কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার তাগিদে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না—এমন অভিযোগ ও উদ্বেগ বছরের পর বছর ধরে জানিয়ে আসছিলেন OpenAI-এর কর্মীরা। প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নেতৃত্ব ও পরিচালনা পর্ষদকেও এসব বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে কর্মীদের একাংশের ধারণা ছিল, নিরাপত্তা জোরদার করার চেয়ে Google ও Anthropic-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রযুক্তির উন্নয়ন করাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ব্যবস্থাপনা।
বার্তা সংস্থা Reuters-এর এক প্রতিবেদনে পাঁচজন সাবেক ও বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তির বরাতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
২০২২ সালের শেষ দিকে ChatGPT চালুর আগেই OpenAI-এর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। কর্মীদের আশঙ্কা ছিল, প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ও গবেষণাসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য যথাযথ সুরক্ষায় নেই। এমনকি বিদেশি সরকার বা অন্য কোনো পক্ষ তুলনামূলক সহজেই এসব তথ্যের নাগাল পেতে পারে।
গত অক্টোবরে প্রতিষ্ঠানের একজন নির্বাহীর সম্মেলনকক্ষে গোপনে অডিও রেকর্ড করার যন্ত্র বসানোর ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সাবেক অনেক কর্মী বিস্মিত হননি। তাঁদের মতে, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল।
নিরাপত্তা জোরদারে নতুন উদ্যোগ
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে সমালোচনার পর OpenAI কৌশল পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পণ্য উন্নয়ন বিভাগের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী থিবো সোতসিও সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিব্যবস্থার নিরাপত্তা জোরদারের দায়িত্ব পেয়েছেন।
চলতি বছরের আগস্টে তিনি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রমে নিয়োজিত প্রকৌশলীদের প্রায় এক-চতুর্থাংশকে নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নের কাজে পুনর্বিন্যাস করেন। প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
OpenAI-এর মুখপাত্র এলানা উইডম্যান বলেছেন, প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সাইবার হামলার লক্ষ্যবস্তু হওয়া সংস্থাগুলোর একটি। অভ্যন্তরীণ কর্মী, সাইবার অপরাধী এবং বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের হুমকি মোকাবিলায় তারা নিরাপত্তা কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করছে।
তাঁর ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি, তথ্য ও কর্মীদের সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো ঝুঁকি শনাক্ত ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতারই প্রমাণ। প্রযুক্তি ও হুমকির ধরন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তাব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করা হবে।
এক জায়গায় কোড রাখার ঝুঁকি
OpenAI-এর নিরাপত্তা নিয়ে কর্মীদের অন্যতম উদ্বেগ ছিল প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ কোড ও গবেষণাসংক্রান্ত তথ্যের সহজলভ্যতা।
প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কোড একটি কেন্দ্রীয় সংগ্রহস্থলে রাখা হতো, প্রযুক্তি খাতে যাকে বলা হয় ‘মনোরেপো’। ফলে কোডে প্রবেশাধিকার থাকা কর্মীরা নিজেদের কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, এমন অনেক প্রকল্পের প্রযুক্তিগত বিবরণও দেখতে পারতেন।
কর্মীদের আশঙ্কা ছিল, এতে সংবেদনশীল গবেষণার তথ্য অননুমোদিত ব্যক্তিদের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। আগে বিপুল ও জটিল কোডের ভান্ডার থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করা কঠিন ছিল। কিন্তু এখন উন্নত AI এজেন্ট অল্প সময়েই বিপুল পরিমাণ কোড বিশ্লেষণ করতে পারে। ফলে আগের তুলনায় তথ্য চুরির ঝুঁকি বেড়েছে।
GitHub ও Slack-এর মতো প্ল্যাটফর্মেও একসময় প্রতিষ্ঠানের গবেষণাসংক্রান্ত অনেক নথি রাখা হতো। এতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কেউ এসব প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে পারলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য খুঁজে পাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
তবে OpenAI জানিয়েছে, তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল কাজের বড় অংশ আলাদা কোড সংগ্রহস্থলে রাখা হয়, যেখানে প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। মনোরেপোতে প্রতিষ্ঠানের সব কোড কিংবা মডেল পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও নেই। বিশেষ করে মডেলের আচরণ নির্ধারণকারী সংখ্যাগত উপাদান, অর্থাৎ মডেল ওয়েটস, সেখানে সংরক্ষিত নয়।
আরেকটি সমস্যা ছিল অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি ব্যবহারের নিরাপত্তা পর্যালোচনা। গবেষকেরা নতুন মডেল পরীক্ষা করার জন্য যেসব স্যান্ডবক্স ব্যবহার করেন, সেগুলোর নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষা সব সময় করা হতো না বলে তিনজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানিয়েছেন।
কর্মীরা নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এসব ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতেন। কিন্তু পরিবর্তিত ব্যবস্থাগুলোতে নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি আছে কি না, তা সব সময় পরীক্ষা করা হতো না। ফলে বাইরের পক্ষের হামলার সুযোগ তৈরি হতে পারত।
OpenAI জানিয়েছে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে দায়িত্ব নেওয়া প্রধান তথ্যনিরাপত্তা কর্মকর্তা ডেন স্টাকির নেতৃত্বে এখন অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি সরঞ্জামের নিয়মিত নিরাপত্তা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সৌদি যোগসূত্র ও গোপন রেকর্ডিংয়ের ঘটনা
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের একটি বড় উদাহরণ সামনে আসে গত ১৩ অক্টোবর। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানায়, একজন সৌদি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের নির্বাহীদের সম্মেলনকক্ষে টিস্যু পেপারের মধ্যে লুকিয়ে অডিও রেকর্ডিংয়ের যন্ত্র স্থাপনের অভিযোগ আনা হয়।
অভিযুক্ত আবদুর রহমান আলফোজান (৩৫) ওই সময় OpenAI-এর প্রকৌশলী ছিলেন।
আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য তৈরি একটি AI টুল ব্যবহার করে সৌদি আরব সফরকারী নির্বাহীদের বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নথি খুঁজেছিলেন। সৌদি মন্ত্রীদের সঙ্গে বৈঠকে OpenAI-এর কোন কর্মকর্তারা অংশ নিতে পারেন, সে তথ্যও অনুসন্ধান করেছিলেন।
আলফোজান সৌদি রাজপরিবারের একজন সদস্যের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। ওই ব্যক্তি সৌদি আরবে নতুন একটি AI উদ্যোগের জন্য তাঁকে নিয়োগের চেষ্টা করেছিলেন বলে আদালতের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
AI প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেরাই সাইবার হামলার ঝুঁকিতে
শুধু OpenAI নয়, অন্যান্য AI প্রতিষ্ঠানও নিরাপত্তা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত Google-এর সাবেক এক প্রকৌশলীকে চীনের পক্ষে AI প্রযুক্তির গোপন তথ্য চুরির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। ওই ব্যক্তি Google-এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তিসংক্রান্ত হাজার হাজার পৃষ্ঠার গোপন নথি চুরি করেছিলেন।
অক্টোবরের শেষ দিকে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান Cathedral Systems দাবি করে, তারা Anthropic-এর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় প্রবেশ করে কর্মীদের Slack চ্যানেলের কিছু তথ্য পেয়েছে। Anthropic জানিয়েছে, এতে গ্রাহক ও অংশীদারদের কিছু ব্যবসায়িক যোগাযোগের তথ্য এবং সাধারণ ব্যবহারকারী হিসাবের কিছু নথি ছিল।
এদিকে চলতি বছরের জুলাইয়ে OpenAI-এর পরীক্ষাধীন AI এজেন্ট Hugging Face নামের আরেকটি AI প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছিল। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের নজরে আসে।
একই মাসে সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান Hacktron AI জানায়, তাদের তিন গবেষক Anthropic-এর একটি প্রতিদ্বন্দ্বী AI মডেল ব্যবহার করে OpenAI-এর একাধিক কর্মীর ChatGPT অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছিলেন। এর মাধ্যমে তাঁরা OpenAI-এর অভ্যন্তরীণ কিছু ব্যবস্থাসহ মনোরেপোতেও প্রবেশের সুযোগ পান।
ঘটনাটি দেখিয়েছে, উন্নত AI প্রযুক্তি শুধু সাইবার নিরাপত্তা জোরদারের হাতিয়ার নয়, বরং সাইবার হামলার সক্ষমতাও বাড়িয়ে তুলতে পারে।
গবেষণার উন্মুক্ত পরিবেশ বনাম নিরাপত্তা
AI গবেষণার সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরেই উন্মুক্ত তথ্য বিনিময়ের সংস্কৃতি জড়িত। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞানীরা সাধারণত নিজেদের কাজ, গবেষণার ফলাফল ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। OpenAI ও Anthropic-ও গবেষকদের আকৃষ্ট করতে এবং নতুন উদ্ভাবন উৎসাহিত করতে এই সংস্কৃতি ধরে রেখেছে।
তবে AI প্রযুক্তির সক্ষমতা যত বাড়ছে, ততই এই উন্মুক্ত পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে কর্মীদের মধ্যে।
২০২৩ সালে OpenAI-এর তৎকালীন গবেষক লিওপোল্ড আশেনব্রেনার ‘OpenAI is China’s leading AI lab’ শিরোনামে একটি অভ্যন্তরীণ স্মারকলিপি লিখেছিলেন। এতে চীনের পক্ষ থেকে প্রতিষ্ঠানটিতে অনুপ্রবেশ এবং প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের আশঙ্কা তুলে ধরা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন।
ওই বছরই এক বহিরাগত ব্যক্তি OpenAI-এর অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করে GPT-4 মডেল সম্পর্কে কিছু তথ্য চুরি করেন। এরপর আশেনব্রেনার তাঁর স্মারকলিপিটি পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে ভাগ করে নেন। তবে OpenAI-এর দাবি, ওই হামলাকারী শুধু প্রতিষ্ঠানের সবার জন্য উন্মুক্ত Slack চ্যানেলেই প্রবেশ করতে পেরেছিলেন।
প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় দ্রুত এগিয়ে যাওয়ার চাপ নিরাপত্তা বিনিয়োগকে জটিল করে তুলছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে AI এখন কৌশলগত সম্পদ, অন্যদিকে নিরাপত্তা জোরদারে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ও প্রযুক্তি উন্নয়নের গতি কমিয়ে দিতে পারে।
এ ছাড়া OpenAI ও Anthropic-এর সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে প্রবেশের পরিকল্পনাও রয়েছে। নিরাপত্তা অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণ এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
OpenAI-এর সাবেক গবেষক উইল ডিপু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম X-এ লিখেছেন, বর্তমান প্রতিযোগিতার পরিস্থিতিতে AI খাতের নেতারা নিরাপত্তার জন্য প্রযুক্তি উন্নয়নের গতি কমাতে চান না। তাঁর মতে, দ্রুত এগিয়ে যাওয়াকেই তাঁরা নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
Reuters-এর প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাওয়ার পর OpenAI সোমবার একটি ব্লগ পোস্টে জানায়, নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে তারা নতুন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কর্মসূচি শুরু করার পরিকল্পনা করছে।












