উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষায় ইংরেজিতে ফেল করেছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন শিক্ষার্থী। ২০২৬ সালের পরীক্ষায় ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অংশ নেওয়া ১২ লাখ ৭০ হাজার ৫৮৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছেন প্রায় প্রতি পাঁচজনের একজন। পরীক্ষার ফলাফলে এই চিত্র বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি শেখার দুর্বলতাকে আবারও সামনে এনেছে। তবে সমস্যাটি শুধু পরীক্ষায় পাস-ফেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
ব্রিটিশ কাউন্সিলের ২০২৪ সালের ‘নেক্সট জেনারেশন বাংলাদেশ’ জরিপেও তরুণদের ইংরেজি দক্ষতার ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে। দেশের ৩ হাজার তরুণের ওপর পরিচালিত জরিপে মাত্র ৫ শতাংশ নিজেদের ইংরেজিতে সাবলীল বলে জানিয়েছেন। ৪৪ শতাংশের ইংরেজি দক্ষতা প্রাথমিক পর্যায়ের বলে উঠে এসেছে। আর ২৩ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা ইংরেজিতে কথা বলতে বা বুঝতে পারেন না। একই জরিপে ৭৯ শতাংশ তরুণ ইংরেজিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন। অর্থাৎ, তরুণদের বড় অংশ ইংরেজির প্রয়োজনীয়তা বুঝলেও ভাষাটি ব্যবহারে আত্মবিশ্বাসী নন।
এই দুই চিত্র পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, ইংরেজিতে দুর্বলতা কেবল শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলকে প্রভাবিত করছে না; উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দ্রুত সম্প্রসারিত ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি বড় বাধা হয়ে উঠতে পারে।
ইংরেজিতে ফেল, উদ্বেগের জায়গা কোথায়
২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় ইংরেজিতে অকৃতকার্য হয়েছেন ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫২৮ জন। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ে ফেল করেছেন আরও ১ লাখ ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন। এই দুই বিষয়ে মোট অকৃতকার্য শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১। সব মিলিয়ে পরীক্ষায় ফেল করেছেন ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ।
ইংরেজিতে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, উচ্চশিক্ষার বড় একটি অংশের পাঠ্যবই, গবেষণাপত্র, প্রযুক্তিগত নির্দেশনা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের প্রধান ভাষা ইংরেজি। ফলে স্কুল-কলেজ পর্যায়ে এই ভাষায় ভিত্তি দুর্বল থাকলে পরবর্তী শিক্ষাজীবনেও শিক্ষার্থীদের নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়।
কেন ইংরেজি শেখায় পিছিয়ে শিক্ষার্থীরা
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ইংরেজি শিক্ষার বড় অংশ পরীক্ষাকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থীরা অনেক সময় ভাষাটি ব্যবহার করে যোগাযোগের দক্ষতা অর্জনের বদলে ব্যাকরণ, অনুবাদ, মুখস্থ উত্তর ও পরীক্ষায় নম্বর পাওয়ার কৌশলে বেশি মনোযোগ দেয়। এতে লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি কিছুটা হলেও বাস্তব জীবনে ইংরেজি বলা, শোনা ও বোঝার সক্ষমতা তৈরি হয় না।
শ্রেণিকক্ষের পরিবেশও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি, কিন্তু পর্যাপ্ত ভাষাচর্চার সুযোগ সীমিত। ইংরেজিতে কথা বলার অনুশীলন, দলীয় আলোচনা, উপস্থাপনা কিংবা বাস্তব পরিস্থিতিতে ভাষা ব্যবহারের সুযোগ না থাকলে শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস তৈরি হয় না। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি এবং প্রচলিত পাঠদান পদ্ধতিও সমস্যাকে দীর্ঘস্থায়ী করছে।
২০২২ সালে মেক্সটেসল জার্নালে প্রকাশিত বাংলাদেশের মাধ্যমিক পর্যায়ের ২১৬ জন ইংরেজি শিক্ষকের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় যোগাযোগভিত্তিক ইংরেজি শিক্ষার পথে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কথা উঠে আসে। শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা, শিক্ষকের প্রস্তুতি এবং প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতির সীমাবদ্ধতা ভাষা শেখানোর লক্ষ্য বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করে।
ডিজিটাল অর্থনীতিতে ইংরেজির গুরুত্ব
ডিজিটাল অর্থনীতিতে যুক্ত হওয়ার জন্য শুধু ইন্টারনেট সংযোগ বা কম্পিউটার ব্যবহারের দক্ষতা যথেষ্ট নয়। সফটওয়্যার, প্রোগ্রামিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তির অধিকাংশ আন্তর্জাতিক নির্দেশনা ও শেখার উপকরণ ইংরেজিতে তৈরি। ফলে ইংরেজি বুঝতে না পারলে নতুন প্রযুক্তি শেখা, সমস্যা সমাধান করা এবং বৈশ্বিক জ্ঞানভান্ডার ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের তরুণদের জন্য ফ্রিল্যান্সিং, সফটওয়্যার উন্নয়ন, অনলাইন ব্যবসা এবং দূরবর্তী চাকরির বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ছে। এসব ক্ষেত্রে বিদেশি গ্রাহক বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ, কাজের নির্দেশনা বোঝা, প্রস্তাব তৈরি এবং নিজের দক্ষতা তুলে ধরতে ইংরেজির প্রয়োজন হয়। ভাষাগত দুর্বলতা থাকলে দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও অনেক তরুণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারেন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে এই প্রয়োজন আরও স্পষ্ট হচ্ছে। নতুন প্রযুক্তি সম্পর্কে শেখা, নির্দেশনা বোঝা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সরঞ্জাম কার্যকরভাবে ব্যবহারের জন্য ইংরেজি জানার সুবিধা রয়েছে। অবশ্য ডিজিটাল অর্থনীতিতে অংশগ্রহণের একমাত্র শর্ত ইংরেজি নয়। নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং ব্যবহারিক দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে ভাষাগত দুর্বলতা এসব সুযোগ কাজে লাগানোর পথে বাড়তি বাধা তৈরি করে।
মুখস্থনির্ভরতা থেকে ব্যবহারিক শিক্ষায় যেতে হবে
ইংরেজি শিক্ষার এই সংকট কাটাতে শুধু পাঠ্যবই বা পরীক্ষার প্রশ্নপদ্ধতি বদলালেই হবে না। শিক্ষার্থীদের ভাষাটি বাস্তবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে হবে। শ্রেণিকক্ষে কথা বলা, শোনা, লেখা ও পড়ার সমন্বিত অনুশীলন বাড়ানো জরুরি। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণভিত্তিক পাঠদানও নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে ইংরেজিকে কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার বিষয় হিসেবে না দেখে উচ্চশিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা হিসেবে শেখাতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন নিজেদের দৈনন্দিন জীবন, পড়াশোনা ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে ভাষাচর্চাকে যুক্ত করতে পারে, সে ব্যবস্থা করা দরকার।
এইচএসসিতে ইংরেজিতে ২ লাখ ৪৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা এবং ব্রিটিশ কাউন্সিলের জরিপে তরুণদের ভাষাগত সীমাবদ্ধতার চিত্র একই সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীকে ডিজিটাল অর্থনীতির শক্তিতে পরিণত করতে হলে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি ইংরেজি শেখার ভিত্তিও মজবুত করতে হবে। তা না হলে বৈশ্বিক সুযোগ সামনে থাকলেও ভাষাগত দুর্বলতার কারণে অনেক তরুণ সেই সুযোগের পুরো সুবিধা নিতে পারবেন না।












