গাজীপুরে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের আন্দোলনে নতুন করে সড়কে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। বকেয়া বেতন পরিশোধ, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল এবং আন্দোলনকারীদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধের দাবিতে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) সকাল থেকে বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নাওজোর এলাকায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করায় ওই পথে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
সকালে শ্রমিকেরা চন্দ্রা-পল্লী বিদ্যুৎ মোড়সহ কয়েকটি স্থানে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। পরে আন্দোলনকারীরা নাওজোর এলাকায় গিয়ে মহাসড়কে অবস্থান নেন। এতে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহন আটকে যায়।
নাওজোরে যান চলাচল বন্ধ, জয়দেবপুর থেকে চাপ
মঙ্গলবার সকাল ৯টার দিকে নাওজোর এলাকায় শ্রমিকেরা সড়কে অবস্থান নেওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টে যায়। সেখানে দিগন্ত সোয়েটার কারখানার সামনে সড়কের পাশে জমে থাকা আবর্জনা ও বর্জ্য মহাসড়কে এনে তাতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। এতে জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে নাওজোর মোড় পর্যন্ত যান চলাচল ব্যাহত হয়। আন্দোলনকারীরা অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলসহ সব ধরনের যান চলাচলে বাধা দেন। বেলা ১১টা ১৮ মিনিটে প্রকাশিত মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে ওই অংশে যান চলাচল বন্ধ থাকার কথা জানানো হয়।
এর ফলে ঢাকা থেকে টাঙ্গাইল এবং টাঙ্গাইল থেকে ঢাকামুখী যাত্রীদের জন্য মহাসড়কের এই অংশে চলাচল অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তবে ঠিক কত কিলোমিটার যানজট তৈরি হয়েছে, কতক্ষণ ধরে যানবাহন আটকে ছিল কিংবা বিকল্প পথে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে মঙ্গলবার বেলা ১১টার পরের কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই পুরো ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক একই সময়ে সম্পূর্ণ বন্ধ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক ও সফিপুরেও উত্তেজনা
গাজীপুরের শ্রমিক অসন্তোষ শুধু নাওজোরে সীমাবদ্ধ নয়। কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক, সফিপুর ও কোনাবাড়ীসহ শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে গত কয়েক দিন ধরে বিক্ষোভ চলছে। মঙ্গলবার সকাল ৮টার কিছু আগে একদল শ্রমিক ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের সরিয়ে দেয়। পরে নাওজোরে নতুন করে অবরোধ শুরু হয়। ফলে একই সড়কের একাধিক স্থানে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনের আশঙ্কা তৈরি হয়।
আগের দিন সোমবার চন্দ্রা-পল্লী বিদ্যুৎ এলাকা থেকে শুরু করে মৌচাক ও সফিপুরের বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট তৈরি হয়েছিল। ওই দিন মহাসড়কের দুই পাশে অন্তত ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত যানবাহনের সারি তৈরি হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। মঙ্গলবারের পরিস্থিতি সোমবারের মতো একই মাত্রায় ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো পরবর্তী যানজটের পরিমাপ পাওয়া যায়নি। তবে নাওজোরে নতুন অবরোধের কারণে ওই সড়কে যাত্রার আগে সর্বশেষ পরিস্থিতি জেনে নেওয়া জরুরি।
ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও আশুলিয়ার সড়কে কী অবস্থা
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশাপাশি গাজীপুরের শিল্পাঞ্চল থেকে ঢাকামুখী যাতায়াতের জন্য ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কও গুরুত্বপূর্ণ। সোমবার শ্রমিকদের বিক্ষোভের সময় এই মহাসড়কেও যান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছিল বলে খবর পাওয়া যায়। তবে মঙ্গলবার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের সব অংশের অবস্থা নিশ্চিত করে এমন নির্ভরযোগ্য ও হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই সড়কটি পুরোপুরি বন্ধ কিংবা পুরোপুরি স্বাভাবিক—কোনোটিই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
অন্যদিকে, আশুলিয়ার বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কের বিভিন্ন স্থানে মঙ্গলবার সকাল ৯টার পর পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। সেখানে পুলিশ টিয়ার গ্যাসও ছোড়ে। ফলে আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলের ওই সড়কেও যাতায়াত বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবে পুরো সড়কে যান চলাচল বন্ধ ছিল কি না, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
১২ কারখানায় ছুটি, নিরাপত্তায় বিজিবি মোতায়েন
শ্রমিক আন্দোলনের মধ্যে গাজীপুরের ১২টি পোশাক কারখানায় মঙ্গলবার সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে শিল্প পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মহাসড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিজিবি, শিল্প পুলিশ ও স্থানীয় পুলিশ সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। মঙ্গলবার সকালেও গাজীপুরে বিজিবির ১১ প্লাটুন সদস্য মোতায়েন থাকার খবর পাওয়া যায়।
এর আগের দিন সোমবার গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় শ্রমিক বিক্ষোভের মধ্যে যানবাহন ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি থাকলেও সড়কের পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে স্বাভাবিক হয়েছে, তা বলা যাচ্ছে না। মঙ্গলবার সকালেই নাওজোরে নতুন করে অবরোধ হয়।
কেন আন্দোলন, কী চাইছেন শ্রমিকেরা
শ্রমিকদের প্রধান দাবি মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা। এর পাশাপাশি বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধ, ছাঁটাই হওয়া শ্রমিকদের কাজে পুনর্বহাল এবং আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্তি বন্ধের দাবিও রয়েছে। বর্তমানে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। এই ব্যবধান এবং বেতন-ভাতা নিয়ে অসন্তোষের জেরে গত দুই সপ্তাহ ধরে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় বিক্ষোভ চলছে।
সরকার পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পর্যালোচনার জন্য ছয় সদস্যের একটি মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিলেও আন্দোলন থামেনি। শ্রমিকদের দাবি নিষ্পত্তির পাশাপাশি উৎপাদন সচল রাখা এবং সড়কে জনদুর্ভোগ কমানো এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
যাত্রার আগে সড়কের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নিন
মঙ্গলবার বেলা ১১টা ১৮ মিনিট পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাওজোরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবরোধের কারণে যান চলাচল বন্ধ ছিল। জয়দেবপুর চৌরাস্তা থেকে নাওজোর অংশেও চলাচল ব্যাহত হচ্ছিল। আশুলিয়ার বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কে শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। তবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মঙ্গলবারের হালনাগাদ অবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে টাঙ্গাইল, উত্তরবঙ্গ ও গাজীপুরমুখী যাত্রীদের যাত্রা শুরুর আগে সড়কের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে নাওজোর, জয়দেবপুর চৌরাস্তা, চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ, মৌচাক ও সফিপুরের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে। প্রতিবেদনটি মঙ্গলবার বেলা ১১টা ১৮ মিনিট পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। পরবর্তী সময়ে সড়ক খুলেছে কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি।












