যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে দলের বামপন্থী অংশ আরও কঠোর অবস্থান ও সংঘাতের রাজনীতিকে এগিয়ে নিতে চায়। অন্যদিকে একটি অংশ মনে করছে, সাধারণ ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে হলে দলীয় বিভাজন কমিয়ে বাস্তবসম্মত সংস্কার, সহযোগিতা ও জনস্বার্থের রাজনীতিতে ফিরতে হবে। আইওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সাম্প্রতিক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা এই বিতর্ককে নতুন করে সামনে এনেছে।
আইওয়ার রাজনীতিতে ডেমোক্র্যাটদের একসময় শক্ত অবস্থান ছিল। কিন্তু ২০১৫ সালে পাঁচ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা সিনেটর টম হারকিন অবসরে যাওয়ার পর দলটি ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। রিপাবলিকানরা রাজ্য সরকার ও কংগ্রেসে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প আইওয়ায় ১৩ শতাংশের বেশি ব্যবধানে জয়ী হন।
তবে এবারের নির্বাচনে পরিস্থিতিতে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ৮৬ বছর বয়সী হারকিন আবারও নির্বাচনী প্রচারে ফিরেছেন। তিনি ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের সমর্থন দিচ্ছেন, যারা রাজ্য ও জাতীয় পর্যায়ে রিপাবলিকানদের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলছেন।
হারকিনের সমর্থন পাওয়া প্রার্থীদের একজন জশ তুরেক। তিনি আইওয়া থেকে হারকিনের পুরোনো সিনেট আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জন্মগতভাবে স্পাইনা বিফিডিয়ায় আক্রান্ত তুরেক হুইলচেয়ারে চলাফেরা করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনে হারকিনের প্রভাব গভীর।
১৯৯০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ আইন আমেরিকানস উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ অ্যাক্ট (এডিএ) পাস হয়। আইনটি প্রণয়নে হারকিন ছিলেন অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালনকারী। তুরেকের বয়স তখন ১১ বছর। তাঁর মতে, এই আইন না থাকলে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের অনেক কিছুই তাঁর নাগালের বাইরে থেকে যেত।
তবে এই আইনের রাজনৈতিক তাৎপর্য শুধু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আইনটি পাস করতে হারকিন রিপাবলিকান রাজনীতিকদের সহযোগিতা পেয়েছিলেন। তুরেকের মতে, ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানের মানুষ একসঙ্গে কাজ করলে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব।
প্রগতিশীল রাজনীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের দ্বন্দ্ব
এই অভিজ্ঞতাই ডেমোক্রেটিক পার্টির বর্তমান অভ্যন্তরীণ বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে। দলের মধ্যে বিরোধ কেবল প্রগতিশীল ও মধ্যপন্থীদের নীতিগত পার্থক্য নিয়ে নয়; বরং কীভাবে রাজনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করা যায়, তা নিয়েও।
হারকিন নিজেকে এখনো প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থক মনে করেন। তিনি বার্নি স্যান্ডার্সের মতো বামপন্থী নেতাদের সঙ্গে নিজের পার্থক্যকে অনেক ক্ষেত্রে নীতির চেয়ে বক্তব্য ও রাজনৈতিক আচরণের পার্থক্য হিসেবে দেখেন। তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, কোনো প্রস্তাব শুধু জনপ্রিয় কি না, তা নয়; সেটি বাস্তবে আইন ও নীতিতে পরিণত করার সক্ষমতাও।
তুরেক নিজেকে মধ্যপন্থী বললেও তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানে কৃষক ও শ্রমিকদের অধিকারকেন্দ্রিক জনতুষ্টিবাদী ধারার প্রভাব রয়েছে। তিনি ধনকুবেরদের ওপর কর বাড়ানো, বড় করপোরেশনের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধির পক্ষে। এসব দাবির সঙ্গে মিশিগানের ডেমোক্র্যাট সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের অবস্থানেরও মিল রয়েছে।
তবে দুজনের রাজনৈতিক আচরণে বড় পার্থক্য আছে। এল-সায়েদ ডেমোক্র্যাটদের ভেতরেও বিরোধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে আগ্রহী। তিনি দলের ভিন্নমতাবলম্বীদের ভয় দেখানোর ভাষাও ব্যবহার করেছেন। বিপরীতে তুরেক রিপাবলিকানদের সঙ্গেও সংঘাতে যেতে অনাগ্রহী। ট্রাম্পের অভিশংসনের দাবিতেও তাঁর আগ্রহ নেই। তাঁর বক্তব্য, দলীয় স্বার্থের আগে দেশের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নীতি নিয়েও দুই প্রার্থীর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এল-সায়েদ অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা বিলুপ্ত করার পক্ষে, যেখানে তুরেক এর বিরোধী। এল-সায়েদ সবার জন্য সরকারি স্বাস্থ্যসেবা চালুর পক্ষে থাকলেও তুরেক ধাপে ধাপে স্বাস্থ্যসেবার আওতা বাড়ানোর নীতিকে সমর্থন করেন। ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা বন্ধ করতে চান এল-সায়েদ; তুরেক চান এ সহায়তার ওপর কঠোর শর্ত আরোপ করতে।
তবে তাঁদের মধ্যে নীতিগত ব্যবধান যতটা গুরুত্বপূর্ণ, নির্বাচনী রাজনীতিতে আচরণগত ব্যবধানও ততটাই তাৎপর্যপূর্ণ। এল-সায়েদের আক্রমণাত্মক কৌশল এবং তুরেকের সমঝোতামুখী অবস্থান ডেমোক্র্যাটদের সামনে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক পথ তুলে ধরেছে।
শুধু শক্ত ঘাঁটিতে নয়, নতুন ভোটারও প্রয়োজন
আইওয়ার বাইরেও আলাস্কা, কানসাস, সাউথ ক্যারোলাইনা ও টেক্সাসের মতো অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা নতুন করে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবস্থানে ফিরছেন। এসব জায়গায় তুলনামূলক অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমঝোতামুখী প্রচার তাদের জন্য সহায়ক হচ্ছে।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই অভিজ্ঞতা ডেমোক্র্যাটদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে জনসংখ্যার স্থানান্তরের কারণে নিউইয়র্ক ও ক্যালিফোর্নিয়ার মতো ডেমোক্র্যাট-প্রধান অঙ্গরাজ্য থেকে মানুষ ফ্লোরিডা ও টেক্সাসের মতো রিপাবলিকান-প্রধান অঙ্গরাজ্যে চলে যাচ্ছেন। ২০৩০ সালের আদমশুমারির পর কংগ্রেসের আসন ও ইলেকটোরাল কলেজের ভোটসংখ্যাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এ কারণে শুধু নিজেদের ঐতিহ্যগত ভোটের এলাকায় শক্ত অবস্থান ধরে রাখা ডেমোক্র্যাটদের জন্য যথেষ্ট হবে না। নতুন অঙ্গরাজ্যে ভোটারদের সমর্থন অর্জন করা দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আর সে লক্ষ্য অর্জনে দলীয় মেরুকরণ কমানো প্রয়োজন।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও নির্বাচনী বাস্তবতার প্রভাব দেখা যাচ্ছে। আইওয়ায় তুরেকের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী অ্যাশলি হিনসন নিজেকে দুই দলের মানুষের স্বার্থে লড়াই করা প্রার্থী হিসেবে তুলে ধরছেন। ২৫ অক্টোবর ম্যানচেস্টারে এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি ট্রাম্পকে খুব বেশি গুরুত্ব দেননি। বরং জীবনযাত্রার ব্যয় ও সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকটের কথা বলেছেন। তাঁর বক্তব্য, দুই দলের রাজনীতিকদের অনেকেই আইওয়ার পরিশ্রমী মানুষের বাস্তবতা ভুলে গেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের এবারের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী মৌসুম থেকে সবচেয়ে ইতিবাচক শিক্ষা হতে পারে, দুই দলের রাজনীতিকেরা বুঝতে শুরু করবেন যে অধিকাংশ ভোটার আরও বেশি দলীয় সংঘাত চান না। তাঁরা চান জীবনযাত্রার সমস্যার সমাধান, কার্যকর নীতি এবং বাস্তব অগ্রগতি।
ডেমোক্র্যাটদের সামনে তাই প্রশ্নটি শুধু কোন নীতি গ্রহণ করা উচিত, তা নয়। বরং কীভাবে সেই নীতিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সমর্থন নিয়ে বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব, সেটিই এখন দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।












