যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কয়েক মাস আগেও ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দল সিনেটে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে শক্ত অবস্থানে ছিল। কিন্তু নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই সেই আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরছে। জাতীয় জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকা এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কঠিন হয়ে ওঠায় সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কায় পড়েছে রিপাবলিকানরা।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন পূর্বাভাসে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা বাড়তে দেখা যাচ্ছে। তবে সব পূর্বাভাস সংস্থা একই মূল্যায়ন করছে না। কোনো কোনো বিশ্লেষণে ডেমোক্র্যাটদের জয়ের সম্ভাবনা বেশ উঁচুতে থাকলেও অপেক্ষাকৃত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে দ্য ইকোনমিস্টের নিজস্ব নির্বাচনী পূর্বাভাস মডেল।
গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান সাবাতোর ক্রিস্টাল বল রিপাবলিকানদের সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে ‘শক্তিশালী ফেবারিট’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। আলাস্কা, আইওয়া ও কানসাসের মতো অঙ্গরাজ্যকে রিপাবলিকানদের জন্য নিরাপদ আসন হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছিল। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত তাদের মূল্যায়নে রিপাবলিকানদের এগিয়ে থাকার মতো যথেষ্ট আসন ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক জরিপ ও নির্বাচনী পরিস্থিতি সেই হিসাব পাল্টে দিয়েছে। ক্রিস্টাল বল এখন সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটদের সামান্য এগিয়ে রাখছে। বাজির বাজারে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা ধরা হচ্ছে ৬৭ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিত নির্বাচনী পূর্বাভাস বিশ্লেষক নেট সিলভারের মডেলে এই সম্ভাবনা ৭৬ শতাংশ।
তবে দ্য ইকোনমিস্টের পূর্বাভাস অনেক বেশি সতর্ক। তাদের হিসাবে, সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলে ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৫৪ শতাংশ। অর্থাৎ লড়াই এখনো প্রায় সমানে সমান।

জরিপের ফল নিয়ে সতর্কতা
এই মতপার্থক্যের অন্যতম কারণ জনমত জরিপের নির্ভুলতা নিয়ে ভিন্ন মূল্যায়ন। সাধারণত জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচনী জরিপে ভোটারদের কাছে জানতে চাওয়া হয়, কংগ্রেস নির্বাচনে তাঁরা কোন দলকে সমর্থন করবেন। এই ধরনের জরিপের অতীত রেকর্ড ভালো হলেও একটি সমস্যা রয়েছে। অনেক সময় এগুলো ডেমোক্র্যাটদের প্রকৃত ভোটের ব্যবধান অতিরিক্ত বেশি দেখায়।
২০০৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের উদাহরণ এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। ওই নির্বাচনের আগে জাতীয় জরিপে ডেমোক্র্যাটরা গড়ে ১৩ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রতিনিধি পরিষদের জাতীয় ভোটে তাদের ব্যবধান ছিল মাত্র ৭ শতাংশ পয়েন্ট। অর্থাৎ জরিপে যে ব্যবধান দেখা গিয়েছিল, বাস্তবে তা অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছিল।
দ্য ইকোনমিস্টের মডেল মনে করছে, এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। জাতীয় পর্যায়ের জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ পয়েন্ট। ২০০৬ সালের তুলনায় এই ব্যবধান কম হলেও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মডেলটি ধারণা করছে, জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান বাস্তব ফলের তুলনায় প্রায় ১ শতাংশ পয়েন্ট বেশি দেখানো হতে পারে।
এই ভুলের প্রভাব সব অঙ্গরাজ্যে সমান হবে না। ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী অঙ্গরাজ্যগুলোতে ব্যবধান কম হতে পারে। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিতে জরিপের ভুল তুলনামূলক বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের এমন অন্তত দুটি অঙ্গরাজ্যে জিততে হবে, যেখানে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প দুই অঙ্কের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন।
অর্থ সংগ্রহে এগিয়ে থেকেও সুবিধা পাচ্ছে না ডেমোক্র্যাটরা
নির্বাচনী প্রচারে অর্থ সংগ্রহও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এবার নিজ নিজ অঙ্গরাজ্যে ব্যক্তিগত অনুদান সংগ্রহের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থীরা সামগ্রিকভাবে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে একজন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রার্থীপ্রতি অনুদানের সীমা ৩ হাজার ৫০০ ডলার।

অনেক নির্বাচনী পূর্বাভাসে এই অর্থ সংগ্রহকে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। কিন্তু দ্য ইকোনমিস্ট মনে করছে, শুধু অর্থ সংগ্রহের পরিমাণ দিয়ে নির্বাচনের ফল অনুমান করা ঠিক হবে না।
কারণ ট্রাম্প প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচনেই ব্যক্তিগত অনুদান সংগ্রহে ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থীরা রিপাবলিকানদের ছাড়িয়ে গেছেন। কিন্তু সেই আর্থিক সুবিধা সব সময় ভোটের ফলেও প্রতিফলিত হয়নি।
এ কারণে দ্য ইকোনমিস্টের মডেল প্রতিটি প্রার্থীর অর্থ সংগ্রহকে শুধু প্রতিপক্ষের সঙ্গে তুলনা করছে না। বরং নিজ দলের অন্য প্রার্থীদের গড় অর্থ সংগ্রহের সঙ্গে তুলনা করছে। এতে আইওয়ার মতো অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান প্রার্থীর সামান্য আর্থিক সুবিধাও বিবেচনায় আসছে।
আলাস্কায় ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক দ্য ইকোনমিস্ট। সেখানে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মেরি পেলটোলাকে বাজির বাজারে ৬৯ শতাংশ সম্ভাবনায় এগিয়ে রাখা হলেও ইকোনমিস্টের হিসাবে রিপাবলিকান বর্তমান সিনেটর ড্যান সুলিভান ৫১ শতাংশ সম্ভাবনায় এগিয়ে। নির্বাচনের শেষ সপ্তাহে পেলটোলার প্রচারশিবিরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বী ভোট ভাগ করতে অন্য প্রার্থী দাঁড় করানোর অভিযোগও বিতর্ক তৈরি করেছে। এই অভিযোগ প্রচারের শেষ পর্যায়ে নির্বাচনী আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
সিনেটের পাশাপাশি প্রতিনিধি পরিষদেও ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা অনেক বেশি বলে মনে করছে দ্য ইকোনমিস্ট। তাদের মডেলে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশ।
এমনটি হলে ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করতে পারবেন ডেমোক্র্যাটরা। পাশাপাশি তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরু করার ক্ষমতাও পাবেন তাঁরা।
সিনেটের নিয়ন্ত্রণও পেলে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা আরও বাড়বে। বিশেষ করে ট্রাম্পের বিচারক নিয়োগের প্রস্তাব আটকে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটররা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। ফলে এবারের নির্বাচনে সিনেটের আসনবিন্যাস শুধু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিই নয়, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পরবর্তী ক্ষমতার ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।

কানসাস, আইওয়া ও সাউথ ক্যারোলাইনায় চমকের সম্ভাবনা
ডেমোক্র্যাটদের জন্য সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে এমন কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে, যেখানে রিপাবলিকানদের অবস্থান ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী। কানসাস, আইওয়া ও সাউথ ক্যারোলাইনায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হয়ে উঠেছে।
সাউথ ক্যারোলাইনায় দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম জুলাইয়ে মারা যাওয়ার পর তাঁর বোন ডারলিন গ্রাহাম প্রার্থী হয়েছেন। রাজনীতিতে তাঁর অভিজ্ঞতা সীমিত। ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের জরিপে সেখানে দুই প্রার্থীর মধ্যে সমান সমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার চিত্র উঠে এসেছে।
অথচ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প এই অঙ্গরাজ্যে ১৮ শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। ফলে সাউথ ক্যারোলাইনার মতো অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা তৈরি হওয়া রিপাবলিকানদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
তবে এসব অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা এখনো কিছুটা পিছিয়ে। কিন্তু একটিতেও যদি তারা জয় পায়, তাহলে জাতীয় পর্যায়ের জরিপে ডেমোক্র্যাটদের প্রকৃত সমর্থন বেশি থাকার সম্ভাবনা জোরালো হতে পারে। সে ক্ষেত্রে অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোতেও তাদের জয়ের পথ সহজ হতে পারে।
নেব্রাস্কার স্বতন্ত্র প্রার্থী ড্যান অসবর্ন নির্বাচিত হলে কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত হবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সিনেটে কাজ করলে দলটির আসনসংখ্যা আরও বাড়তে পারে। দ্য ইকোনমিস্টের হিসাবে, অন্তত ৫৫টি সিনেট আসন পাওয়ার সম্ভাবনা ডেমোক্র্যাটদের ১৫ শতাংশ।
২০০৬ সালের নির্বাচনও মনে করিয়ে দিচ্ছে, জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান অতিরঞ্জিত হলেও তাদের জয় অসম্ভব নয়। সেবার জরিপে বড় ব্যবধান দেখানো হলেও শেষ পর্যন্ত দলটি সিনেটের ছয়টি আসন নিজেদের দখলে নিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল।
এবারও তাই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল শুধু কোন দল কত আসন পেল, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের বাকি মেয়াদে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি কতটা বাধার মুখে পড়বে এবং ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাবে, তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত পাওয়া যাবে।












