ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে নতুন করে জাতিগত সহিংসতায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। শনিবার ও রোববার পৃথক দুটি ঘটনায় কুকি সম্প্রদায়ের পাঁচ সদস্য প্রাণ হারান। রাজ্যটিতে আগে থেকেই চলমান জাতিগত উত্তেজনার মধ্যে নতুন এই হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
রোববার পুলিশ জানায়, শনিবার মণিপুরের ননি জেলায় অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র ব্যক্তিদের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় কুকি সম্প্রদায়ের তিনজন পুরুষ নিহত হন।
এদিকে, কয়েক দিন আগে নিখোঁজ হওয়া একই সম্প্রদায়ের আরও দুই ব্যক্তির মরদেহ রোববার সকালে কাংপোকপি জেলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনী তল্লাশি অভিযান চালানোর পর তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করে।
কুকি সম্প্রদায়ের একটি শীর্ষ সংগঠন এই হত্যাকাণ্ডের জন্য নাগা বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোকে দায়ী করেছে। সংগঠনটি ঘটনাকে তাদের নিজস্ব ভূখণ্ডে সরাসরি ও বিনা উসকানিতে চালানো হামলা বলে উল্লেখ করেছে।
নতুন করে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলসহ বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। কয়েক লাখ মানুষ এসব বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের প্রধান দাবি, কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ভারত সরকারের করা যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিল করতে হবে।
কুকি-নাগা বিরোধের নতুন মাত্রা
মণিপুরে কুকি ও নাগা—উভয় সম্প্রদায়েরই দীর্ঘদিনের বিরোধ রয়েছে। প্রধানত খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী এই দুই জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলগুলোর ওপর জাতিগত ভূখণ্ডের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলে আসছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে কুকি সম্প্রদায়ের কয়েকজনের বিরুদ্ধে এক নাগা ব্যক্তিকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এর পর থেকেই নতুন করে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
মে মাসে নাগা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে কুকি সম্প্রদায়ের তিন ধর্মযাজককে হত্যার অভিযোগ ওঠে। ওই হত্যাকাণ্ডের পর দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অপহরণ ও হত্যার ঘটনা ঘটতে থাকে। সর্বশেষ পাঁচজন নিহত হওয়ার ঘটনা সেই সংঘাতেরই নতুন পর্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মেইতেই-কুকি সংঘাতেও অস্থির মণিপুর
কুকি ও নাগাদের মধ্যে নতুন করে সংঘাতের পাশাপাশি মণিপুরে মেইতেই ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে সহিংসতা চলছে। ২০২৩ সালের মে মাসে অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা ও সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে বিরোধের জেরে এই সংঘাত শুরু হয়।
মূলত হিন্দু ধর্মাবলম্বী মেইতেই এবং প্রধানত খ্রিষ্টান কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যকার এই সংঘাতে এ পর্যন্ত ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ।
সংঘাতের কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়া এসব মানুষ এখনো অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন। দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে না পারা এসব মানুষের জন্য নতুন সহিংসতা নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের সংকট আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
ফলে মণিপুরে এখন একদিকে মেইতেই-কুকি বিরোধ, অন্যদিকে কুকি-নাগা সংঘাত—দুই ধরনের জাতিগত উত্তেজনা একসঙ্গে রাজ্যটির নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করছে।












