ভারতের অন্ধ্র প্রদেশ উপকূলে আঘাত হেনেছে প্রবল ঘূর্ণিঝড় অর্ণব। এতে অন্তত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি ও সড়ক, উপড়ে পড়েছে শত শত গাছ ও বিদ্যুতের খুঁটি। বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পরিবহনব্যবস্থায় দেখা দিয়েছে ব্যাপক বিঘ্ন। ঝড়ের প্রভাবে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কায় অন্ধ্র প্রদেশের পাশাপাশি ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গেও ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে উপকূলীয় ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে হাজার হাজার মানুষকে।
ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের (আইএমডি) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত ২টা থেকে সকাল ৮টার মধ্যে অন্ধ্র প্রদেশ-ইয়ানাম উপকূল অতিক্রম করে ঘূর্ণিঝড়টি। এ সময় বাতাসের গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২৫ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার, যা দমকা হাওয়ায় ঘণ্টায় ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। পরে এটি শক্তি হারিয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড় থেকে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়।
অন্ধ্র প্রদেশে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
অন্ধ্র প্রদেশে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে বিশাখাপত্তনম জেলায় কৃষিজমির একটি নালার ওপর ছিঁড়ে পড়া বিদ্যুতের তারে স্পর্শ লেগে মারা যান ৫৩ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। বুধবার সকালে অনাকাপল্লি জেলার ইয়েল্লামাঞ্চিলি শহরে নিজের বাড়ির বাইরে খোলা বিদ্যুতের তারে পা পড়ে প্রাণ হারান ৫৫ বছর বয়সী এক নারী।
উপকূলীয় কয়েকটি জেলায় ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। অনাকাপল্লির কান্নুরিপালেমে সর্বোচ্চ ২৬১ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। বিজয়নগরম জেলার কেভিবিআর স্কুল এলাকায় ২৫৯ দশমিক ৭৪ মিলিমিটার এবং বিশাখাপত্তনমের ১৬তম পুলিশ ব্যাটালিয়ন এলাকায় ২৫৯ দশমিক ০৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
প্রবল বাতাসে কাকিনাড়া জেলায় কয়েক শ গাছ ও ১০০টির কম বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। উপকূলের উপ্পাডা সড়ক সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। আল্লুরি সীতারাম রাজু জেলার তাদিগুডা গ্রামের একটি পুরোনো সেতুও ধসে পড়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে একটি জনপদ। বিশাখাপত্তনম জেলায় প্রায় ৪০০ গাছ পড়ে যাওয়ার পর সড়ক পরিষ্কার ও বিদ্যুৎ পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ
অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী এন চন্দ্রবাবু নাইডু বুধবার সকালে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রায় ৩২ হাজার কর্মকর্তা ও কর্মীর সঙ্গে টেলিকনফারেন্সে তিনি সড়ক থেকে উপড়ে পড়া গাছ দুই ঘণ্টার মধ্যে সরানো এবং জাতীয় মহাসড়ক দ্রুত চলাচলযোগ্য করার নির্দেশ দেন। ঝোড়ো বাতাস কমলে বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরায় চালু করতে বলা হয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত খাবার, পানীয় জল ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কৃষি ও উদ্যান ফসল রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। জলাধার ও খালে ভাঙন ঠেকানো এবং ফসলের ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব তৈরির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীর (এনডিআরএফ) তথ্য অনুযায়ী, অন্ধ্র প্রদেশে প্রায় ৫৭ হাজার মানুষকে ত্রাণশিবিরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ইয়ানামে সরানো হয়েছে ৩৮ জনকে। কোনাসীমা জেলার নিচু এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে ১০ হাজারের বেশি মানুষ।
ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গেও সতর্কতা
ভারী বৃষ্টি ও সম্ভাব্য ভূমিধসের আশঙ্কায় ওড়িশায় ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মালকানগিরি, কোরাপুট, রায়গড়া, গজপতি ও নবরংপুরসহ দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় সতর্কতা জারি রয়েছে। রাজ্যে ২ হাজার ৩৭টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় ৩১৩টি দল মোতায়েন করা হয়েছে। মাছ ধরার ১৯ হাজার ১৪৩টি নৌকা উপকূলে ফিরেছে।
ঝাড়খণ্ডের রাঁচি, পশ্চিম সিংভূম, পূর্ব সিংভূম ও সিমডেগা জেলায় ২৮ ও ২৯ অক্টোবর স্কুল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের উপকূলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোতে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত এবং উপ-হিমালয় অঞ্চলে শনিবার পর্যন্ত ভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। কলকাতায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত ১৯ দশমিক ১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
বাতিল ফ্লাইট, বন্ধ ট্রেন চলাচল
ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আকাশ ও রেলপথেও বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। বিশাখাপত্তনম বিমানবন্দরে ২৭ অক্টোবর থেকে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই দিন সন্ধ্যা ৭টার পর বিজয়ওয়াড়া ও রাজামুন্দ্রি বিমানবন্দরের কার্যক্রমও স্থগিত করা হয়। এয়ার ইন্ডিয়া, এয়ার ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস, ইন্ডিগো ও আকাসা এয়ার একাধিক ফ্লাইট বাতিল করেছে। যাত্রীদের বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থার কাছ থেকে ফ্লাইটের অবস্থা জেনে নিতে বলা হয়েছে।
দক্ষিণ উপকূলীয় রেলওয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ৫৭টি ট্রেন বাতিল এবং আরও ১৫টির সময়সূচি পরিবর্তন করেছে। বাতিল ট্রেনের মধ্যে বন্দে ভারত, রত্নাচল, উদয়, গরিব রথ, গোদাবরী ও ফলকনুমা এক্সপ্রেস রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলোতে উদ্ধার, সড়ক পরিষ্কার ও বিদ্যুৎ পুনঃস্থাপনের কাজ চলছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী কয়েক দিনও বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টিপাতের আশঙ্কা রয়েছে।












