ভারতের ধনকুবের মুকেশ আম্বানির মালিকানাধীন টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান জিও প্ল্যাটফর্মস যুক্তরাষ্ট্রের দুই বড় ব্রডব্যান্ড কোম্পানি কমকাস্ট ও চার্টার কমিউনিকেশনসের সঙ্গে নতুন ধরনের ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা করছে। নিজস্ব ওয়্যারলেস ব্রডব্যান্ড প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে প্রতিষ্ঠান দুটির মালিকানায় অংশীদারত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে জিও।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছে।
আলোচনার আওতায় থাকা প্রতিষ্ঠান দুটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের কমকাস্ট ও চার্টার কমিউনিকেশনস। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকার টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান এমটিএন গ্রুপের সঙ্গেও আলোচনা করেছিল জিও। তবে মূল্যায়ন এবং প্রযুক্তি ব্যবহারের লাইসেন্সসংক্রান্ত কয়েকটি বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হতে না পারায় সেই আলোচনা ভেস্তে যায়।
কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেই চুক্তি চূড়ান্ত করার নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। এ বিষয়ে জিও রয়টার্সের প্রশ্নের জবাব দেয়নি। কমকাস্ট ও চার্টারের মুখপাত্ররাও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
গত সপ্তাহে ভারতের মুম্বাই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে জিও প্ল্যাটফর্মস। প্রতিষ্ঠানটির প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিও থেকে ৩২০ কোটি ডলার সংগ্রহ করা হয়, যা ভারতের ইতিহাসে রেকর্ড গড়া আইপিওগুলোর একটি।
আম্বানির রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের নিয়ন্ত্রণাধীন জিও কয়েক মাস ধরেই নিজস্ব ব্রডব্যান্ড প্রযুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের প্রযুক্তি বিশ্বে প্রথম।
কীভাবে কাজ করে জিওর প্রযুক্তি
জিওর প্রযুক্তির নাম আনলাইসেন্সড ব্যান্ড রেডিও বা ইউবিআর। প্রচলিত কেবল সংযোগ ছাড়াই এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বাড়ি ও ভবনে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
এ ব্যবস্থায় বিনা লাইসেন্সের ওয়াই-ফাই ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করা হয়। কাছাকাছি টাওয়ার কিংবা ভবনের ছাদে স্থাপিত ট্রান্সমিটার থেকে সংকেত পাঠানো হয়। ভবনে স্থাপিত রিসিভারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেট সংযোগ পান।
প্রচলিত কেবল নেটওয়ার্ক কিংবা মোবাইলভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যবস্থার তুলনায় এতে খরচ কম হতে পারে। বিশেষ করে টেলিযোগাযোগ খাতে স্পেকট্রাম ব্যবহারের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। ইউবিআর প্রযুক্তিতে সেই ব্যয় এড়ানো সম্ভব।
হংকংভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্টারপয়েন্ট রিসার্চের পরিচালক নীল শাহ বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতে স্পেকট্রাম সীমিত ও ব্যয়বহুল সম্পদ। ইউবিআর কমকাস্ট ও চার্টারের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে। কারণ, তারা নিজেদের স্পেকট্রাম না কিনেও মোবাইল নেটওয়ার্কের মতো মানসম্পন্ন ব্রডব্যান্ড সেবা দিতে পারবে।
জিও গত সপ্তাহে জানিয়েছে, তাদের এই প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম আন্তর্জাতিকভাবে ১০ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নতুন সম্ভাবনা
যুক্তরাষ্ট্রে বাসাবাড়ির ব্রডব্যান্ড বাজার এখন টেলিযোগাযোগ অপারেটর ও কেবল কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। ফাইবার ও ফিক্সড ওয়্যারলেস প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহক আকর্ষণের চেষ্টা করছে টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলো। এতে কেবল কোম্পানিগুলোর গ্রাহক হারানোর ঝুঁকি বাড়ছে।
গত মাসে কমকাস্টের সহপ্রধান নির্বাহী মাইক কাভানাহ কোম্পানির আয়সংক্রান্ত এক আলোচনায় বলেন, ফিক্সড ওয়্যারলেস প্রযুক্তি আগ্রাসীভাবে বাজারের অংশীদারত্ব বাড়াচ্ছে। স্যাটেলাইট সেবাদাতারাও ভবিষ্যতে ব্রডব্যান্ড গ্রাহক আকর্ষণ করতে পারে।
তবে কেবল নেটওয়ার্কের অবস্থান এখনো শক্তিশালী। এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল মার্কেট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রের আবাসিক ব্রডব্যান্ড সংযোগের ৬২ শতাংশ ছিল কেবল কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ কমকাস্টের আবাসিক ব্রডব্যান্ড গ্রাহক ছিল প্রায় ২ কোটি ৮৩ লাখ। অন্যদিকে জুন মাসে চার্টারের ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা ছিল প্রায় ২ কোটি ৯৪ লাখ। তবে উভয় প্রতিষ্ঠানই ফিক্সড ওয়্যারলেস ও ফাইবারভিত্তিক সেবার কাছে গ্রাহক হারাচ্ছে।
জিওর প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে কমকাস্ট ও চার্টারের পক্ষে তুলনামূলক কম খরচে ব্রডব্যান্ড সেবা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বিদেশে নেটওয়ার্ক নয়, প্রযুক্তি বিক্রিতে জোর
ভারতের সবচেয়ে বড় টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান জিওর গ্রাহকসংখ্যা ৫০ কোটির বেশি। একক দেশের গ্রাহকসংখ্যার হিসাবে চীনের চায়না মোবাইলের পর বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া জিওর তারযুক্ত ব্রডব্যান্ড গ্রাহক প্রায় দেড় কোটি। রিলায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, ইউবিআর প্রযুক্তিনির্ভর গ্রাহকসংখ্যা ইতিমধ্যে ৬৫ লাখ ছাড়িয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক সম্প্রসারণ কার্যক্রমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডয়েচে ব্যাংকের প্রযুক্তি, গণমাধ্যম ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ড্যান বেইলি এবং জিওর দীর্ঘদিনের জ্যেষ্ঠ নির্বাহী ম্যাথিউ ওমেন।
বিদেশে নিজস্ব নেটওয়ার্ক স্থাপন করে ব্যবসা গড়ে তোলার পরিবর্তে স্থানীয় অপারেটরদের কাছে প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে চায় জিও।
শুক্রবার বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক আলোচনায় জিওর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আকাশ আম্বানি বলেন, উন্নত ও উন্নয়নশীল—উভয় ধরনের বাজারেই ইউবিআর প্রযুক্তি নিয়ে যেতে চায় প্রতিষ্ঠানটি। তবে আন্তর্জাতিক বাজার নির্বাচনের ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত সতর্ক থাকবে।
তিনি বলেন, বিদেশে জিও প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান হিসেবেই ব্যবসা করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি জানান, দেশটির ফিক্সড ওয়্যারলেস নেটওয়ার্কে ফাইভজি সক্ষমতার ৬৫ শতাংশ মাত্র ৩ শতাংশ গ্রাহক ব্যবহার করে ফেলছেন। এ ধরনের বাজারেই জিওর প্রযুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে।
রিলায়েন্সের এক সূত্রের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটি ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কোম্পানির সঙ্গেই আলোচনা চালাচ্ছে। তবে কমকাস্ট, চার্টার কিংবা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শেষ পর্যন্ত চুক্তি হবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।












