ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা জিএসপি+ (জেনারালাইজড স্কিম অব প্রেফারেন্সেস প্লাস) থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের বাজারে পাকিস্তানের রপ্তানি কমেছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ইউরোপের দেশগুলোতে পাকিস্তানের পণ্য রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে। এ সময়ে রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৩৫ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৩৯ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
রপ্তানি কমে যাওয়ায় পাকিস্তানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইউরোপের বড় বাজারগুলোতে চাহিদা কমে যাওয়া এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর বাড়তি সুবিধা পাকিস্তানের রপ্তানি খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত পরিস্থিতি এই পতন আরও বাড়াতে পারে। সংঘাতের কারণে জ্বালানির দাম বাড়লে ইউরোপের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়বে। এতে ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গিয়ে আমদানি পণ্যের চাহিদায় প্রভাব পড়তে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবেও ইউরোপের বাজার আগে থেকেই চাপে রয়েছে।
এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে ভারতের জন্য বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা পাকিস্তানের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতে ভারত পাকিস্তানের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী।
পশ্চিম ইউরোপে সবচেয়ে বেশি পতন
পাকিস্তানের ইউরোপমুখী রপ্তানির সবচেয়ে বড় অংশ যায় পশ্চিম ইউরোপে। জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স, ইতালি ও বেলজিয়ামের মতো দেশগুলো এই অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বাজার। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে পশ্চিম ইউরোপে পাকিস্তানের রপ্তানি ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ কমে ১০৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে নেমেছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১১৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
জার্মানিতে রপ্তানি কমেছে ১২ দশমিক ৭৭ শতাংশ। দেশটিতে পাকিস্তানের রপ্তানি আয় ৪৪ কোটি ৬১ লাখ ডলার থেকে কমে ৩৮ কোটি ৯১ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
নেদারল্যান্ডসে রপ্তানি কমেছে ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ। পাকিস্তানের পণ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম ইউরোপীয় বাজারটিতে রপ্তানি আয় ৩৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার থেকে কমে ৩৭ কোটি ডলারে নেমেছে।
ফ্রান্সে রপ্তানি ০ দশমিক ৪৭ শতাংশ এবং বেলজিয়ামে ৭ দশমিক ৫৭ শতাংশ কমেছে।
দক্ষিণ ও উত্তর ইউরোপে কিছুটা প্রবৃদ্ধি
পশ্চিম ইউরোপে পতনের বিপরীতে দক্ষিণ ইউরোপে পাকিস্তানের রপ্তানি ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ বেড়ে ৮৭ কোটি ৯৯ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। এ অঞ্চলে স্পেনে রপ্তানি ১৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ বেড়ে ৪৫ কোটি ১২ লাখ ডলার হয়েছে। তবে ইতালিতে রপ্তানি ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ কমে ২৯ কোটি ৮৭ লাখ ডলারে নেমেছে। গ্রিসে রপ্তানি বেড়েছে ৩ দশমিক ৫২ শতাংশ।
উত্তর ইউরোপে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল আরও বেশি। এ অঞ্চলে পাকিস্তানের রপ্তানি ২১ দশমিক ০৭ শতাংশ বেড়ে ২৩ কোটি ৬৩ লাখ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তবে পূর্ব ইউরোপে পরিস্থিতি ছিল উল্টো। সেখানে পাকিস্তানের রপ্তানি ১৫ দশমিক ০৫ শতাংশ কমে ১৬ কোটি ৮৮ লাখ ডলারে নেমেছে।
যুক্তরাজ্যের বাজারে রপ্তানি বেড়েছে
ব্রেক্সিটের আগে যুক্তরাজ্য ছিল পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রপ্তানি গন্তব্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যুক্তরাজ্য বেরিয়ে যাওয়ার পরও দেশটির বাজারে পাকিস্তানের রপ্তানি বেড়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি ৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ বেড়ে ৬১ কোটি ২৩ লাখ ডলারে পৌঁছেছে। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৫৭ কোটি ৪২ লাখ ডলার।
ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে রপ্তানির এই ভিন্ন চিত্র পাকিস্তানের জন্য নতুন করে বাজার কৌশল নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে। জিএসপি+ সুবিধা থাকা সত্ত্বেও প্রধান বাজারগুলোতে রপ্তানি কমে যাওয়ায় দেশটির রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।












