চীনের উন্নয়নযাত্রায় সড়ক, সেতু, রেলপথ ও বিমানবন্দর নির্মাণ ছিল অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। গত কয়েক দশকে দেশটি যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। দুর্গম পাহাড় কেটে তৈরি হয়েছে মহাসড়ক, নদীর ওপর উঠেছে বিশাল সেতু, আর একের পর এক শহর যুক্ত হয়েছে দ্রুতগতির রেলপথে। এসব প্রকল্প চীনের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিশ্বজুড়েও দেশটির প্রকৌশল সক্ষমতার পরিচিতি তৈরি করেছে।
কিন্তু এই বিশাল নির্মাণযজ্ঞ এখন নতুন প্রশ্নের মুখে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি অবকাঠামো তৈরি হয়েছে কি না, সেগুলো থেকে বিনিয়োগের অর্থ আদৌ ফেরত আসবে কি না এবং রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কীভাবে মেটানো হবে—এসব বিষয় নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। চীনের পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগও এখন সর্বোচ্চ পর্যায় পার করে কমতে শুরু করেছে।
এর একটি বড় উদাহরণ দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় গুইঝৌ প্রদেশের হুয়াজিয়াং সেতু। গত বছরের সেপ্টেম্বরে চালু হওয়া এই সেতুটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু সেতু। নদীর প্রায় ৬২৫ মিটার ওপরে ঝুলে থাকা সেতুটির মূল অংশের দৈর্ঘ্য ১ হাজার ৪০০ মিটার। এর নিচে প্রায় দুটি আইফেল টাওয়ার পাশাপাশি নয়, একটি আরেকটির ওপর বসালেও জায়গা হয়ে যাবে—এমনই বিশাল এর উচ্চতা।
সেতুটি চালু হওয়ার আগে পাহাড়ি উপত্যকা পার হতে গাড়িতে প্রায় দুই ঘণ্টা লাগত। এখন সেই পথ পাড়ি দেওয়া যায় মাত্র দুই মিনিটে।

প্রকৌশলগত দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে অসাধারণ সাফল্য। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই সেতু ব্যবহার করার মতো পর্যাপ্ত মানুষ ও যানবাহন সেখানে আছে কি না। এলাকাটি দুর্গম এবং তুলনামূলক দরিদ্র। ফলে নিয়মিত ভারী যান চলাচলের সম্ভাবনা কম। প্রায় ২২০ কোটি ইউয়ান ব্যয়ে নির্মিত সেতুটির খরচ টোল আদায় ও পর্যটকদের কাছ থেকে পাওয়া আয় দিয়ে কত দিনে উঠবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগ সর্বোচ্চ পর্যায় পার করেছে
চীনের পরিবহন অবকাঠামো নির্মাণের গতি একসময় এতটাই বেশি ছিল যে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের তৎকালীন চীনবিষয়ক প্রধান বার্ট হফম্যান দেশটিকে নতুন প্রকল্পের বদলে বিদ্যমান অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণে মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন নির্মাণের গতি কমেনি।
অবশেষে ২০২৩ সালে পরিবহন খাতের স্থায়ী সম্পদে বিনিয়োগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ওই বছর এই খাতে ব্যয় হয় ৩৯ লাখ কোটি ইউয়ান।
চলতি বছরের জুলাইয়ে চীনের এক জ্যেষ্ঠ পরিবহন কর্মকর্তা জানান, দেশটির প্রধান পরিবহন নেটওয়ার্কের ৯১ শতাংশ নির্মাণ শেষ হয়েছে। এখন নতুন অবকাঠামো সম্প্রসারণের পরিবর্তে বিদ্যমান সড়ক, রেলপথ ও অন্যান্য যোগাযোগব্যবস্থার মান উন্নয়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তবে বিনিয়োগ কমলেও নির্মাণ পুরোপুরি বন্ধ হচ্ছে না। চীনের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ এখনো পরিবহন অবকাঠামোতে ব্যয় হচ্ছে। ২০০৭-০৯ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর সরকারি প্রণোদনার সময় এই হার ৯ শতাংশে উঠেছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ২০২৪ সালে একই খাতে ব্যয় ছিল জিডিপির মাত্র ০ দশমিক ৬ শতাংশ।
অর্থাৎ বিনিয়োগের গতি কমলেও আন্তর্জাতিক তুলনায় চীন এখনো পরিবহন অবকাঠামোতে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করছে।
সড়ক ও রেলপথের বিশাল নেটওয়ার্ক
চীনের অবকাঠামো সম্প্রসারণের চিত্র সবচেয়ে স্পষ্ট সড়ক ও রেলপথে। ১৯৯০ সালে প্রথম এক্সপ্রেসওয়ে চালুর পর থেকে দেশটি প্রায় দুই লাখ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করেছে। এই দৈর্ঘ্য যুক্তরাষ্ট্রের মোট মহাসড়কের প্রায় দ্বিগুণ।

দেশটিতে এখন প্রায় ২৭০টি বাণিজ্যিক বিমানবন্দর রয়েছে। ১৯৯০ সালের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় তিন গুণ। যুক্তরাষ্ট্রে বিমানবন্দরের সংখ্যা এখনো প্রায় দ্বিগুণ হলেও দুই দেশের ব্যবধান কমছে। চীন প্রতিবছর নতুন করে প্রায় ছয়টি বিমানবন্দর নির্মাণ করছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের ঘটনা খুবই বিরল।
উচ্চগতির রেলপথেও চীন বিশ্বের শীর্ষে। গত বছরের শেষ নাগাদ দেশটিতে এই রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য ৫০ হাজার কিলোমিটার ছাড়িয়েছে, যা বিশ্বের মোট উচ্চগতির রেলপথের প্রায় ৭০ শতাংশ। ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও ২০ হাজার কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এই সম্প্রসারণ বাস্তবায়িত হলে চীনের উচ্চগতির রেলপথের দৈর্ঘ্য ইউরোপের বর্তমান নেটওয়ার্কের প্রায় দেড় গুণ হবে।
পরিবহন খাতের বাইরেও আগামী পাঁচ বছরে বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থা, তথ্যকেন্দ্র, মোবাইল নেটওয়ার্ক, পণ্য পরিবহন, খাল ও পাইপলাইনসহ ছয় ধরনের অবকাঠামো নির্মাণে ২৫ লাখ কোটি ইউয়ান ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।
যেখানে প্রয়োজন কম, সেখানেই বেশি নির্মাণ
চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে প্রকল্পের অবস্থান ও বাস্তব চাহিদার মধ্যে অসামঞ্জস্য নিয়ে।
অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে দ্রুতগতির সড়ক ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার প্রয়োজন তুলনামূলক বেশি। সাংহাই ও ঝেজিয়াংয়ের মতো শিল্পোন্নত এলাকায় পণ্য পরিবহন এবং মানুষের যাতায়াতের চাহিদাও বেশি। কিন্তু নতুন মহাসড়ক নির্মাণের গতি সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ইউনান ও গুয়াংসির মতো অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকায়।
চীনের অর্থনীতিবিদ লি শুনলেইয়ের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে যেসব এলাকায় সবচেয়ে বেশি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হয়েছে, সেসব এলাকায় পণ্য পরিবহনের চাহিদা বেড়েছে সবচেয়ে কম।
২০২৩ সালে চীনের মহাসড়কের প্রতি কিলোমিটারে যানবাহনের সংখ্যা ছিল এক হাজার ৮০০-এর সামান্য কম। অধিকাংশ উন্নত দেশের তুলনায় এই অনুপাত অনেক কম। অর্থাৎ বিশাল সড়ক নেটওয়ার্ক তৈরি হলেও সব জায়গায় তার ব্যবহার সমানভাবে বাড়েনি।
উচ্চগতির রেলপথেও একই চিত্র। দরিদ্র অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের অনেক রেলে আসন খালি থাকে। অন্যদিকে বেইজিং-সাংহাইয়ের মতো ব্যস্ত রুটে যাত্রীসংখ্যা বেশি এবং সেগুলো তুলনামূলক লাভজনক।
২০১৯ সালে বিশ্বব্যাংকের এক পর্যালোচনায় বলা হয়েছিল, চীনের অনেক রেলপথে যাত্রীসেবা পরিচালনার খরচ আয় দিয়ে মেটানো গেলেও অবকাঠামোর রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় মেটানোর মতো অর্থ থাকে না।
বিমানবন্দরেও একই সমস্যা দেখা যাচ্ছে। ২০১৯ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের ৪৩ শতাংশ বাণিজ্যিক বিমানবন্দরে যাত্রীর সংখ্যা কমেছে। এই হিসাবের মধ্যে ২০১৯ সালের পর চালু হওয়া নতুন বিমানবন্দরগুলো অন্তর্ভুক্ত নয়। যাত্রী কমার প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে বড় শহরের বাইরের বিমানবন্দরগুলোতে।

উন্নয়নের আড়ালে উচ্ছেদ ও ঋণের চাপ
চীনের অবকাঠামো সম্প্রসারণের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক ব্যয় নয়, বড় ধরনের সামাজিক মূল্যও রয়েছে। সড়ক, রেলপথ, বিমানবন্দর ও অন্যান্য প্রকল্প নির্মাণের জন্য লাখ লাখ নয়, বাস্তবে কয়েক মিলিয়ন মানুষকে নিজেদের জমি ও বসতভিটা ছেড়ে যেতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে তাদের সম্মতি নেওয়া হয়নি। কেউ কেউ যথাযথ ক্ষতিপূরণও পাননি।
অন্যদিকে এসব প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে স্থানীয় সরকারগুলো বিপুল ঋণ নিয়েছে। বিশেষ করে এক্সপ্রেসওয়ে ও রেলপথের স্থানীয় অংশ নির্মাণে তাদের বড় ভূমিকা ছিল। সরকারি হিসাবের বাইরে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেওয়া স্থানীয় সরকারের ঋণ ৭২ লাখ কোটি ইউয়ানে পৌঁছাতে পারে। দেশটির জিডিপির প্রায় ৫১ শতাংশের সমান এই ঋণ।
দরিদ্র প্রদেশগুলো এ ধরনের ঋণের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেছে। গুইঝৌ তার একটি উদাহরণ। ফলে হুয়াজিয়াং সেতুর মতো ব্যয়বহুল প্রকল্পের ঋণের বোঝা শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সরকারকেই বহন করতে হতে পারে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে আরেকটি সমস্যা। অবকাঠামোর ঋণ পরিশোধ ও রক্ষণাবেক্ষণে বেশি অর্থ ব্যয় হলে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো খাতে সরকারের ব্যয় করার সুযোগ কমে যাবে। অথচ চীনের এসব খাতেই বাড়তি অর্থের প্রয়োজন রয়েছে। সাধারণ মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানো গেলে তারা সঞ্চয়ের বদলে ভোগব্যয় বাড়াতে উৎসাহিত হতে পারে, যা অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

জনসংখ্যা কমলে অবকাঠামোর চাহিদাও কমবে
চীনের অবকাঠামো পরিকল্পনার সামনে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হচ্ছে জনসংখ্যার দ্রুত বার্ধক্য। দেশটিতে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় তাদের ভ্রমণের প্রবণতা কম।
জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি কমে যেতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে রেলপথ, মহাসড়ক ও বিমানবন্দরের ব্যবহারকারীর সংখ্যাও কমার আশঙ্কা রয়েছে।
চীনের অবকাঠামো নির্মাণের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হলো, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়ায়। দ্রুত পণ্য পরিবহন, কম যাতায়াত সময় এবং বড় শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সুবিধা দেয়। নতুন সড়ক ও রেলপথ পুরোনো যোগাযোগব্যবস্থার ওপর চাপও কমাতে পারে।
তবে এসব সুবিধা তখনই অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর হয়, যখন প্রকল্পের সঙ্গে বাস্তব চাহিদার সামঞ্জস্য থাকে। শুধু বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু সেতু, দীর্ঘতম সুড়ঙ্গ কিংবা আধুনিক বিমানবন্দর নির্মাণ করলেই অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত হয় না।
চীনের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ নতুন অবকাঠামো নির্মাণের রেকর্ড গড়া নয়, বরং ইতিমধ্যে তৈরি বিশাল নেটওয়ার্ককে কার্যকর ও আর্থিকভাবে টেকসই রাখা। অন্যথায় উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে নির্মিত এসব স্থাপনাই একসময় অর্থনীতির ওপর বাড়তি ঋণ ও রক্ষণাবেক্ষণের বোঝা হয়ে উঠতে পারে।












