দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন দেশটির রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসের (এএনসি) জনপ্রিয়তা দ্রুত কমছে। আগামী ৪ নভেম্বরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলটির এই পতন আরও স্পষ্ট করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (ডিএ) জোহানেসবার্গের মেয়র পদ দখলের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
ডিএর মেয়র প্রার্থী হেলেন জিলি নির্বাচনী প্রচারে ব্যতিক্রমী নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছেন। কখনো পানিতে ভরা রাস্তার গর্তে সাঁতার কেটেছেন, কখনো বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ট্রাফিক সিগন্যাল বন্ধ হয়ে গেলে নিজেই যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করেছেন। আবার জলাবদ্ধ রাস্তায় নৌকা চালিয়েছেন। এমনকি শহরের কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যুষিত এলাকায় জনপ্রিয় গাড়ি নিয়ে ঘোরার সংস্কৃতিতেও অংশ নিয়েছেন তিনি। ৭৫ বছর বয়সী এই রাজনীতিক ডিজে হিসেবে গান বাজিয়ে ‘ডিজে গোগো’ নামেও পরিচিতি পেয়েছেন।
এসব কর্মকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য জোহানেসবার্গের অব্যবস্থাপনা ও অবকাঠামোগত সংকটকে সামনে আনা। একসময় আফ্রিকার বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত শহরটি এখন পানি, বিদ্যুৎ, সড়ক ও নগরসেবার নানা সমস্যায় জর্জরিত।
এএনসির জনপ্রিয়তায় বড় ধস
১৯৯৪ সালে বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে এএনসির প্রভাব ছিল প্রায় একচ্ছত্র। নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে দলটির প্রতি কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সমর্থন রয়েছে। ক্ষমতায় থাকার প্রথম দিকের বছরগুলোতে দেশটির উন্নয়নেও দলটির অবদান ছিল।
কিন্তু দুর্নীতি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে না পারার কারণে সেই সমর্থন ক্রমেই কমছে। গত ছয় মাসের জনমত জরিপের গড় হিসাবে এএনসির সমর্থন নেমে এসেছে ৩২ শতাংশে। বিপরীতে ডিএর সমর্থন বেড়ে হয়েছে ২৭ শতাংশ। পাঁচ বছর আগে এএনসি পেয়েছিল ৪৬ শতাংশ ভোট, আর ডিএ পেয়েছিল ২২ শতাংশ।
জরিপের এই চিত্র বাস্তব ভোটে প্রতিফলিত হলে ১৯৯৪ সালে বর্ণবাদী শাসনের অবসানের পর কোনো জাতীয় নির্বাচনে এএনসির সবচেয়ে খারাপ ফল হতে পারে। ডিএর ধারণা, দক্ষিণ আফ্রিকার আটটি বড় শহরের অধিকাংশেই তারা সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে পারে।
জোহানেসবার্গে নগরসেবার বিপর্যয়
এএনসির ব্যর্থতার সবচেয়ে দৃশ্যমান উদাহরণ জোহানেসবার্গ। নিজেদের বিশ্বমানের আফ্রিকান শহর হিসেবে পরিচয় দিলেও বাস্তবে শহরটির নাগরিক অবকাঠামো ভেঙে পড়ার পরিস্থিতিতে রয়েছে।
শহরে সরবরাহ করা মোট পানির প্রায় অর্ধেকের মূল্য আদায় করা যায় না। এর বড় কারণ পানির চুরি এবং পাইপলাইনের ছিদ্র দিয়ে পানি বেরিয়ে যাওয়া। কর ও বিভিন্ন ফি থেকে যে পরিমাণ অর্থ আয় হয়, শহরের ব্যয় তার চেয়ে বেশি। অথচ জরুরি অবকাঠামো মেরামতেও কর্তৃপক্ষ কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারছে না।
শহরের জমে থাকা অবকাঠামোগত ঘাটতি পূরণে যে অর্থ প্রয়োজন, তা বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের প্রায় ২৫ গুণ। ফলে পানি সরবরাহ, সড়ক ও অন্যান্য মৌলিক সেবার সংকট আরও গভীর হচ্ছে।
জিলি বলছেন, জোহানেসবার্গকে রক্ষার জন্য এটাই শেষ সুযোগ। ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কেপটাউনের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি শহরের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ঠিক করা, যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব নির্বাচন এবং দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
কৃষ্ণাঙ্গ ভোটই হবে বড় পরীক্ষা
তবে নির্বাচনে জয় পেলেই জিলির মেয়র হওয়া নিশ্চিত নয়। তাঁকে অন্য দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠন করতে হবে। ডিএর ঐতিহ্যগত সমর্থকদের মধ্যে শ্বেতাঙ্গ ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ভোটারদের উপস্থিতি বেশি। তাঁরা সাধারণত নির্বাচনে বেশি অংশ নেন। কিন্তু জোহানেসবার্গের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ মানুষ কৃষ্ণাঙ্গ হওয়ায় মেয়র হতে হলে জিলিকে এই জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেতে হবে।
সমস্যা হলো, অনেক কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারের কাছে ডিএ এখনো শ্বেতাঙ্গদের দল হিসেবে পরিচিত। যদিও দলটি বর্ণবাদী শাসনের বিরোধিতা করেছে, তবু অতীতের রাজনৈতিক পরিচয় ও কেপটাউনের সামাজিক বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এএনসির সাবেক সমর্থকদের একটি বড় অংশ এখন ভোটে অংশ নেন না অথবা ডিএ ছাড়া অন্য বিরোধী দলকে সমর্থন করেন। জ্যাকব জুমার নেতৃত্বাধীন উমখোন্তো উই সিজওয়ে দল জুলু জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমর্থন বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অন্যদিকে ইকোনমিক ফ্রিডম ফাইটার্স কৃষ্ণাঙ্গ জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকে গুরুত্ব দেয়। অ্যাকশনএসএ অভিবাসন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগকে সামনে রেখে নগর ভোটারদের আকৃষ্ট করছে।
তবে জাতীয় পর্যায়ে এএনসির সঙ্গে জোট সরকারে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতা ডিএর ভাবমূর্তি কিছুটা বদলেছে। দলটি প্রশাসনিক দক্ষতা ও সুশাসনের পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে পারছে। জিলি বর্ণবাদী শাসনামলে সাংবাদিক হিসেবে সরকারের নিপীড়ন ও অনিয়ম প্রকাশ করেছিলেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে বর্ণবাদী শাসন ফিরিয়ে আনার অভিযোগও আগের মতো সহজে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না।
কেপটাউনের নাগরিক সেবার অভিজ্ঞতাও ডিএর পক্ষে কাজ করছে। জোহানেসবার্গে বসবাসকারী মান্দিসা মাফিসা বলেছেন, কেপটাউন থেকে আসার পর তিনি সেখানকার মতো নাগরিক সেবা পাননি। কার্যকর নগর ব্যবস্থাপনার প্রত্যাশা থেকেই তিনি ডিএকে ভোট দিতে চান।
বর্ণপরিচয়ের বাইরে নতুন রাজনীতি?
দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে বর্ণপরিচয়ের প্রভাব কমার কিছু লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। ডিএর হিসাবে, জাতীয় পর্যায়ে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের মধ্যে তাদের সমর্থন ৪ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে দলটি তৃতীয় জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সমাজের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও রাজনীতিতে প্রভাব ফেলছে। কেপটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের লিবার্টি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে মাসে অন্তত ৭৫ হাজার র্যান্ড আয় করা পরিবারের মধ্যে কৃষ্ণাঙ্গ পরিবারের অংশ ছিল ২৯ শতাংশ। ২০২৪ সালে তা বেড়ে শ্বেতাঙ্গ পরিবারের সমান, অর্থাৎ ৪১ শতাংশে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া ২০০১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ভিন্ন বর্ণের মানুষের মধ্যে বিবাহের হার ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১১ শতাংশ হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণের মানুষের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ ও মেলামেশাও আগের তুলনায় বেড়েছে।
এপ্রিল মাসে প্রকাশিত এক জরিপে দক্ষিণ আফ্রিকার ৭০ শতাংশ মানুষ মনে করেছেন, রাজনীতিকেরা নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করতে বর্ণ ও ঔপনিবেশিক ইতিহাসকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেন।
তবে জিলি শেষ পর্যন্ত জোহানেসবার্গের মেয়র হতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করছে নির্বাচনের ফল এবং জোট গঠনের সক্ষমতার ওপর। কিন্তু কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশকে নিজের পক্ষে আনতে পারলে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে তা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেবে। দেশটির রাজনীতিতে বর্ণভিত্তিক বিভাজনের বাইরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরির পথও খুলতে পারে।








