দুই দশকেরও বেশি আগে পাকিস্তান উচ্চশিক্ষাকে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলার এক উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ নিয়েছিল। লক্ষ্য ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে দেশকে একটি জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে পরিণত করা। ২০০২ সালে তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের হাতে উচ্চশিক্ষা কমিশন (এইচইসি) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।
শুরুর পরিকল্পনা ছিল ব্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বিলুপ্ত করে উচ্চশিক্ষা কমিশনকে দেওয়া হয় নিয়ন্ত্রণ, অর্থায়ন ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসন। উচ্চশিক্ষার কাঠামো পুনর্গঠন, গবেষণার পরিবেশ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয় নতুন সংস্থাটিকে।
পরবর্তী পাঁচ বছরে উচ্চশিক্ষার বাজেট বেড়েছিল প্রায় ৫ হাজার শতাংশ। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, বিদেশে পিএইচডি করার জন্য হাজার হাজার বৃত্তি, দেশীয় গবেষকদের জন্য সুযোগ এবং শিক্ষকদের আকৃষ্ট করতে প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো চালু করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ১৫ কোটি ডলারের ফুলব্রাইট বৃত্তি কর্মসূচিও ছিল এই উদ্যোগের বড় অংশ।
পাকিস্তানের এই সংস্কার আন্তর্জাতিক মহলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। দেশটির বিজ্ঞান ও গবেষণায় বিনিয়োগ দেখে ভারতের বিজ্ঞানবিষয়ক নীতিনির্ধারকেরাও প্রতিযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। একসময় মনে হয়েছিল, দক্ষিণ এশিয়ায় উচ্চশিক্ষার নতুন শক্তি হয়ে উঠতে যাচ্ছে পাকিস্তান।
কিন্তু সেই আশাবাদের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার ব্যবধান অনেক বড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার্থী বেড়েছে, গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যাও কয়েক গুণ হয়েছে। কিন্তু এসব সাফল্যের আড়ালে জমেছে আর্থিক সংকট, শিক্ষার মানের অবনতি, গবেষণায় অনিয়ম এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা।
পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা সংস্কারের ২৫ বছর পূর্তির প্রাক্কালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কত বেড়েছে, তা নয়; বরং এই বিপুল সম্প্রসারণ দেশকে কতটা জ্ঞান, দক্ষতা ও কার্যকর গবেষণা দিতে পেরেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে
উচ্চশিক্ষা খাতে পাকিস্তানের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাফল্য প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি। ২০০১-০২ শিক্ষাবর্ষে দেশটিতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল মাত্র ৫৮টি। ২০০৫-০৬ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৬টিতে। ২০১৭-১৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়ে যায়। ২০২৫-২৬ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, বর্তমানে পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ২৭৮টি। অর্থাৎ সংস্কার শুরুর সময়ের তুলনায় সংখ্যা বেড়েছে প্রায় চার গুণ।
শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্প্রসারণ ঘটেছে। ২০০১-০২ সালে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার্থী ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার। ২০২৩-২৪ সালে তা বেড়ে ২০ লাখ ছাড়িয়েছে। এই সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৬০০ শতাংশের বেশি।
নারীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পুরুষের হার ছিল ৬৩ শতাংশ, নারীর ৩৭ শতাংশ। ২০২৫ সালে এই ব্যবধান প্রায় ঘুচে এসেছে। তখন শিক্ষার্থীদের ৫২ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৮ শতাংশ নারী।
গবেষণায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রেও বড় পরিবর্তন এসেছে। পাকিস্তানের স্বাধীনতার প্রথম ৫৪ বছরে, অর্থাৎ ২০০২ সাল পর্যন্ত, দেশটিতে পিএইচডি ডিগ্রিধারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার। অথচ এখন এক বছরেই ৩ হাজারের বেশি পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে।
গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যাও দ্রুত বেড়েছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনার তালিকায় পাকিস্তানের অবস্থান ৫১ থেকে উঠে ২৬-এ পৌঁছেছে। এসসিআইমাগো তথ্যভান্ডারের হিসাবে, ২০০২ সালে পাকিস্তানের গবেষণাপত্রের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৬০০। ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে।
এ বছরের মার্চে দেশটির উচ্চশিক্ষা কমিশন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকলিত বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর তালিকায় থাকা এক হাজারের বেশি পাকিস্তানি গবেষককে সম্মাননা দিয়েছে।
সংখ্যার বিচারে এগুলো নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। অল্প সময়ের মধ্যে এত বিস্তৃত উচ্চশিক্ষা অবকাঠামো তৈরি করা অনেক দেশের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী ও গবেষণাপত্রের সংখ্যা বাড়লেই যে শিক্ষার মান বেড়েছে, তার নিশ্চয়তা নেই। পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে এই ব্যবধান।
সম্প্রসারণের ভারে নুয়ে পড়ছে বিশ্ববিদ্যালয়
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার গতি বজায় থাকলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান বাড়েনি। ফলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এখন নিয়মিত ব্যয় মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছে।
গত বছর খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশের প্রায় সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সংকট প্রকাশ্যে আসে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক সংগঠন পুরো খাতের জন্য ২৫ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি সহায়তা দাবি করে। তবে সমস্যাটি কোনো একটি প্রদেশে সীমাবদ্ধ নয়। দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোরও বাজেট ঘাটতি বাড়ছে। কোথাও বেতন দেওয়া হচ্ছে কিস্তিতে, কোথাও পেনশন আটকে আছে। আর্থিক দাবিতে শিক্ষক-কর্মচারীরা আন্দোলনে নামছেন, এমনকি আদালতেরও দ্বারস্থ হচ্ছেন।
ইসলামাবাদের কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি সংকটের গভীরতা বোঝায়। গত আগস্টে বিশ্ববিদ্যালয়টির জন্য কেন্দ্রীয় সরকার ২ বিলিয়ন রুপি সহায়তা অনুমোদন করে। ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের পেনশন তহবিল প্রায় নিঃশেষ হয়ে যায়। এমনকি গবেষণাগারের প্রয়োজনীয় রাসায়নিক দ্রব্য কেনার মতো মৌলিক খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন রুপিতে। বকেয়া পাওনা পরিশোধের দাবিতে সেখানে ধর্মঘটও হয়েছে। ফেডারেল উর্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন, পেনশন ও অন্যান্য দায়ের বকেয়া ১ দশমিক ২ বিলিয়ন রুপিতে পৌঁছেছে। দৈনন্দিন কার্যক্রম চালাতে প্রতিষ্ঠানটির আরও ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন রুপি প্রয়োজন।
সিন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রাদেশিক সরকারের অনুদান ধরা হয়েছে ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন রুপি। কেন্দ্রীয় সরকার ও উচ্চশিক্ষা কমিশন থেকে পাওয়ার কথা আরও ১ দশমিক ৭১৬ বিলিয়ন রুপি।
বেলুচিস্তানেও একই চিত্র। এ বছরের মার্চে প্রাদেশিক সরকার ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়কে ৮৫৭ মিলিয়ন রুপি সহায়তা দেয়। পরে প্রদেশটির গভর্নর জাফর খান মন্দোখাইল সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাজেট ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন থেকে বাড়িয়ে ৮ বিলিয়ন রুপি করার ঘোষণা দেন।
আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর বিশ্ববিদ্যালয় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন রুপির বেশি ঘাটতির কথা জানিয়েছে। পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাটতি ৩ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন রুপি। প্রতিষ্ঠানটি অভ্যন্তরীণভাবে ঋণ নিয়ে এই ঘাটতি সামাল দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো আর্থিক সমস্যা নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা একটি কাঠামোগত সংকটের লক্ষণ।
অর্থায়নে স্থবিরতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে
পাকিস্তানের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়মিত বরাদ্দ ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে বছরে ৬৫ বিলিয়ন রুপিতে আটকে আছে। অথচ ওই সময়ের তুলনায় বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা প্রায় ১০০টি বেশি। এর পাশাপাশি মুদ্রার অবমূল্যায়ন, মূল্যস্ফীতি, বেতন বৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয় বেড়েছে।
উচ্চশিক্ষা কমিশনের অভ্যন্তরীণ হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য প্রয়োজন ছিল ১৩৮ বিলিয়ন রুপি। সংস্থাটি অন্তত ১০০ বিলিয়ন রুপি চেয়েছিল। কিন্তু সেই চাহিদাও পূরণ হয়নি। প্রাদেশিক সরকারগুলোর অনুদানও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
দেশটির সামগ্রিক শিক্ষা খাতের অবস্থাও উদ্বেগজনক। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে ব্যয় নেমে এসেছে মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক ৮ শতাংশে। ইউনেসকোর সুপারিশ করা ৪ থেকে ৬ শতাংশের তুলনায় এটি অনেক কম।
এই অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা বোঝাতে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালন ব্যয় ছিল ৩ দশমিক ২৮ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার, পাকিস্তানি মুদ্রায় প্রায় ৬৩০ বিলিয়ন রুপি। অর্থাৎ অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক পরিচালন ব্যয় পাকিস্তানের সব সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দের প্রায় ১০ গুণ।
এটি শুধু অর্থের অঙ্কের তুলনা নয়। বরং উচ্চশিক্ষাকে রাষ্ট্র কতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তারও একটি প্রতিফলন।
একটি আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার ২০২৪ সালের এক গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল, পাকিস্তানের প্রায় ৮০ শতাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হতে পারে। গবেষণাটির প্রস্তুতকারী সংস্থার নাম প্রকাশ করা হয়নি। তবু এই পূর্বাভাস বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক দুর্বলতার ভয়াবহতা তুলে ধরে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কি রাজনৈতিক প্রকল্পে পরিণত হয়েছে?
পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগের পেছনে সব সময় শিক্ষার প্রয়োজন বা গবেষণার মান উন্নয়নের লক্ষ্য কাজ করেনি। অনেক ক্ষেত্রে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
ইতিহাসবিদ ইয়াকুব বাঙ্গাশের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রবণতা অনেকটা বড় বিপণিবিতান প্রতিষ্ঠানের নতুন শাখা খোলার মতো। কোথায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রয়োজন, সেখানে কী ধরনের বিভাগ থাকা উচিত কিংবা প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘমেয়াদে আর্থিকভাবে টিকে থাকতে পারবে কি না—এসব প্রশ্ন যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
খাইবার পাখতুনখোয়ায় অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় যখন আর্থিক সংকটে, তখনও প্রাদেশিক সরকার নতুন দুটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিল। এই সিদ্ধান্ত উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব প্রয়োজনের অসামঞ্জস্য তুলে ধরে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ, নিয়োগ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তৈরি হয়। ফলে কিছু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রের পরিবর্তে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রশাসনিক সুবিধা বণ্টনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরিচালনব্যবস্থাও দুর্বল। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টের এক আদেশে বলা হয়, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের আইন ও বিধি অনুসরণ করছে না। অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনুযায়ী।
সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অশিক্ষক কর্মচারীর সংখ্যাও প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। উচ্চশিক্ষা কমিশনের নির্ধারিত শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীর অনুপাতের সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতার বড় ব্যবধান রয়েছে। কমিশনের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষক ও প্রশাসনিক পদগুলোর প্রায় ৪০ শতাংশ শূন্য।
অর্থাৎ একদিকে অতিরিক্ত কর্মী ও অদক্ষ প্রশাসনিক কাঠামো, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল সংকট—দুই সমস্যাই একসঙ্গে চলছে।
ডিগ্রি আছে, কর্মক্ষেত্রের দক্ষতা নেই
উচ্চশিক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো শিক্ষার্থীদের জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরি করা, যাতে তারা কর্মক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই জায়গাতেই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা, ভর্তি ও গবেষণাপত্র প্রকাশের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা হলেও স্নাতকদের কর্মসংস্থান, পেশাগত অগ্রগতি এবং বাস্তব দক্ষতা নিয়ে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। ফলে শিক্ষার প্রকৃত ফলাফল মূল্যায়ন করা কঠিন।
তবে সাম্প্রতিক কয়েকটি পরীক্ষার ফলাফল এই সংকটের ইঙ্গিত দিয়েছে।
এ বছরের সেপ্টেম্বরে আমেরিকান বিজনেস ফোরাম ও লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের এক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী শাজা ফাতিমা খাজা কম্পিউটারবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের একটি জাতীয় মূল্যায়নের ফল প্রকাশ করেন। ১৯০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ৩৩ হাজার শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল।
কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় ১০টি দক্ষতা যাচাই করে দেখা যায়, মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী ৮০ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে। ৬৮ শতাংশের বেশি নম্বর পেয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ। অন্যদিকে ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থী ৫০ শতাংশ নম্বরও অর্জন করতে পারেনি।
এটি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ কম্পিউটারবিজ্ঞানের মতো কর্মসংস্থানমুখী বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না।
দেশটির কেন্দ্রীয় প্রতিযোগিতামূলক সরকারি চাকরির পরীক্ষা সিএসএসের ফলাফলও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। আগস্টে প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, ১৬ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থীর মধ্যে লিখিত পরীক্ষার সব ধাপ পেরিয়ে পরবর্তী পর্যায়ে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ৪৭৬ জন। উত্তীর্ণের হার ২ দশমিক ৭৪ শতাংশ।
সিএসএস পরীক্ষা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক হওয়ায় এই হার একাই শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা প্রমাণ করে না। তবে পরীক্ষকদের পর্যবেক্ষণে প্রার্থীদের শিক্ষাগত ভিত্তি, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, পাঠ অনুধাবন এবং লেখার দক্ষতার অবনতির বিষয় উঠে এসেছে।
২০২৩ সালে খাইবার পাখতুনখোয়া পাবলিক সার্ভিস কমিশনের একটি প্রতিবেদনেও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। সেখানে দেখা যায়, স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী অনেক প্রার্থী ক্যালকুলেটর ছাড়া সাধারণ গণিতের সমস্যাও সমাধান করতে পারছেন না। ভাষা ও সাহিত্যবিষয়ক পরীক্ষায় তাঁদের ব্যাকরণ, বাক্যগঠন ও উচ্চারণের মানও ছিল দুর্বল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উচ্চতর ডিগ্রিধারী প্রার্থীদের জ্ঞান অনেক ক্ষেত্রেই উপরিভাগে সীমাবদ্ধ। সাক্ষাৎকারের সময় তাঁদের আত্মবিশ্বাসেরও অভাব দেখা গেছে।
এই পরিস্থিতি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আনে: বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কি সত্যিকার অর্থে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান দিচ্ছে, নাকি কেবল সনদ দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে?
সরকার অবশ্য কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নিরীক্ষা ও জরুরি সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছেন। উচ্চশিক্ষা কমিশন স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষাক্রমে পেশাগত ইন্টার্নশিপ ও শিল্প খাতের উপযোগী সনদ অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী আহসান ইকবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি কর্মসূচি ও পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা করে শিল্প খাতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
কিন্তু বিচ্ছিন্ন নির্দেশনা দিয়ে এই সংকট কাটানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন শিক্ষার ভিত্তি, পাঠদানের মান, শিক্ষক নিয়োগ এবং মূল্যায়নব্যবস্থার সামগ্রিক পরিবর্তন।
গবেষণার বিস্তার, কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্ন
পাকিস্তানের গবেষণাপত্র প্রকাশের সংখ্যা দ্রুত বাড়লেও গবেষণার মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে এমন কিছু সাময়িকীতে গবেষণাপত্র প্রকাশের প্রবণতা বেড়েছে, যেগুলো অর্থের বিনিময়ে দ্রুত লেখা প্রকাশ করে এবং যথাযথ বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন বা পিয়ার রিভিউ অনুসরণ করে না।
এসব সাময়িকীকে সাধারণভাবে শিকারি সাময়িকী বলা হয়। এগুলোর ব্যবসায়িক মডেল হলো গবেষকদের কাছ থেকে প্রকাশনা ফি নিয়ে দ্রুত নিবন্ধ ছাপানো। গবেষণার মৌলিকত্ব, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা কিংবা পদ্ধতিগত মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অনেক সময় যথেষ্ট কঠোরতা থাকে না।
সমস্যাটি আরও গভীর হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পদোন্নতি ও মূল্যায়নব্যবস্থার কারণে। অনেক ক্ষেত্রে গবেষণার প্রকৃত মানের চেয়ে প্রকাশিত নিবন্ধের সংখ্যা বেশি গুরুত্ব পায়। ফলে গবেষকেরা বেশি নিবন্ধ প্রকাশের প্রতিযোগিতায় নামছেন, কিন্তু সেগুলোর মান নিশ্চিত করার প্রণোদনা কমে যাচ্ছে।
২০২৪ সালের একটি গবেষণায় পাকিস্তানের ৫০ জন অধ্যাপকের পাঁচ বছরের মধ্যে প্রকাশিত প্রায় ৫০০টি সমাজবিজ্ঞান ও মানবিকবিদ্যার গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, নমুনায় অন্তর্ভুক্ত প্রায় ৭০ শতাংশ গবেষণাপত্র এমন সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো উচ্চশিক্ষা কমিশনের অনলাইন স্বীকৃতি ব্যবস্থায় স্বীকৃত নয় এবং শিকারি প্রকাশনা হিসেবে চিহ্নিত।
একই বছরের আরেকটি গবেষণায় শরীরচর্চা ও ক্রীড়াবিজ্ঞানবিষয়ক গবেষণাপত্র পরীক্ষা করে দেখা যায়, প্রায় ৯০ শতাংশ নিবন্ধ সন্দেহজনক বা শিকারি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।
এই ফলাফল পুরো গবেষণা খাতের প্রতিনিধিত্ব করে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান প্রয়োজন। তবে এগুলো গবেষণার মান নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
গবেষণার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত নতুন জ্ঞান সৃষ্টি, বিদ্যমান ধারণা যাচাই এবং সমাজ ও অর্থনীতির সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করা। কিন্তু প্রকাশনার সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা যদি মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে গবেষণা ক্রমেই প্রাতিষ্ঠানিক পদোন্নতির আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।
আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে প্রকৃত চিত্র
বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ও গবেষণাপত্র প্রকাশের পরিসংখ্যান পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষার সাফল্যের ছবি তুলে ধরলেও আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে গবেষণার মানের দুর্বলতা স্পষ্ট।
টাইমস হায়ার এডুকেশনের চলতি বছরের বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে পাকিস্তানের ৫৬টি বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানই বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে জায়গা পায়নি। দেশটির সবচেয়ে ভালো অবস্থানে থাকা কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৫৫১ থেকে ৬০০-এর মধ্যে। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১ থেকে ১ হাজারের মধ্যে।
গবেষণার মানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া সাংহাই র্যাঙ্কিংয়েও পাকিস্তানের অবস্থান দুর্বল। এ বছর দেশটির মাত্র চারটি বিশ্ববিদ্যালয় এই মূল্যায়নে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে—কমস্যাটস বিশ্ববিদ্যালয়, ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজি, কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয় এবং পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়। চারটির অবস্থানই বিশ্বের ৮০১ থেকে ৯০০-এর মধ্যে।
গবেষণা ও উদ্ভাবনভিত্তিক এসসিআইমাগো র্যাঙ্কিংয়ে পাকিস্তানের সেরা প্রতিষ্ঠান কমস্যাটস বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান বিশ্বে ১ হাজার ৭১৫তম। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড টেকনোলজির অবস্থান ২ হাজার ১২৬তম। দেশটির অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে ৫ হাজারের পর।
এই ফলাফল দেখায়, গবেষণাপত্রের সংখ্যা বাড়লেও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা তৈরি করার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো অনেক পিছিয়ে।
গবেষণায় সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সংকট
শুধু গবেষণার মান নয়, গবেষণায় নৈতিকতা ও সততা নিয়েও পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা খাতে উদ্বেগ বাড়ছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জন আইওয়ানিডিসের নেতৃত্বে ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের হারের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে বিশ্বের উচ্চ অবস্থানে থাকা দেশগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রতি ১০ হাজার প্রকাশিত গবেষণাপত্রের মধ্যে পাকিস্তানে প্রত্যাহার করা হয়েছে ২৮ দশমিক ১টি। সৌদি আরবে এই হার ৩০ দশমিক ৬ এবং ভারতে ১৫ দশমিক ২।
কোনো গবেষণাপত্রের তথ্য বা সিদ্ধান্ত বিশ্বাসযোগ্য না থাকলে সেটি প্রকাশনা থেকে প্রত্যাহার করা হয়। কখনো অনিচ্ছাকৃত ভুলের কারণে এমনটি ঘটতে পারে। তবে জাল তথ্য, গবেষণায় প্রতারণা এবং অন্যের লেখা বা ধারণা চুরির ঘটনাও প্রত্যাহারের বড় কারণ।
আইওয়ানিডিস ও তাঁর সহকর্মীদের আরেকটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পাকিস্তানের শীর্ষ উদ্ধৃত গবেষকদের একটি অংশের প্রকাশিত নিবন্ধের মধ্যেও প্রত্যাহার করা গবেষণাপত্র রয়েছে। তালিকাভুক্ত পাকিস্তানি লেখকদের প্রায় ৩০ শতাংশের ক্ষেত্রে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
গবেষণার সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর জন্য আরও কিছু অনৈতিক পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অপ্রাসঙ্গিকভাবে নিজেদের গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি বাড়ানো, পারস্পরিক উদ্ধৃতির চুক্তি এবং গবেষণায় সরাসরি অবদান না রাখা ব্যক্তিদের লেখক হিসেবে যুক্ত করা।
এসব পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো গবেষকের প্রকাশনা ও উদ্ধৃতির সংখ্যা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক তালিকায় নিজেদের অবস্থান উন্নত করা।
পাকিস্তানের গবেষণা সংস্কৃতি নিয়ে ২০২৪ সালের একটি গবেষণায় এক শিক্ষাবিদের বক্তব্য উঠে এসেছে। তাঁর মতে, কিছু গবেষক নিজেদের কাজের উদ্ধৃতি বাড়াতে সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভর করেন। এর ফলে গবেষণার প্রকৃত মূল্যায়নের পরিবর্তে পারস্পরিক সুবিধা দেওয়ার একটি চক্র তৈরি হয়েছে।
অবশ্য পাকিস্তানে নিষ্ঠার সঙ্গে উচ্চমানের গবেষণা করছেন এমন গবেষকেরও অভাব নেই। তাঁদের অর্জনকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দুর্বল নজরদারি এবং অনিয়ম ঠেকানোর অনিচ্ছা গবেষণার সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
গবেষণার সততা যাচাইয়ের নতুন সূচকে সতর্কসংকেত
গবেষণায় অনিয়মের মাত্রা বোঝার জন্য সম্প্রতি গবেষণার সততা ঝুঁকি সূচক তৈরি করা হয়েছে। এতে গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের তথ্য এবং অস্বাভাবিক উদ্ধৃতির ধরন বিশ্লেষণ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়ন করা হয়।
চলতি বছরের এই সূচকে পাকিস্তানের ১৯টি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সবকটিই গুরুতর বা উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি, উচ্চ ঝুঁকি কিংবা পর্যবেক্ষণের তালিকায় রয়েছে। কেবল আগা খান বিশ্ববিদ্যালয়কে তুলনামূলক স্বাভাবিক অবস্থানে রাখা হয়েছে। কোনো পাকিস্তানি বিশ্ববিদ্যালয়ই গবেষণা প্রকাশনায় সততার মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণের জন্য সর্বনিম্ন ঝুঁকির শ্রেণিতে জায়গা পায়নি।
ভারত, মিসর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মরক্কোর মতো দেশে এই সূচক নিয়ে আলোচনা ও বিতর্ক হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানে বিষয়টি নিয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
এই নীরবতাও সমস্যার অংশ। আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে দুর্বলতা উঠে এলে তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে, পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু কোনো আলোচনা না হলে প্রয়োজনীয় সংশোধনের চাপও তৈরি হয় না।
সংস্কারের আগে প্রয়োজন বাস্তবতা স্বীকার
২০০২ সালে পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্য ছিল দেশকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করা। কিন্তু ২৫ বছরের কাছাকাছি সময়ে এসে সেই উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রে নিজের ভারেই নুয়ে পড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার্থী বেড়েছে, গবেষণাপত্রের পরিমাণ বেড়েছে; কিন্তু অর্থায়ন, প্রশাসন, শিক্ষার মান এবং গবেষণার সততায় প্রয়োজনীয় অগ্রগতি হয়নি।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, পাকিস্তান জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ার কথা বললেও জ্ঞান অর্জন ও জ্ঞান সৃষ্টির মৌলিক শর্তগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।
এই সংকটের কোনো তাৎক্ষণিক বা সহজ সমাধান নেই। নতুন কমিশন গঠন, বিদেশি পরামর্শক নিয়োগ কিংবা উন্নত দেশের কোনো শিক্ষাব্যবস্থা হুবহু অনুসরণ করলেই পরিবর্তন আসবে না। প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমানো, প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার মানকে মূল্যায়নের কেন্দ্রে নিয়ে আসা।
একই সঙ্গে গবেষণার ক্ষেত্রে প্রকাশনার সংখ্যার পরিবর্তে মৌলিকত্ব, পদ্ধতিগত নির্ভুলতা, সামাজিক গুরুত্ব ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। পদোন্নতি ও অর্থায়নের নীতিতেও এই পরিবর্তন আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে শিক্ষক ও গবেষকেরা রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা প্রশাসনিক সুবিধার বদলে মেধা ও কাজের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হন।
পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা খাতের সংকট নতুন নয়। বরং সংস্কারের সূচনালগ্নেই এর অনেক কারণ চিহ্নিত করা হয়েছিল।
২০০২ সালের উচ্চশিক্ষা সংস্কারবিষয়ক টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে অবকাঠামো, প্রশাসন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে গভীর সংশয়ের কথাও বলা হয়েছিল। প্রতিবেদনের শেষ দিকে ১৯৫৯ সালের জাতীয় শিক্ষা কমিশনের একটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়েছিল, শিক্ষা খাতের উন্নতির জন্য শুধু পেশাজীবী শিক্ষকদের মনোভাব পরিবর্তন করলেই চলবে না; সরকার ও সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে।
ওই কমিশনের বক্তব্য ছিল, শিক্ষা খাতকে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। স্বাধীন দেশের নীতিনির্ধারকেরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণের সুযোগ পেলেও শিক্ষাকে সেই গুরুত্ব দিতে পারেননি, যা একটি জাতির উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন।
প্রতিবেদনটি আরও সতর্ক করেছিল, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য সমাজে সততা, ব্যক্তিগত উদ্যোগ, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। কেবল সরকারি নির্দেশ বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে এই পরিবর্তন সম্ভব নয়।
ছয় দশকেরও বেশি সময় পরও পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা খাতের বাস্তবতায় সেই সতর্কবার্তা প্রাসঙ্গিক। শিক্ষা খাতের সমস্যাকে স্বীকার না করে কেবল নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করলে পুরোনো ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তিই ঘটবে।
বিশ্বব্যাংকের ২০০০ সালের উচ্চশিক্ষা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনের শুরুতে ব্রিটিশ লেখক ও ইতিহাসবিদ এইচ জি ওয়েলসের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা হয়েছিল: মানব ইতিহাস ক্রমেই শিক্ষা ও বিপর্যয়ের মধ্যে এক প্রতিযোগিতায় পরিণত হচ্ছে।
পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষার অভিজ্ঞতা সেই কথারই একটি উদাহরণ। শিক্ষা খাতে সংখ্যাগত সম্প্রসারণ ঘটেছে, কিন্তু জ্ঞান, দক্ষতা ও সততার ভিত্তি শক্তিশালী করা যায়নি। এখন দেশটির সামনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়—বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা অব্যাহত থাকবে, নাকি প্রকৃত অর্থে মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণা গড়ে তোলার কঠিন কাজ শুরু হবে।
বাংলাদেশের জন্যও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা কাঠামো অনুসরণ করে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা কমিশন গঠনের প্রস্তাব ও উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। ২০২৫ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি খসড়া অধ্যাদেশ প্রকাশ করে। ফলে পাকিস্তানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা হতে পারে।
একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী উচ্চশিক্ষা কমিশন প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু সেটি নিজে থেকেই মানসম্মত বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে পারে না। পর্যাপ্ত অর্থায়ন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন, দক্ষ শিক্ষক, গবেষণার সততা এবং শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা নিশ্চিত না হলে কমিশনও শেষ পর্যন্ত আরেকটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় পরিণত হতে পারে।
উচ্চশিক্ষার সাফল্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা কিংবা প্রকাশিত গবেষণাপত্রের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। এর প্রকৃত মূল্যায়ন হয় একটি দেশ কতটা দক্ষ, চিন্তাশীল ও দায়িত্বশীল নাগরিক তৈরি করতে পারছে এবং নতুন জ্ঞান সৃষ্টির মাধ্যমে নিজের অর্থনীতি ও সমাজকে কতটা এগিয়ে নিতে পারছে, তার ভিত্তিতে।
পাকিস্তানের ২৫ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, এই মৌলিক সত্য উপেক্ষা করে উচ্চশিক্ষার বিশাল অবকাঠামো গড়ে তোলা যায়, কিন্তু জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি তৈরি করা যায় না।












