ইরানকে ঘিরে আট মাসের যুদ্ধ এমন এক অচলাবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে কোনো পক্ষই নিজেদের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানের নৌবাহিনীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতার ক্ষতি করতে পেরেছে। কিন্তু সরকার পরিবর্তন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস কিংবা হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত করার মতো বড় লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। অন্যদিকে, ব্যাপক বোমাবর্ষণ সহ্য করে ইরান টিকে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ভাঙতে পারেনি। দীর্ঘমেয়াদি সামরিক হুমকি থেকে মুক্তি পাওয়ার লক্ষ্যও তার অধরা।
এই পরিস্থিতিতে যুদ্ধের যৌক্তিক পরিণতি হওয়া উচিত ছিল সমঝোতা। কিন্তু বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দুই পক্ষই এমন কিছু ছাড় দিতে অনিচ্ছুক, যা একটি চুক্তির পথ খুলতে পারে। ফলে এমন এক সংঘাত চলতে থাকছে, যার ব্যয় ক্রমেই বাড়ছে, অথচ বিজয়ের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। নতুন করে হামলার হুমকি সেই বিপজ্জনক অচলাবস্থাকে আরও দীর্ঘায়িত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।
এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার একটি বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি নিজেদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তাসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে এমন একটি সমঝোতা তৈরি করতে পারে, যেখানে ওয়াশিংটন ও তেহরানকে সরাসরি একে অন্যের কাছে বড় রাজনৈতিক ছাড় দিতে হবে না।
এটি নিখুঁত সমাধান হবে না। বরং বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম ক্ষতিকর পথ। এর সাফল্য নির্ভর করবে উপসাগরীয় দেশগুলোর ঐক্য, ইরানের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বাস্তব প্রয়োজন এবং যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে সমঝোতার সুযোগ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতার একটি ঐতিহাসিক নজির রয়েছে। ১৯৮১ সালের আলজিয়ার্স চুক্তিতে মার্কিন জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে ইরানকে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয়েছিল এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তিতেও ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা মেনে নেওয়ার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সুবিধা পেয়েছিল।
বর্তমান সংকটেও নীতিগতভাবে একই ধরনের বিনিময়ের সুযোগ রয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা প্রত্যাহার করতে পারে, আর যুক্তরাষ্ট্র দিতে পারে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা, অর্থনৈতিক সুবিধা অথবা প্রণালির ব্যবস্থাপনায় ইরানের ভূমিকার সীমিত স্বীকৃতি। ভবিষ্যতে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
কিন্তু এখনই এমন চুক্তি করা কঠিন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের কাছ থেকে ব্যাপক ছাড় চান। অন্যদিকে, তেহরান এমন অর্থনৈতিক সুবিধা দাবি করছে, যা ওয়াশিংটন আগাম ও অপরিবর্তনীয়ভাবে দিতে রাজি নয়। দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাসও গভীর। রাজনৈতিকভাবে কেউই এমন চুক্তি করতে চায় না, যা প্রতিপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবে উপস্থাপিত হতে পারে।
এখানেই উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতার গুরুত্ব। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইরানকে অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে অনিচ্ছুক হলেও সৌদি আরব ও অন্য উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো মানবিক সহায়তা, পুনর্গঠন তহবিল কিংবা অন্যান্য অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে তেহরানকে প্রাথমিক প্রণোদনা দিতে পারে।
এর বিনিময়ে ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা ও বাধা বন্ধ করতে হবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর ভূখণ্ডে আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে হবে। ইরান বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা প্রত্যাহার করলে যুক্তরাষ্ট্রও তার নৌ অবরোধ তুলে নিতে পারে।
প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে উপসাগরীয় দেশগুলো ও ইরানের মধ্যে একটি সাময়িক সমন্বয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে জাহাজ চলাচলের জন্য নির্দিষ্ট পথ বা কারিগরি ব্যবস্থা নিয়ে সমঝোতা হতে পারে, তবে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের ওপর ইরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নজির তৈরি করা যাবে না।
এ ধরনের ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হবে যুদ্ধের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো, পারমাণবিক বিরোধের চূড়ান্ত সমাধান করা নয়।
উপসাগরীয় দেশগুলোর হাতে যে প্রভাব রয়েছে
ইরান যুদ্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো সংঘাতের প্রধান পক্ষ না হয়েও এর বড় মূল্য দিচ্ছে। তাদের অর্থনীতি তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। এই জ্বালানি বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি। বিকল্প পরিবহনপথ থাকলেও সেগুলো দিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের সব জ্বালানি রপ্তানি সামলানো সম্ভব নয়।
এ অঞ্চলের দেশগুলো অর্থনীতিকে তেল-গ্যাসনির্ভরতা থেকে সরিয়ে পর্যটন, আর্থিক সেবা, প্রযুক্তি ও অন্যান্য খাতে সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, নিরাপত্তাঝুঁকি এবং বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তা সেই পরিকল্পনাগুলোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

তাই যুদ্ধবিরতি তাদের কাছে নিছক কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়; এটি নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৌশল রক্ষারও প্রশ্ন।
তাদের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর প্রভাব বিস্তারের কিছু কার্যকর উপায়ও রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশে ঘাঁটি, বিমান চলাচলের অনুমতি এবং অন্যান্য সামরিক সুবিধার ওপর নির্ভর করে। এসব সুবিধা ব্যবহারের অনুমোদন সাময়িকভাবে সীমিত করা হলে ওয়াশিংটনের সামরিক পরিকল্পনা জটিল হয়ে উঠতে পারে।
লেখকদের উল্লেখ করা একটি উদাহরণ হলো, মে মাসে কুয়েত ও সৌদি আরব হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে পাহারা দেওয়ার মার্কিন পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রবেশ, ঘাঁটি ব্যবহার ও আকাশপথ ব্যবহারের অনুমোদন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল। এর পর যুক্তরাষ্ট্র ওই অভিযান স্থগিত করে।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, উপসাগরীয় দেশগুলো শুধু যুদ্ধের ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ নয়; তারা সংঘাতের গতিপথেও প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সেই প্রভাব কার্যকর করতে হলে তাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে।
ট্রাম্পের জন্যও বেরিয়ে আসার পথ
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলে যুক্তরাষ্ট্রও রাজনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। ট্রাম্প দাবি করতে পারবেন, তিনি ইরানের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করেছেন এবং বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে আরও বড় সংকট ঠেকিয়েছেন। একই সঙ্গে তাঁকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় ছাড় দিতে হবে না কিংবা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মাধ্যমে তেহরানকে সরাসরি পুরস্কৃত করতে হবে না।
এমন একটি সমঝোতা তাঁর ঘোষিত ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থেকে সরে আসবে, আর আঞ্চলিক মিত্ররা নিজেদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষার দায়িত্বের বড় অংশ গ্রহণ করবে।
তবে এই পথের অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ন থাকবে, এমন নয়। উপসাগরীয় দেশগুলো যদি নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ওয়াশিংটনের পরিবর্তে আঞ্চলিক সমঝোতার ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে মার্কিন প্রভাব কমতে পারে।
ইরানের জন্যও এই সমঝোতা লাভজনক হতে পারে। অর্থনৈতিক সহায়তা ও অবরোধ প্রত্যাহারের মাধ্যমে দেশটি যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর উপসাগরীয় দেশগুলোর নির্ভরতা কমে গেলে তেহরানের আঞ্চলিক কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
কিন্তু ইরানের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ হিসাবও রয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে বিঘ্ন সৃষ্টি করে বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে রাখার ক্ষমতা স্বল্পমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে সমঝোতায় বাধ্য করার হাতিয়ার হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে একই কৌশল অব্যাহত রাখলে উপসাগরীয় দেশগুলো আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র নতুন সামরিক পদক্ষেপের যুক্তি খুঁজে পেতে পারে।
ইরানের জন্য তাই এখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও যুদ্ধবিরতির বাস্তব সুবিধা গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে নতুন হামলার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর না হলেও যুদ্ধ শেষ হলে পরবর্তী সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য অনেক বেশি বিবেচনায় নিতে হবে ওয়াশিংটনকে।
আঞ্চলিক ঐক্যই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
উপসাগরীয় দেশগুলো ইতিমধ্যে আঞ্চলিক সমাধানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে। ২৬ অক্টোবর সৌদি কর্মকর্তারা ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করতে তেহরানে যান। ওই আলোচনায় পাকিস্তান ও তুরস্কের নেতারাও যুক্ত ছিলেন। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর ওমানের সালালাহতে হরমুজ প্রণালি নিয়ে ইরানের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর বৈঠকের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, যদিও সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়নি।
এই উদ্যোগগুলো দেখায়, আঞ্চলিক সমঝোতার আগ্রহ রয়েছে। কিন্তু একটি সমন্বিত চুক্তির বদলে দেশগুলো যদি আলাদাভাবে ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করে, তাহলে সংকটের মূল ঝুঁকি থেকে যাবে। কোনো একটি দেশ নিজেদের জাহাজ বা ভূখণ্ডে হামলা বন্ধ করার নিশ্চয়তা পেতে পারে, কিন্তু অন্য দেশগুলো আক্রান্ত হলে সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হবে না।
এ ধরনের দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস বাড়ানোর সুযোগও ইরানকে দিতে পারে। এক দেশকে বেশি সুবিধা দেওয়া হলে অন্য দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা ও স্বার্থ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়তে পারে।
তাই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও ইরান-সংক্রান্ত বিষয়ে ন্যূনতম ঐকমত্য জরুরি। এর জন্য তাদের সব বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে হবে না। বরং ইরানের কোন আচরণ গ্রহণযোগ্য হবে না, চুক্তি লঙ্ঘিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা কীভাবে ব্যবহার করা হবে—এসব বিষয়ে যৌথ অবস্থান তৈরি করতে হবে।
ইরান চুক্তির সীমা পরীক্ষা করলে কিংবা নতুন সুবিধা দাবি করলে উপসাগরীয় দেশগুলোকে সম্মিলিতভাবে অর্থনৈতিক সহায়তা বা সহযোগিতা স্থগিত করার মতো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকতে হবে। কোনো একক দেশের ওপর চাপ পড়লেও অন্যদের সমর্থন অব্যাহত রাখতে হবে।
ইয়েমেনের হুতিদের প্রশ্নও এই সমঝোতাকে জটিল করতে পারে। সৌদি আরবের ওপর হুতিদের হামলার জন্য রিয়াদ ইরানকে দায়ী করে। ইরান গোষ্ঠীটির সামরিক সক্ষমতা তৈরিতে সহায়তা করেছে এবং প্রযুক্তিগত ও বস্তুগত সমর্থন দিয়ে আসছে। তবে হুতিদের ওপর তেহরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে ইরান একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেই হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সব অভিযান বন্ধ করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এ অবস্থায় তেহরানকে সৌদি আরবকে বিশ্বাসযোগ্য আশ্বাস দিতে হবে যে, সৌদি ভূখণ্ডে চলমান হামলায় ইরান-সমর্থিত অন্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্পৃক্ততা কমাতে তারা পদক্ষেপ নেবে। বিশেষ করে ইরাকভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা বন্ধে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ সৌদি আরবকে একই সঙ্গে উত্তরে ইরাক এবং দক্ষিণে ইয়েমেন সীমান্তের দিক থেকে নিরাপত্তাঝুঁকি সামলাতে হলে তার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়বে।

এমন আশ্বাস বাস্তবায়ন করা সহজ হবে না। কিন্তু উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগকে উপেক্ষা করে কোনো আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব নয়।
অসম্পূর্ণ চুক্তিই আপাতত বাস্তবসম্মত
উপসাগরীয় মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি হলেও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা বিরোধের সমাধান হবে না। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের মৌলিক দ্বন্দ্বও থেকে যাবে। এমনকি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব বাড়ার ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে।
তবু একটি সীমিত সমঝোতার গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না। পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক চুক্তির জন্য যে পারস্পরিক আস্থা ও ছাড় প্রয়োজন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা অনুপস্থিত। বিপরীতে, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করা এবং হামলা বন্ধ করার মতো সীমিত লক্ষ্য নিয়ে চুক্তি করা তুলনামূলকভাবে সম্ভব।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপও বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে দেশগুলোর কৌশলগত জ্বালানি মজুত কমে আসা, চীনের চাহিদা বৃদ্ধি এবং উপসাগর থেকে জ্বালানি পরিবহনের বিকল্প পথগুলো আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। এর অর্থনৈতিক অভিঘাত উপসাগরীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে এবং পুরোনো আঞ্চলিক সংঘাত নতুন করে উসকে দিতে পারে।
এই বাস্তবতায় উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত রয়েছে। তারা কি নিজেদের বিভক্ত অবস্থান বজায় রেখে যুদ্ধের পরিণতি সামলাবে, নাকি সম্মিলিত প্রভাব কাজে লাগিয়ে সংঘাতের গতিপথ বদলানোর চেষ্টা করবে?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অবিশ্বাস দূর করা কিংবা তাদের সব বিরোধের সমাধান এখনই সম্ভব নয়। কিন্তু যুদ্ধের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো, হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল পুনরুদ্ধার এবং নতুন হামলার ঝুঁকি সীমিত করার সুযোগ রয়েছে।
এ জন্য উপসাগরীয় দেশগুলোকে এমন একটি সমঝোতার নিশ্চয়তা দিতে হবে, যাতে উভয় পক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক পরাজয় স্বীকার না করেও যুদ্ধ থেকে সরে আসতে পারে। এতে তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত ঝুঁকিও কমবে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হলো, যারা সংঘাত শুরু করেনি, তারাই এখন যুদ্ধ থামানোর সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারে। নিখুঁত সমাধান না থাকলে বাস্তবসম্মত সমঝোতার মূল্য কমে যায় না। বরং দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার ক্ষতি যখন সবার জন্য বাড়তে থাকে, তখন অসম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতিই বৃহত্তর বিপর্যয় ঠেকানোর একমাত্র কার্যকর পথ হয়ে উঠতে পারে।












