কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিতে বিশ্বজুড়ে প্রতিযোগিতায় চীন এখন অন্যতম প্রধান শক্তি। দেশটির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন নতুন মডেল তৈরি করছে, সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি বাড়ছে এবং এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগও সম্প্রসারিত হচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোচ্ছে না চীনের শেয়ারবাজার। বরং গত কয়েক মাসে বাজারে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের দরপতন ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট।
বিষয়টি অর্থনীতিবিদ ও বিনিয়োগকারীদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছে—চীন যদি ভবিষ্যতের প্রযুক্তি অর্থনীতিতে এগিয়ে থাকে, তাহলে দেশটির শেয়ারবাজার এতটা হতাশাজনক অবস্থায় কেন?
চীনের এআই খাতের সম্ভাবনা বোঝাতে বেইজিংভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মুনশট এআই একটি উদাহরণ। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করছেন এবং তাদের তৈরি কিমি কে৩ মডেল সম্প্রতি আরও উন্নত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আগামী বছর হংকংয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছে। দক্ষ উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নতুন প্রযুক্তি নিয়ে সরকারের আগ্রহ—সব মিলিয়ে চীনের এআই খাতের সম্ভাবনা যথেষ্ট।
তবে এই সম্ভাবনার প্রতিফলন দেশটির শেয়ারবাজারে দেখা যাচ্ছে না।
প্রযুক্তির শেয়ারেই সবচেয়ে বেশি চাপ
চীনের প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারের সূচকগুলোর মধ্যে শেনঝেনের চিয়েনেক্সট সূচক সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। চার মাসে সূচকটি প্রায় ৪০ শতাংশ হারিয়েছে। এই দরপতনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে অপেক্ষাকৃত বড় কোম্পানিগুলোর শেয়ার নিয়ে গঠিত সিএসআই ৩০০ সূচকেও।

অক্টোবরে সিএসআই ৩০০ সূচক জুনের সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ২০ শতাংশ কমে যায়। প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো শেয়ারবাজারের সূচক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে ২০ শতাংশ বা তার বেশি কমলে সেটিকে নিম্নমুখী বাজার বা বিয়ার মার্কেট বলা হয়।
অথচ ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। চীনের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে একটি ধীরগতির কিন্তু স্থিতিশীল ঊর্ধ্বমুখী শেয়ারবাজার গড়ে তোলার চেষ্টা করছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল, শেয়ারবাজারের অতিরিক্ত উত্থান-পতন ঠেকিয়ে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ানো এবং নতুন কোম্পানিগুলোর জন্য মূলধন সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করা।
বছরের প্রথম ছয় মাসে সেই পরিকল্পনা কিছুটা সফলও হয়েছিল। সিএসআই ৩০০ সূচক ধীরে ধীরে বাড়ছিল। জুলাইয়ে চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান সিএক্সএমটি সাংহাইয়ে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে ৬৬৬০ কোটি ইউয়ান সংগ্রহ করে, যার মূল্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
এআই নিয়ে সংশয় ও সরকারের ব্যয় সংকোচন
বছরের মাঝামাঝি থেকে বাজারের পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। এর পেছনে দুটি বড় কারণ কাজ করেছে—এআই ব্যবসার ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে সংশয় এবং সরকারের ব্যয় সম্প্রসারণে সতর্ক অবস্থান।
এআই প্রযুক্তিতে বিপুল বিনিয়োগ হলেও এসব প্রযুক্তির ব্যবহারকারীরা ভবিষ্যতে কতটা অর্থ ব্যয় করবেন, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। চীনের ক্ষেত্রে এই উদ্বেগ আরও বেশি। দেশটির অনেক প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যারের জন্য অর্থ ব্যয় করতে অনাগ্রহী। পাশাপাশি এআই বাজারে প্রতিযোগিতাও তীব্র।
মুনশট এআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠান সফল হলে একই খাতের তালিকাভুক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোর ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। যেমন কিমি মডেলের অগ্রগতি মিনিম্যাক্সের মতো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসার জন্য প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
অন্যদিকে, বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা ছিল, ২০২৬ সালে সরকার অবকাঠামো নির্মাণ এবং পরিবারগুলোর হাতে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙা করতে বড় ধরনের উদ্যোগ নেবে। কিন্তু সরকার সে পথে না গিয়ে রপ্তানি চাহিদার ওপর বেশি নির্ভর করেছে।
রপ্তানি আয় বাড়ায় সরকার নতুন করে ব্যয় বাড়ানোর পরিবর্তে আর্থিক শৃঙ্খলা ও বাজেটের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারের দিকে মনোযোগ দিয়েছে।

এআইয়ের সাফল্যই তৈরি করছে অর্থনীতির নতুন বৈপরীত্য
চীনের বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো, শেয়ারবাজারের দুর্বলতার পেছনে যে কারণগুলো কাজ করছে, সেগুলোর একটি আবার অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও সহায়তা করছে।
বিশ্বজুড়ে এআই প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ায় চীনের সেমিকন্ডাক্টর বা অর্ধপরিবাহী যন্ত্রাংশের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে দেশটির সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে।
বিশ্ববাজারে এআই খাতের চাহিদা চীনের অর্থনীতিকে বাড়তি গতি দিয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে চাঙা করতে সরকারকে বড় ধরনের প্রণোদনা দিতে হয়নি। কিন্তু সরকারি ব্যয় সম্প্রসারণ না হওয়ায় দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল থেকেছে। এর প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন কোম্পানির ব্যবসা ও শেয়ারদরে।
অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে এআইয়ের চাহিদা চীনের রপ্তানি ও প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে প্রত্যাশিত গতি তৈরি করতে পারেনি। এই বৈপরীত্যই শেয়ারবাজারের হতাশাকে আরও গভীর করেছে।
বাজার সামলাতে আবার সক্রিয় সরকার
তবে সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারের পতন ঠেকাতে সরকার-সমর্থিত বড় বিনিয়োগকারীরা আবার সক্রিয় হয়েছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে গঠিত তথাকথিত ‘ন্যাশনাল টিম’ অতীতে বাজারে বড় দরপতন হলে শেয়ার কিনে স্থিতিশীলতা ফেরানোর চেষ্টা করেছে।
ম্যাকোয়ারি ব্যাংকের বিশ্লেষক ল্যারি হুর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চীনের সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের অংশ সেন্ট্রাল হুইজিনের নিয়ন্ত্রণাধীন এক্সচেঞ্জ ট্রেডেড ফান্ডগুলোতে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য অর্থপ্রবাহ দেখা গেছে। এটি বাজারে সরকারি সমর্থন ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এ ছাড়া এআইনির্ভর অর্থনীতির প্রয়োজন মেটাতে সরকার ‘ছয়টি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলার জন্য বিনিয়োগ সংগঠিত করছে। এর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, কম্পিউটিং এবং যোগাযোগ অবকাঠামো। এসব ব্যবস্থা ভবিষ্যতে এআই প্রযুক্তির সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিও কিছুটা বেড়েছে। একই সঙ্গে সিএসআই ৩০০ সূচক আবার ৪ হাজার পয়েন্টের প্রতীকী সীমার ওপরে উঠেছে।
তবে বাজারের এই সাময়িক পুনরুদ্ধার দীর্ঘমেয়াদি আস্থা ফেরাতে পারবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। চীনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, রপ্তানি আয় এবং সরকারি বিনিয়োগ একদিকে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। অন্যদিকে, অভ্যন্তরীণ চাহিদার দুর্বলতা, এআই ব্যবসার ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সরকারের ব্যয়সংকোচন শেয়ারবাজারের ওপর চাপ ধরে রেখেছে।
চাঁদের অন্ধকার দিক নিয়েও একটি প্রচলিত ধারণা রয়েছে। বাস্তবে চাঁদের যে অংশকে অন্ধকার বলা হয়, সেখানেও মাসে প্রায় দুই সপ্তাহ সূর্যের আলো পড়ে। চীনের শেয়ারবাজারও সেই আলোর অপেক্ষায় রয়েছে। তবে সেই আলো স্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করবে প্রযুক্তিগত সাফল্যকে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির শক্তিতে রূপান্তর করার সক্ষমতার ওপর।
চীনের শেয়ারবাজারে দরপতন, এআই খাতের প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট—এই তিনটি বিষয়ই দেশটির অর্থনীতির সামনে এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।












