ভারতে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। দুর্বল বর্ষা, পানির সংকট, বৈশ্বিক বাজারে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং এল নিনোর প্রভাবে দেশটির কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে চাল, গম, ডাল, চিনি, পেঁয়াজ, দুধ ও মুরগির মাংসের দামে। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।
ভারতের কৃষকদের জন্য এবারের শীতকালীন ফসলের মৌসুম শুরু হচ্ছে অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাতের কারণে বিশেষ করে দেশটির দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকেরা জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা পাচ্ছেন না। ফলে গম, ছোলা ও অন্যান্য শীতকালীন ফসলের আবাদ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের জলনা জেলার রাজেওয়াড়ি গ্রামের ৭৮ বছর বয়সী কৃষক অমরসিং গুশিঙ্গের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গম ও ছোলা চাষের পরিকল্পনা থাকলেও পানির অভাবে তিনি জমি প্রস্তুত করতে পারছেন না। তাঁর এলাকার বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৪৮ শতাংশ কম হয়েছে। কৃষকদের হাতে পরবর্তী ফসল উৎপাদনের প্রয়োজনীয় অর্থও কমে এসেছে।
দুর্বল বর্ষায় ফসল উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা
ভারতে বর্ষাকালের বৃষ্টিপাত কৃষি উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবারের দুর্বল বর্ষার কারণে মাটিতে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতার ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এতে শীতকালীন ফসলের অঙ্কুরোদ্গম, গাছের বৃদ্ধি এবং শেষ পর্যন্ত উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।
উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যপণ্যের বাজারে সরবরাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতিমধ্যে চিনি, ডাল, গম ও চালের দাম বাড়ছে। পাশাপাশি ভারতীয় রান্নায় বহুল ব্যবহৃত পেঁয়াজের দামও ঊর্ধ্বমুখী। দুধ, ডিম ও মুরগির মাংসের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দামেও চাপ তৈরি হয়েছে।
ভারতের অর্থনীতিতে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ায় না, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতেও প্রভাব ফেলে। অতীতে পেঁয়াজের দাম বেড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলগুলোকে বিরূপ পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়েছে।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা
ভারতের বাজারে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আগামী অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন ইন্ডিয়া রেটিংস অ্যান্ড রিসার্চের প্রধান অর্থনীতিবিদ দেবেন্দ্র পান্ত।
তাঁর মতে, দুর্বল বৃষ্টিপাত, আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্য এবং রুপির অবমূল্যায়ন—এই তিনটি বিষয় খাদ্য মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
গত সেপ্টেম্বরে ভারতে বার্ষিক খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৭ দশমিক ৭৪ শতাংশে দাঁড়ায়। একই সময়ে সামগ্রিক খুচরা মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত ৬ শতাংশের সর্বোচ্চ সহনীয় সীমার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এই হার।
মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন পান্ত। তাঁর ধারণা, ডিসেম্বরে পরবর্তী নীতিনির্ধারণী বৈঠকে আরও ৫০ থেকে ৭৫ ভিত্তি পয়েন্ট সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। এর আগে অক্টোবরেও সুদের হার বাড়ানো হয়েছিল।

দুধ, ডিম ও মাংসের দাম বাড়াচ্ছে উৎপাদন ব্যয়
ভারতে খাদ্য মূল্যস্ফীতির অন্যতম বড় চালক হয়ে উঠেছে প্রাণিজ আমিষজাত পণ্য। মুরগির খাদ্য, পশুখাদ্য, পরিবহন, প্যাকেজিং ও জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এসব পণ্যের উৎপাদন খরচ বাড়ছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সেপ্টেম্বরের মুদ্রানীতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়ার ক্ষেত্রে প্রাণিজ আমিষ ও মসলার দাম বৃদ্ধির বড় ভূমিকা ছিল। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে মুরগির মৃত্যুহার বেড়ে যাওয়াও বাজারে সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলেছে।
সেপ্টেম্বরে মাংসের মূল্যস্ফীতি আগস্টের ১২ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। তবে দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য ও ডিমের মূল্যস্ফীতি একই সময়ে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।
মুরগির উৎপাদন ব্যয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই আসে ভুট্টা ও সয়াবিনের মতো পশুখাদ্য থেকে। উৎপাদনকারীরা এখনো বাড়তি ব্যয়ের পুরোটা ভোক্তাদের ওপর চাপাতে পারেননি। তবে সরবরাহ সংকুচিত হওয়া এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়তে থাকায় আগামী জানুয়ারি থেকে ব্রয়লার মুরগির দাম আরও বাড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, আমিষজাত খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হলে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে ডাল, মাংস, দুধ ও ডিমের মতো পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দিতে পারে। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে জনস্বাস্থ্যের ওপর।
চিনি ও ভোজ্যতেলের বাজারেও স্বস্তি নেই
ভারতে চিনির উৎপাদন টানা দ্বিতীয় বছরের মতো অভ্যন্তরীণ চাহিদার তুলনায় কম হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরে দেশটিতে চিনির ব্যবহার ২ কোটি ৯০ লাখ টনের বেশি হলেও উৎপাদন ২ কোটি ৭৫ লাখ টনের নিচে থাকতে পারে।
গত এক বছরে চিনির দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ১০ লাখ টন চিনি শুল্কমুক্তভাবে আমদানির অনুমতি দিয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে চিনির দাম দেশের অভ্যন্তরীণ দামের চেয়ে বেশি থাকায় আমদানির মাধ্যমে বাজারে বড় ধরনের স্বস্তি ফেরানো কঠিন হতে পারে।
ভোজ্যতেল ও ডালের ক্ষেত্রেও আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারের উচ্চমূল্য, রুপির দুর্বলতা এবং পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি সেই সুবিধা সীমিত করছে।
এল নিনোর প্রভাবে অন্যান্য দেশেও কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চল থেকে শস্য ও সূর্যমুখী তেলের সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ছে।
চাল ও গমের বাজারেও বাড়তি চাপ
ভারতের সরকারি গুদামে চাল ও গমের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও বাজারে দাম কমছে না। এর অন্যতম কারণ, ভোক্তাদের পছন্দের উন্নত মানের চালের সরবরাহ সীমিত হয়ে পড়েছে।
দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে চালের চাহিদা ও পছন্দের ধরন আলাদা। দক্ষিণ ভারতে জনপ্রিয় কিছু জাতের চালের উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেসব চালের দাম বাড়ছে।
অন্যদিকে, এল নিনোর কারণে শীতকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকতে পারে—এমন আশঙ্কায় গমের উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইতিমধ্যে গমের দাম প্রায় দুই বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
আগামী কয়েক মাসে খাদ্যপণ্যের বাজার কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে শীতকালীন ফসলের উৎপাদনের ওপর। জমিতে আর্দ্রতার ঘাটতি এবং শীতকালে তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা উৎপাদন আরও কমিয়ে দিতে পারে।
ভারত সরকারের অক্টোবরের অর্থনৈতিক পর্যালোচনাতেও বলা হয়েছে, উচ্চ জ্বালানি তেলের দাম, খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং শীতকালীন ফসলের অনিশ্চিত উৎপাদন পরিস্থিতির মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখা ও মূল্যস্থিতি বজায় রাখা নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।












