সন্তানদের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটানোর জন্য আইন পেশা ছেড়ে দিয়েছিলেন এমিলি ম্যাকগোনাগল। তখন হয়তো ভাবেননি, একদিন তাঁর কণ্ঠে কথা বলবে জনপ্রিয় কার্টুনের একাধিক চরিত্র। যুক্তরাজ্যের এই নারী এখন ঘরে বসেই কণ্ঠশিল্পী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর কণ্ঠে প্রাণ পেয়েছে শিশুদের জনপ্রিয় অ্যানিমেশন সিরিজ ‘স্পাইক’-এর আটটি চরিত্র। সিরিজটি নেটফ্লিক্সে মুক্তির পর দর্শকদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছে।
৪২ বছর বয়সী এমিলি একসময় লন্ডনে আইনজীবী হিসেবে কাজ করতেন। কাজের চাপ এতটাই বেশি ছিল যে অনেক দিন তাঁকে রাত তিনটা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। কোলচেস্টার থেকে লন্ডনের ক্যানারি ওয়ার্ফ এলাকায় যাতায়াত করাও ছিল তাঁর দৈনন্দিন জীবনের অংশ। সন্তান হওয়ার পর এই ব্যস্ত জীবন দীর্ঘদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করেন তিনি।
পরিবারকে সময় দেওয়ার পাশাপাশি নিজের পেশাগত জীবনও এগিয়ে নিতে চেয়েছিলেন এমিলি। তাই ২০১৯ সালে তুলনামূলক নমনীয় কাজের সন্ধানে কণ্ঠশিল্পের দিকে ঝুঁকে পড়েন। অভিনয়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও শিশুদের অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে এই কাজের প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়েছিল।
এমিলি বলেন, সন্তানরা যখন বারবার ‘পাও প্যাট্রোল’ ও ‘পেপা পিগ’-এর মতো কার্টুন দেখত, তখন তিনিও সেগুলো দেখতেন। একসময় তাঁর মনে হতো, কার্টুনের চরিত্রগুলোতে কণ্ঠ দেওয়ার কাজটি দারুণ হতে পারে। কিন্তু কীভাবে এই পেশায় আসতে হয়, তা তাঁর জানা ছিল না। অভিনয়ের অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথমে নিজের সেই ইচ্ছাকে অসম্ভব বলেই মনে করেছিলেন।

পরে আর অপেক্ষা না করে নিজেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন তিনি। বাড়িতে তৈরি করেন কণ্ঠ ধারণের উপযোগী স্টুডিও। সেখানে পেশাদার মানের অডিও সরঞ্জাম স্থাপন করেন। কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন কাজের জন্য কণ্ঠের নমুনা পাঠানোর পর গুগলের একটি কাজে প্রথম সুযোগ পান।
এরপর বিজ্ঞাপনে কণ্ঠ দেওয়ার পাশাপাশি কোলচেস্টারের কয়েকটি অভিনয়বিষয়ক দলের সঙ্গে যুক্ত হন। লন্ডনে ছয় সপ্তাহের একটি অভিনয় প্রশিক্ষণ কোর্সও সম্পন্ন করেন। এভাবেই ধীরে ধীরে কণ্ঠশিল্পী হিসেবে নিজের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা বাড়াতে থাকেন তিনি।
তিন বছর আগে ‘স্পাইক’ সিরিজের জন্য কণ্ঠশিল্পী নেওয়ার বিজ্ঞাপন দেখতে পান এমিলি। সুযোগটি কাজে লাগিয়ে যুক্ত হন সিরিজটির সঙ্গে। এখন এই অ্যানিমেশনে তিনি আটটি চরিত্রের কণ্ঠ দিচ্ছেন।
‘স্পাইক’ মূলত ছোট শিশুদের জন্য তৈরি একটি অ্যানিমেশন। এর গল্পে রয়েছে একটি ড্রাগন ও তার বন্ধুদের নানা অভিযান। সিরিজটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ইউটিউবে ‘ফায়ার স্পাইক!’ নামে। লিথুয়ানিয়ার প্রতিষ্ঠান বোরড পান্ডা ২০০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোগেই সিরিজটি তৈরি হয়েছে।
এমিলি যখন এই দলের সঙ্গে যুক্ত হন, তখন ইউটিউব চ্যানেলটির গ্রাহক ছিল এক হাজারেরও কম। দর্শকসংখ্যাও ছিল খুব সীমিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিরিজটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। বর্তমানে চ্যানেলটির গ্রাহকসংখ্যা ১২ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে।
গত ১২ অক্টোবর নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় ‘স্পাইক’। যুক্তরাজ্যে মুক্তির পর এটি প্ল্যাটফর্মটির সবচেয়ে বেশি দেখা শিশুদের অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই বিশ্বজুড়ে নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে বেশি দেখা অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে সপ্তম স্থান অর্জন করে সিরিজটি।

এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত এমিলি বলেন, পুরো বিষয়টি তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে। নিজের সন্তানদের সঙ্গে বসে কার্টুন দেখার সময় যে কাজটি একদিন স্বপ্ন হিসেবে দেখেছিলেন, সেই কাজের মাধ্যমে এখন রেডিও ও নেটফ্লিক্সে নিজের কণ্ঠ শুনতে পাচ্ছেন তিনি।
এমিলির ভাষায়, কয়েক বছর আগে সন্তানদের সঙ্গে ‘পেপা পিগ’ দেখার সময় কেউ যদি তাঁকে বলতেন যে একদিন রেডিও ও নেটফ্লিক্সে তাঁর নিজের কণ্ঠ শোনা যাবে, তাহলে সেটি তাঁর কল্পনারও বাইরে থাকত।
নেটফ্লিক্সে সিরিজটির মুক্তি নিয়ে বোরড পান্ডার অ্যানিমেশন বিভাগের প্রধান জোনাস দোভিদাইতিসও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশুরা এখন এই প্ল্যাটফর্মে অনুষ্ঠানটি দেখতে পারবে—বিষয়টি তাঁকে দারুণ আনন্দিত করেছে।
এমিলির গল্প শুধু পেশা বদলের সাফল্যের কাহিনি নয়। এটি এমন একজন মায়ের গল্প, যিনি পরিবারকে সময় দেওয়ার ইচ্ছা থেকে নতুন পথে হাঁটতে শুরু করেছিলেন। শুরুতে অভিজ্ঞতা না থাকলেও নিজের আগ্রহ, প্রস্তুতি ও চেষ্টা দিয়ে তিনি এমন একটি পেশায় জায়গা করে নিয়েছেন, যা একসময় তাঁর কাছে ছিল কেবলই স্বপ্ন।












