ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান সংঘাতের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও গ্যাস খাতের সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয় দ্রুত বাড়ছে। জাহাজ চলাচলে অনিশ্চয়তা, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি এবং নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় পুনর্মূল্যায়ন করতে হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এর প্রভাব পড়ছে চুক্তি বাস্তবায়ন, কোম্পানির মুনাফা এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও মূল্যস্ফীতিতে।
মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে এক সম্মেলনে তেলসেবা খাতের কয়েকজন শীর্ষ নির্বাহী এসব তথ্য জানান।
ইরান যুদ্ধের প্রভাবে কয়েকটি দেশের জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় কর্মীদের সরিয়ে নিতে হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম সরবরাহ কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে পরিবহন, শ্রমিক এবং বিমা খরচ বেড়েছে।
ইতালির প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান মাইরের প্রধান নির্বাহী আলেসান্দ্রো বেরনিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রকল্পগুলোর সরবরাহ ও পরিবহন ব্যয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে আগের তুলনায় তিন গুণ হয়েছে। জ্বালানির খরচ বেড়েছে দ্বিগুণ। একই সময়ে শ্রমিকদের ব্যয় বেড়েছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ।
তিনি বলেন, এসব অতিরিক্ত ব্যয় কোম্পানিগুলোর মুনাফার ওপর চাপ তৈরি করছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের খরচ বাড়ছে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দাম এবং বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতিতে পড়তে পারে।
হরমুজ প্রণালিতে আটকে সরবরাহ
ইতালির আরেক জ্বালানি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাইপেমের প্রধান নির্বাহী আলেসান্দ্রো পুলিতি বলেন, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম পৌঁছাতে না পারায় সরবরাহব্যবস্থা বড় সমস্যায় পড়েছে। হরমুজ প্রণালির বাইরে তাদের জাহাজগুলো কয়েক মাস ধরে অপেক্ষা করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থার জন্য হরমুজ প্রণালি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটলে শুধু অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস পরিবহন নয়, জ্বালানি প্রকল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণ সরবরাহও বাধাগ্রস্ত হয়।
এতে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় ধরে সরঞ্জাম পরিবহন ও সংরক্ষণ করতে হওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাড়তি ব্যয় নিজেরাই বহন করছে কোম্পানি
মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান ও ইরাকে কার্যক্রম পরিচালনাকারী তেলসেবা প্রতিষ্ঠান এনইএসআরের প্রধান নির্বাহী শরিফ ফোদা জানান, তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যয় বেড়েছে জাহাজ পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায়।
সম্ভাব্য সরবরাহ বিঘ্নের আশঙ্কায় প্রতিষ্ঠানটিকে প্রয়োজনীয় উপকরণ দীর্ঘ সময় গুদামে সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। এতে সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও বাড়ছে।
ফোদা বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করছে। পরিস্থিতি পছন্দনীয় না হলেও ব্যবসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের জন্য বড় উদ্বেগ হলো, এই ব্যয়বৃদ্ধি শুধু তেলসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। নতুন প্রকল্পের দরপত্র, চলমান চুক্তির ব্যয় এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের হিসাবেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
জ্বালানি উত্তোলন ও সরবরাহ অবকাঠামোর খরচ বাড়লে উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও চাপ তৈরি হবে। দীর্ঘ সময় এ পরিস্থিতি চললে তার প্রভাব জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা পেরিয়ে পরিবহন, শিল্প উৎপাদন ও ভোক্তাপর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।












