মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করা এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা করছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বুধবার জানিয়েছেন, এক সপ্তাহের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধ ও হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে তেহরান বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আরাগচি বলেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী দেশকে রক্ষার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। তবে একই সঙ্গে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে সফল হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে তেহরান।
তিনি জানান, এক সপ্তাহের যুদ্ধ বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপায় নিয়ে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে ইরানের নিয়মিত যোগাযোগ চলছে। এমনকি নির্ধারিত সাত দিনেরও কম সময়ে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা যায় কি না, তা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নতুন করে ইরানে হামলা চালানোর হুমকি বাড়ানোর মধ্যে তেহরানের এই বক্তব্য এল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর জন্য সাত দিনের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছিল ইরান। কাতারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রস্তাবটি পাঠানো হয়। সে সময় আরাগচি বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধবিরতিসহ কয়েকটি প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হলে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব।
তবে যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি ইরানের আরও কয়েকটি দাবি রয়েছে। বিদেশে আটকে থাকা ইরানি সম্পদ মুক্ত করা, দেশটির তেল খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বন্ধ করার দাবি জানিয়েছে তেহরান।
কাতারের মধ্যস্থতায় নতুন উদ্যোগ
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস বুধবার জানিয়েছে, কাতারের নেতৃত্বে আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা আবার শুরু করার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যাতে নতুন করে যুদ্ধ শুরু না হয়, সে জন্য একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিনিময়ে দেশটির বোমা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে জাতিসংঘের পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে তেহরানকে রাজি করানোর চেষ্টা করছে কাতার।
এদিকে গত রোববার কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফর করেছে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সফরে চলমান পরিস্থিতি, আলোচনার অগ্রগতি, হরমুজ প্রণালি এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দাবি করে আসছে ইরান। দেশটির অনুমতি ছাড়া এই পথ অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজগুলোর ওপরও নিয়মিত হামলা চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ফলে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সংকট সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতা চললেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। গত জুনে একটি সমঝোতা ভেঙে পড়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ওই সমঝোতায় স্থায়ী সমাধানের পথে এগোনোর একটি কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল।
এখন মধ্যস্থতাকারীদের উদ্যোগে নতুন আলোচনা শুরু হলে যুদ্ধ বন্ধ, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করার পথ তৈরি হতে পারে। তবে ইরানের শর্ত, যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং পারমাণবিক স্থাপনায় আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের প্রশ্নে দুই পক্ষ কতটা সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তার ওপরই কূটনৈতিক উদ্যোগের অগ্রগতি নির্ভর করছে।












