মধ্যপ্রাচ্যকে আধুনিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করার যে স্বপ্ন উপসাগরীয় দেশগুলো দেখছে, ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ সেই স্বপ্নকে বড় অনিশ্চয়তার মুখে ফেলেছে। একদিকে জাতীয়তাবাদ, শক্ত হাতে শাসন ও নিজস্ব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনীতি, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিদেশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সংযোগের ওপর নির্ভরশীল উন্নয়ন—এই দুইয়ের মধ্যে মৌলিক সংঘাত সামনে এসেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্যনীতি এই সংকটকে আরও জটিল করেছে। একসময় উপসাগরীয় দেশগুলোর শাসকদের প্রশংসায় ভাসিয়েছিলেন তিনি। তাদের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা, জাতীয় গৌরব এবং সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষাকে মধ্যপ্রাচ্যের অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু এখন তাঁর যুদ্ধনীতি সেই অর্থনৈতিক মডেলকেই বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে, যার প্রশংসা তিনি করেছিলেন।
ট্রাম্পের প্রশংসা থেকে উপসাগরীয় দেশগুলোর হতাশা
২০২৫ সালের মে মাসে সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁর বক্তব্যে দুটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। প্রথমত, নিজেদের জাতীয় পরিচয়, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ ধরে রেখে বাইরের দেশের উপদেশ উপেক্ষা করার নীতি। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে শান্তি প্রতিষ্ঠার উপায় হিসেবে গ্রহণ করা।
ট্রাম্পের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের শাসকেরা তেল-গ্যাসের সম্পদ কাজে লাগিয়ে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নৌপরিবহন ও বিমান চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে নিজেদের অবস্থান ব্যবহার করে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছিলেন।
সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো তেল-গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার পরিকল্পনা করছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, আধুনিক বন্দর ও বিমানবন্দর গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছিল। সস্তা জ্বালানি, বিপুল জমি ও আর্থিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের শিল্পে নেতৃত্ব দেওয়ার লক্ষ্য ছিল তাদের।
কিন্তু যুদ্ধ শুরুর পর সেই পরিকল্পনার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। আবুধাবি, দোহা ও দুবাইয়ের নীতিনির্ধারক, গবেষক ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধনীতি নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।
জাতীয়তাবাদ বনাম বৈশ্বিক বাণিজ্য
ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য ভাবনায় একটি মৌলিক অসংগতি রয়েছে। তিনি একদিকে শক্তিশালী জাতীয়তাবাদ, কঠোর নেতৃত্ব এবং অন্যের স্বার্থ উপেক্ষা করে নিজের লক্ষ্য অর্জনের নীতিকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে চান, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক।
কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের বাস্তবতা দেখাচ্ছে, উগ্র জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় ও আদর্শিক আধিপত্যের আকাঙ্ক্ষা এবং সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় বাধা।
ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, ইরানের শাসকগোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর দৃষ্টিতে তাদের মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ আদর্শিক, ধর্মীয় কিংবা ঐতিহাসিক অবস্থানকে রাজনৈতিক বৈধতার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে। এসব লক্ষ্য অর্জনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতেও তারা পিছপা হয় না।
এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে অর্থনৈতিক যোগাযোগব্যবস্থার ওপর।
রাজপ্রাসাদে নিরাপত্তা জোরদার করা যায়। তেলক্ষেত্র ও গ্যাসক্ষেত্র জাতীয় সেনাবাহিনী এবং মার্কিন সামরিক সহায়তায় রক্ষা করা সম্ভব। কিন্তু ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় বিমানবন্দর অচল হয়ে গেলে, সমুদ্রপথ বন্ধ হলে কিংবা প্রযুক্তিকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থাই বিপর্যস্ত হতে পারে।
বিনিয়োগ ও যোগাযোগব্যবস্থাই সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে
উপসাগরীয় দেশগুলোর উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম ভিত্তি বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন, বিমান চলাচল এবং বিদেশি পেশাজীবীদের বসবাস। এসব খাতের জন্য শুধু উন্নত অবকাঠামো যথেষ্ট নয়, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তাও প্রয়োজন।
চলতি বছরে ইরানি ড্রোন ও হুতি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা এই ঝুঁকি বাড়িয়েছে। তথ্যকেন্দ্রের নিরাপত্তায় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বসানো কিংবা সেগুলো মাটির নিচে নির্মাণের মতো পরিকল্পনাও আলোচনায় এসেছে।
কিন্তু বিমানবন্দর বা সমুদ্রের পানি বিশুদ্ধ করার কারখানা মাটির নিচে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। এসব গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় বারবার হামলা হলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, বিমান সংস্থা, জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এবং বিদেশি কর্মীরা বিকল্প গন্তব্য খুঁজবে। ফলে ক্ষতি শুধু একটি স্থাপনায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; পুরো অঞ্চলের অর্থনৈতিক সংযোগ দুর্বল হয়ে পড়বে।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা
উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে এখন আরেকটি কঠিন প্রশ্ন—ইরানের সঙ্গে ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কেমন হবে?
ইরানের হামলায় ক্ষুব্ধ হলেও কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। তারা এমন কোনো সমঝোতা চায় না, যার মাধ্যমে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর একতরফা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার বানাতে পারে।
তবে ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের ঝুঁকি নিয়েও তারা উদ্বিগ্ন। তাদের ধারণা, ইরানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত রাখা গেলে দেশটিরও সমুদ্রপথ ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ সচল রাখার অর্থনৈতিক স্বার্থ তৈরি হবে।
দোহা ও দুবাইয়ের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এমন ধারণাও রয়েছে যে ইরানের কট্টরপন্থী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে হারানোর তেমন কিছু নেই। তাই শুধু সামরিক চাপ দিয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মতে, ইরানের এমন রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা জনগণের কাছে বেশি জবাবদিহি করবে এবং দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে মনোযোগ দেবে।
ট্রাম্পের যুদ্ধনীতিতে শক্তিশালী হচ্ছে ইরানের কট্টরপন্থীরা
ট্রাম্পও প্রকাশ্যে ইরানকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তাঁর সামরিক অভিযানের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক প্রভাব হিসেবে ইরানের কট্টরপন্থীরা আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে বলে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এখানেই ট্রাম্পের নীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি সামনে আসে। তিনি যে মধ্যপ্রাচ্যকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের কেন্দ্র হিসেবে দেখতে চান, সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক নির্ভরতা এবং সংঘাত কমানোর রাজনৈতিক পরিবেশ।
অথচ তাঁর সমর্থিত শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং চলমান সামরিক সংঘাত সেই পরিবেশকেই দুর্বল করছে।
একসময় ট্রাম্পের প্রশংসায় উচ্ছ্বসিত ছিলেন উপসাগরীয় শাসকেরা। এখন তাঁদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতি তাঁর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ শেষ পর্যন্ত অঞ্চলটির অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকেই ধ্বংস করে দিতে পারে।












