যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায় অস্থির হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় অঞ্চল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানের বিরুদ্ধে আবার সামরিক অভিযান শুরু করতে পারেন—এমন আশঙ্কা করছেন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা। তবে এবার সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলো নতুন করে সংঘাত চায় না। এমনকি ইরানের বিষয়ে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত সংযুক্ত আরব আমিরাতও ট্রাম্পকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাচ্ছে।
গত সপ্তাহে বাহরাইনের রাজধানী মানামায় অনুষ্ঠিত বার্ষিক মানামা সংলাপে উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের আলোচনায় প্রাধান্য পেয়েছে যুদ্ধের এই আশঙ্কা। তাঁদের প্রধান প্রশ্ন ছিল, ট্রাম্প সত্যিই ইরানের বিরুদ্ধে আবার যুদ্ধ শুরু করবেন কি না এবং করলে কখন করবেন। অন্যদিকে ইরান আগে হামলা চালাতে পারে কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ ছিল।
তবে সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। ট্রাম্প প্রশাসন মধ্যম পর্যায়ের মাত্র দুজন কর্মকর্তাকে পাঠায়। তাঁদের কাছ থেকে পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট আশ্বাস পাওয়া যায়নি। উপসাগরীয় কয়েকজন কর্মকর্তা বিষয়টিকে তাঁদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবহেলা হিসেবে দেখছেন।
এবার যুদ্ধ চায় না উপসাগরীয় দেশগুলো
আগের তুলনায় এবার উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থানে বড় পরিবর্তন এসেছে। ফেব্রুয়ারিতে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের বিষয়ে কয়েকটি দেশ দ্বিধাবিভক্ত থাকলেও এবার তারা প্রায় সবাই নতুন সংঘাত এড়াতে চায়।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, তাঁর দেশ মনে করে না যে সামরিক সমাধান কার্যকর হতে পারে। ইরানের প্রতি তুলনামূলক কঠোর অবস্থান নেওয়া আমিরাতের এমন বক্তব্য পরিস্থিতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
প্রকাশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনা করতে সতর্ক থাকলেও আড়ালে উপসাগরীয় দেশগুলোর কূটনীতিকেরা একটি সমঝোতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। কাতারের প্রতিনিধিরা তেহরানে যাতায়াত করে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার পথ খুঁজছেন। কিন্তু সমঝোতার পথে দুটি বড় বাধা রয়ে গেছে।
পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে অনড় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান
প্রথম বাধা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি। ট্রাম্প প্রশাসন নতুন কোনো চুক্তিতে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে অন্তত কিছু ছাড় অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে। কিন্তু তেহরান এ বিষয়ে আলোচনাতেই রাজি নয়।
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রাজনৈতিক ধাক্কাকে কেন্দ্র করে ইরানও আত্মবিশ্বাসী অবস্থান নিয়েছে। ফলে আলোচনায় সমঝোতার জায়গা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
দ্বিতীয় বাধা হলো চুক্তি বাস্তবায়নের ক্রম। জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু অস্পষ্ট শর্তের কারণে কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেটি ভেঙে পড়ে। এবার দুই পক্ষই চায়, প্রতিপক্ষ আগে পদক্ষেপ নিক।
ইরানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে নৌ অবরোধ তুলে নিতে হবে এবং বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। এরপর তেহরান হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেবে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের আশঙ্কা, অবরোধ প্রত্যাহারের সুযোগ পেলে ইরান মজুত করা বিপুল পরিমাণ তেল দ্রুত রপ্তানি করে অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা কমিয়ে নিতে পারে। কিন্তু বিনিময়ে প্রতিশ্রুত পদক্ষেপ বাস্তবায়ন না-ও করতে পারে।
কবে আবার সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে
মানামা সংলাপে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের সময় নিয়ে মতভেদ ছিল। কয়েকজনের ধারণা, আলোচনা ব্যর্থ হলেও ট্রাম্প কয়েক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্র এখনো ওই অঞ্চলে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি আগামী ১০ নভেম্বর আবুধাবিতে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে আলোচনার আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এমন সময়ে আবুধাবিকে সম্ভাব্য হামলার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে—এমন নতুন যুদ্ধ শুরু করার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর স্থানীয় নাগরিক ও সেখানে বসবাসরত বিদেশিরা নতুন করে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। গত এপ্রিলের পর অঞ্চলটিতে এতটা উত্তেজনা আর দেখা যায়নি। সে সময় ট্রাম্প ইরানের সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন।
সম্ভাব্য যুদ্ধের আশঙ্কায় উপসাগরীয় অঞ্চলের কিছু বাসিন্দা খাবার, পানি ও নগদ অর্থ মজুত করছেন। আন্তর্জাতিক কৌশলগত গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশেষজ্ঞ লায়েথ আলজালুনি বলেছেন, যুদ্ধ শুরু হলে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে তাঁরা কেন সেখানে থাকবেন।
যুদ্ধের ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতাও কমেছে
নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা ও অর্থনীতি—দুই ক্ষেত্রেই বড় চাপ তৈরি হতে পারে। আগের সংঘাতে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় এবার নিজেদের আকাশসীমা সুরক্ষিত রাখা তাদের জন্য কঠিন হতে পারে।
অর্থনৈতিকভাবেও দেশগুলো আগের তুলনায় দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। সৌদি আরব ২০২৬ সালে মোট দেশজ উৎপাদনের ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বাজেট ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু জুলাইয়ের মধ্যেই সেই ঘাটতি পূর্ণ হয়ে যায়। এখন তা ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপসাগরীয় ছয়টি অর্থনীতির মধ্যে পাঁচটিই চলতি বছর সংকুচিত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি দেশের অর্থনীতিতে সংকোচন দুই অঙ্কে পৌঁছাতে পারে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিতে ৯ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। তবে এই পুনরুদ্ধার নির্ভর করছে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির ওপর। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে সেই সম্ভাবনা বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়বে।
পিছিয়ে যাচ্ছে বড় আয়োজন
যুদ্ধের আশঙ্কা ইতিমধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলের বড় আয়োজনগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। সৌদি আরবে আগামী জানুয়ারিতে এশিয়ান কাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি পিছিয়ে ২০২৭ সালের ডিসেম্বরে নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ সংঘাত এখনো শুরু না হলেও তার সম্ভাব্য প্রভাব বিনিয়োগ, পর্যটন, আন্তর্জাতিক আয়োজন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়তে শুরু করেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো কূটনৈতিকভাবে যুদ্ধ ঠেকানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সংঘাতের সিদ্ধান্ত যদি ওয়াশিংটন ও তেহরানের হাতে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে নিজেদের আপত্তি সত্ত্বেও যুদ্ধের পরিণতি তাদেরই বহন করতে হতে পারে।












