বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন পণ্যসুপারচক্রের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিদ্যুতায়ন, আধুনিক অস্ত্র ও ভবিষ্যতের প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় বিরল খনিজের নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। আর এই প্রতিযোগিতায় সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছে এমন কয়েকটি দেশ, যাদের মাটির নিচে রয়েছে বিপুল খনিজসম্পদ এবং যাদের পুরোনো বা বন্ধ হয়ে যাওয়া খনি দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
প্রাকৃতিক সম্পদ দীর্ঘদিন ধরেই দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এসব দেশের শিল্প ও সেবা খাত তুলনামূলক কম উন্নত হওয়ায় তেল, তামা, কোবাল্ট, লিথিয়াম কিংবা অন্যান্য খনিজসম্পদের চাহিদা ও দাম বাড়লে জাতীয় অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। অতীতে চীনের দ্রুত শিল্পায়নের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও ধাতুর চাহিদা বেড়েছিল। সেই সময় তেল বিক্রির আয়েই ২০০২ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে অ্যাঙ্গোলার মোট দেশজ উৎপাদন প্রায় দ্বিগুণ হয়েছিল।
এবার নতুন করে একই ধরনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তবে এবারের চাহিদার পেছনে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, বৈদ্যুতিক যানবাহন, বিদ্যুৎ অবকাঠামো ও সামরিক প্রযুক্তির সম্প্রসারণ।
বিশ্বব্যাংকও এই সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিচ্ছে। গত ১৬ অক্টোবর সংস্থাটি খনিজসম্পদের বাড়তি চাহিদা কাজে লাগাতে দেশগুলোকে সহায়তার জন্য তহবিল পাঁচ গুণ বাড়িয়ে ২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে শুধু খনিজসম্পদ থাকলেই হবে না। দ্রুত উৎপাদন শুরু করা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ নিশ্চিত করার সক্ষমতাও থাকতে হবে।

চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র
বিরল মৃত্তিকা মৌল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বাজারে চীনের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কৌশলগত উদ্বেগ হয়ে উঠেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে চীন সাত ধরনের বিরল মৃত্তিকা মৌলের রপ্তানি সীমিত করলে পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেমিকন্ডাক্টর ও অস্ত্র তৈরিতে এসব খনিজ গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় চীনের সিদ্ধান্তের মুখে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চীনা পণ্যের ওপর আরোপ করা কিছু শুল্ক থেকে পিছিয়ে আসতে হয়।
এরপর চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে যুক্তরাষ্ট্র খনিজসম্পদ সংগ্রহ ও উৎপাদনে ব্যাপক বিনিয়োগ শুরু করে। খনিজ মজুত গড়ে তোলা, উৎপাদকদের জন্য ন্যূনতম দাম নিশ্চিত করা এবং বিদেশি খনিতে অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগকারীদেরও উৎসাহিত করছে ওয়াশিংটন।
২০২৫ সালে বিদেশি খনিতে মার্কিন সরকার ও দেশটির বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। আগের বছর এই বিনিয়োগ ছিল প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। এর বিপরীতে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন খনি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে ৩০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দুই পরাশক্তির প্রতিযোগিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
সবচেয়ে বেশি লাভবান কঙ্গো
এই প্রতিযোগিতার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশগুলোর একটি মধ্য আফ্রিকার গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র। দেশটিতে বিপুল পরিমাণ তামা, কোবাল্ট, লিথিয়াম, টিন ও হীরার মজুত রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা একসময় দেশটি থেকে সরে গিয়েছিলেন।
খনিজের দাম কমে যাওয়ার পর অনেক পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান তাদের সম্পদ বিক্রি করে দেয়। সেই সুযোগে চীনা কোম্পানিগুলো তুলনামূলক কম দামে খনির মালিকানা ও প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
চীন এখন দেশটিতে তামার খনি সম্প্রসারণে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি বছরে পাঁচ লাখ টন পর্যন্ত তামা উৎপাদনে সক্ষম আরেকটি বড় খনি গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও কঙ্গোতে ফিরছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক গ্লেনকোর পরিচালিত একটি তামার খনির ৪০ শতাংশ মালিকানা কেনার বিষয়ে মার্কিন অর্থায়নপুষ্ট একটি তহবিল আলোচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও লিথিয়াম, কোবাল্ট ও তামার খনিতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
এর প্রভাব কঙ্গোর অর্থনীতিতে ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৮ শতাংশের সমান ছিল বিদেশি খনি বিনিয়োগ। আগের বছরের মোট প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের তুলনায় এই অঙ্ক ছিল দ্বিগুণেরও বেশি।
দেশটির অবকাঠামো উন্নয়নেও খনিজ বিনিয়োগের অর্থ কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কঙ্গোর দিলোলো-সাকানিয়া রেলপথ নির্মাণে এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থা। এই রেলপথ অ্যাঙ্গোলার সঙ্গে সংযোগ তৈরি করবে এবং এক দশকের মধ্যে কঙ্গোর সবচেয়ে বড় অবকাঠামো প্রকল্প হতে পারে।
খনি খাত থেকে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে কঙ্গো সরকারের আয় আট বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উৎপাদন আরও বাড়লে এই আয় ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে, যা দেশটির এক বছরের সরকারি ব্যয়ের কাছাকাছি।

ব্রাজিল ও কাজাখস্তানেও বিনিয়োগের জোয়ার
কঙ্গোর পাশাপাশি ব্রাজিল ও কাজাখস্তানও যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার বড় সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে।
ব্রাজিলে বিরল মৃত্তিকা মৌল উৎপাদন ও সরবরাহের একটি শক্তিশালী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। গত সেপ্টেম্বরে মার্কিন সরকারের অংশীদারত্ব থাকা কোম্পানি ইউএসএ রেয়ার আর্থ ব্রাজিলের সেরা ভার্দে খনির নিয়ন্ত্রণ নেয়। এশিয়ার বাইরে চারটি বিরল মৃত্তিকা মৌলের একমাত্র উৎপাদক এই খনিটি।
খনি অধিগ্রহণে প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ২ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অর্থায়ন এবং উন্নয়ন অর্থায়ন সংস্থার ঋণ যুক্ত হলে ব্রাজিলে তাদের মোট বিনিয়োগ প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
অন্যদিকে কাজাখস্তানের টাংস্টেন খনিজের প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। আধুনিক অস্ত্র ও উচ্চপ্রযুক্তির সামরিক সরঞ্জাম তৈরিতে এই খনিজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের নভেম্বরে মার্কিন প্রশাসন-সমর্থিত কাজ রিসোর্সেস কাজাখস্তানের কাইরাকতি ও নর্দার্ন কাটপার খনি উন্নয়নে এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। আরও ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণ ও অর্থায়নের সম্ভাবনা রয়েছে।
চীনের বিনিয়োগের পরিধি অবশ্য আরও বিস্তৃত। ২০২৫ সালে দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো ব্রাজিলে প্রায় ছয় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে। এর এক-তৃতীয়াংশ গেছে নিকেল, তামা ও সোনার খনিতে। কাজাখস্তানেও তামা, সোনা ও টাংস্টেন প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ রয়েছে।
এক পক্ষ বেছে নিতে চাইছে না দেশগুলো
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আগে বলেছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশকে ওয়াশিংটনের পক্ষ বেছে নিতে হবে এবং চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা কমাতে হবে। কিন্তু বাস্তবে কঙ্গো, ব্রাজিল ও কাজাখস্তানের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে।
দেশগুলো একই সঙ্গে দুই পরাশক্তির কাছ থেকে বিনিয়োগ নিচ্ছে। বরং প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের জন্য বেশি সুবিধা আদায় করছে।
২০২৫ সালে বিদেশে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্মিলিত খনি বিনিয়োগের প্রায় ৮০ শতাংশ গেছে মাত্র পাঁচটি দেশে—কঙ্গো, ব্রাজিল, কাজাখস্তান, জাম্বিয়া ও কানাডা। কানাডা ছাড়া বাকি দেশগুলো এই প্রতিযোগিতা থেকে উল্লেখযোগ্য সুবিধা পাচ্ছে।
কঙ্গো চীনের কাছ থেকে স্থানীয় পর্যায়ে খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণে সহযোগিতা ও আরও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি আদায় করেছে। কাজাখস্তানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ প্রকল্পে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মালিকানা নিশ্চিত করতে পেরেছে।

দ্রুত লাভের কৌশলে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি
তবে এই বিনিয়োগের কৌশলের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মূলত এমন খনিগুলোর দিকে ঝুঁকছে, যেগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত, আংশিক উন্নত কিংবা বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। এসব খনি তুলনামূলক কম সময়ে আবার চালু করা সম্ভব।
কিন্তু নতুন খনিজের সন্ধান, অনুসন্ধান ও খনি উন্নয়নে বিনিয়োগ তুলনামূলক কম। গত পণ্যসুপারচক্রের অবসানের পর খনিজ অনুসন্ধানে ব্যয় আর আগের পর্যায়ে ফিরে যায়নি।
বিশ্বে তামার চাহিদা আগামী দশ বছরে সরবরাহের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি হতে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। অথচ বিশ্বের সবচেয়ে বড় তামা উৎপাদক চিলি পুরোনো খনিতে বিনিয়োগের অভাবে উৎপাদন কমিয়েছে।
নতুন খনি আবিষ্কার ও উৎপাদনে আনতে অনেক ক্ষেত্রে এক দশক বা তারও বেশি সময় লাগে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সরকারি হস্তক্ষেপ বাজারে দামের স্বাভাবিক সংকেতকে জটিল করে তুলছে। ফলে নতুন খনি অনুসন্ধানে বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হচ্ছে।
অর্থাৎ বিরল খনিজের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা আপাতত কঙ্গো, ব্রাজিল ও কাজাখস্তানের মতো কয়েকটি দেশের জন্য বড় অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু এই সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী করতে হলে শুধু বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। খনিজ অনুসন্ধান, স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তা না হলে ভূগর্ভের সম্পদ সাময়িক অর্থনৈতিক সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদি সমৃদ্ধির নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।












