- ঘুরতে যাওয়ার মৌসুম: সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ কোথায়
দ্বীপটি কক্সবাজার জেলার অংশ। মূল ভূখণ্ডের সবচেয়ে কাছের জায়গা টেকনাফ, যা কক্সবাজার থেকে নেমে আসা সরু উপদ্বীপের একেবারে দক্ষিণ মাথায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দ্বীপটি এই উপদ্বীপের মাথা থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে। সরকারি পর্যটন তথ্যে দূরত্ব বলা হয়েছে প্রায় ১০ কিলোমিটার।
হিসাবের এই সামান্য ফারাক স্বাভাবিক। কারণ কোন বিন্দু থেকে মাপা হচ্ছে, তার ওপর দূরত্ব নির্ভর করে। তাই “প্রায় ৯ থেকে ১০ কিলোমিটার” বললেই ঠিক হয়।
বাংলাদেশের সবচেয়ে দক্ষিণের অংশ হিসেবে এই দ্বীপকে ধরা হয়। এর দক্ষিণে ছেঁড়াদিয়া নামে আরেকটি ছোট দ্বীপ আছে। সেটি আলাদা একটি দ্বীপ, সেন্ট মার্টিনেরই অংশ নয়।
সেন্ট মার্টিনকে নারিকেল জিঞ্জিরা বলা হয় কেন
স্থানীয় মানুষ দ্বীপটিকে নারিকেল জিঞ্জিরা নামেই ডাকেন। বাংলাপিডিয়াতেও এই নামটি আছে। দ্বীপে প্রচুর নারকেল গাছ জন্মায়, আর সেই কারণেই নামের সঙ্গে নারিকেল জুড়েছে।
নামের বানান নিয়ে অনেকে দ্বিধায় পড়েন। কেউ লেখেন সেন্ট মার্টিন, কেউ সেন্টমার্টিন। মানুষ দুই রকম বানানেই খোঁজে, তবে দুটি দিয়েই একই দ্বীপকে বোঝানো হয়।
দ্বীপের গাছপালার মধ্যে নারকেলই সবচেয়ে চোখে পড়ে। বাসিন্দাদের জীবনও অনেকটা সাগর আর এই গাছপালার ওপর নির্ভর করে।
সেন্ট মার্টিন কি সত্যিই প্রবাল দ্বীপ
বাংলাদেশে সেন্ট মার্টিনকে একমাত্র প্রবাল দ্বীপ বলা হয়। সরকারি পর্যটন তথ্য আর বাংলাপিডিয়া, দুটিতেই এই পরিচয় আছে। তবে বিজ্ঞানের ভাষায় একটু আলাদা কথাও শোনা যায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের গবেষক শাহনেওয়াজ চৌধুরী বলেন, সেন্ট মার্টিন আসলে প্রবালসমৃদ্ধ পাথুরে দ্বীপ। তাঁর মতে দ্বীপটি মূলত পাললিক শিলা আর বালুতে গড়া, আর তার চারপাশে প্রবালের কলোনি আছে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনাও এর সঙ্গে মেলে। সেখানে বলা হয়েছে, দ্বীপের শিলা খোলসযুক্ত চুনাপাথর আর প্রবালযুক্ত চুনাপাথর।
প্রবাল কী, সেটাও সহজ করে বলা যায়। প্রবাল আসলে ছোট ছোট সামুদ্রিক প্রাণীর দল। তারা চুনের শক্ত খোলস বানিয়ে একসঙ্গে বাস করে। পরিষ্কার পানি আর বেশি লবণের সাগর তাদের জন্য ভালো। সেন্ট মার্টিনের আশপাশে পানিতে কাদা কম, তাই প্রবাল বেড়ে উঠতে পারে।
প্রবাল খুব সংবেদনশীল। পানি নোংরা হলে বা কাদা বেড়ে গেলে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কেউ জোর করে ভেঙে নিলে একবার যা যায়, তা ফিরতে অনেক সময় লাগে।
১৯৯৭ সালের এক গবেষণায় এই এলাকায় ৬৬ প্রজাতির প্রবালের কথা জানা গিয়েছিল। নামে “প্রবাল দ্বীপ” বলুন আর “প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ”, আসল কথা একটাই। প্রবালগুলো বাঁচিয়ে রাখা দরকার।
সেন্ট মার্টিন কত বড়, কারা থাকেন
দ্বীপের আয়তন প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার। এই সংখ্যা সরকারি পর্যটন তথ্য আর একটি গবেষণাভিত্তিক বিবরণে মেলে। কিছু লেখায় আয়তন নিয়ে ভিন্ন সংখ্যাও দেখা যায়। এখানে শুধু সেই সংখ্যাই দেওয়া হলো, যা একাধিক সূত্রে পাওয়া গেছে।
দ্বীপে স্থায়ীভাবে কয়েক হাজার মানুষ থাকেন। তাঁদের বেশির ভাগই জেলে। সাগরে মাছ ধরা তাঁদের প্রধান জীবিকা। বাসিন্দার সঠিক সংখ্যা বিভিন্ন সূত্রে বিভিন্ন রকম পাওয়া যায়, তাই এখানে নির্দিষ্ট সংখ্যা দেওয়া হলো না।
আকারে ছোট হলেও দ্বীপে নারকেল বাগান, সৈকত আর সাগরের ঢেউ মিলে আলাদা একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই ছোট জায়গাটিই প্রতি বছর অনেক পর্যটককে টানে।
সেন্ট মার্টিনে যাওয়ার সময় ও পথ
সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটকেরা সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি, এই প্রায় চার মাসে যান। বাংলাপিডিয়াতেও পর্যটনের এই মৌসুমের কথা আছে। বর্ষায় সাগর উত্তাল থাকে, তাই তখন যাতায়াত কঠিন হতে পারে।
পথটা মোটামুটি এমন। প্রথমে বাস বা গাড়িতে টেকনাফ যেতে হয়। সেখান থেকে জাহাজ বা নৌকায় দ্বীপে পৌঁছাতে হয়। সরকারি পর্যটন তথ্য অনুযায়ী এতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টার মতো লাগে। টেকনাফ থেকে লঞ্চ আর দেশি নৌকা নিয়মিত দ্বীপে যাতায়াত করে বলে বাংলাপিডিয়ায় উল্লেখ আছে।
একটি জরুরি কথা মনে রাখুন। প্রতিদিন কতজন যেতে পারবেন, কোন সময়ে যাওয়া যাবে, এসব নিয়ম সরকারি সিদ্ধান্তে বদলাতে পারে। তাই রওনা দেওয়ার আগে সর্বশেষ ঘোষণা দেখে নিন। এ নিয়ে আমাদের প্রতিবেদনটি পড়তে পারেন।
যাওয়ার আগে কী জেনে নেওয়া ভালো
ছোট দ্বীপে সাধারণত খাবার ও পানির সরবরাহ সীমিত থাকে। তাই সঙ্গে প্রয়োজনীয় পানি আর নিজের দরকারি ওষুধ রাখা ভালো। যাত্রার আগে সাগরের আবহাওয়ার খবর দেখে নিন। সাগর উত্তাল থাকলে নৌযান চলাচল বন্ধ থাকতে পারে।
নৌকা বা জাহাজে উঠলে নিরাপত্তার নিয়ম মেনে চলুন। শিশু ও বয়স্কদের জন্য লাইফ জ্যাকেট থাকলে তা পরিয়ে দিন। ভিড় বেশি হলে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া নৌযানে না ওঠাই নিরাপদ।
বাংলাদেশের জন্য সেন্ট মার্টিন কেন গুরুত্বপূর্ণ
এই দ্বীপে প্রবালের কলোনি আছে, যা আমাদের সাগরের জীববৈচিত্র্যের একটি বড় অংশ। প্রবাল মাছ আর অন্য সামুদ্রিক প্রাণীর আশ্রয়ও বটে। তাই প্রকৃতির দিক থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ আমাদের কাছে খুব মূল্যবান।
দ্বীপটি পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকা, সংক্ষেপে ইসিএ হিসেবে ঘোষিত। বাংলাপিডিয়ার তালিকায় সেন্ট মার্টিন এই এলাকাগুলোর একটি। এর মানে এখানে পরিবেশ রক্ষার জন্য বাড়তি নিয়ম থাকে।
অনেক পর্যটক এলে বর্জ্য আর দূষণের চাপও বাড়ে। এই চাপ প্রবাল আর সামুদ্রিক প্রাণীর ক্ষতি করতে পারে। দ্বীপে গেলে কয়েকটি ছোট কাজ করা যায়:
- প্লাস্টিক আর অন্য আবর্জনা সাগরে বা সৈকতে ফেলবেন না।
- প্রবাল, ঝিনুক বা তারামাছ তুলে আনবেন না।
- স্থানীয় নিয়ম আর প্রশাসনের ঘোষণা মেনে চলুন।
টেকনাফ ঘুরে গেলে আশপাশের নদী সম্পর্কেও জানা যায়। সেখানে সাগরে মেশা নদীটির পরিচয় আছে আমাদের নাফ নদী নিয়ে লেখায়।
সাধারণ প্রশ্ন
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ কোথায়?
বঙ্গোপসাগরে, কক্সবাজার জেলার টেকনাফের কাছে। মূল ভূখণ্ড থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৯ থেকে ১০ কিলোমিটার।
সেন্ট মার্টিনের স্থানীয় নাম কী?
স্থানীয় নাম নারিকেল জিঞ্জিরা। দ্বীপে নারকেল গাছ বেশি, তাই এই নাম।
সেন্ট মার্টিন কি বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ?
সাধারণভাবে তা-ই বলা হয়। তবে একজন গবেষক বলেন, এটি প্রবালসমৃদ্ধ পাথুরে দ্বীপ, ঠিক প্রবাল দিয়ে গড়া দ্বীপ নয়।
সেন্ট মার্টিনে ঘুরতে যাওয়ার ভালো সময় কখন?
সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি। তবে যাওয়ার আগে সরকারের সর্বশেষ নিয়ম দেখে নিন।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬












