ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার নাটকীয় জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন ৪২ বছর বয়সী সংসদ সদস্য আন্দ্রে জানোনেস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমকে কাজে লাগিয়ে লাখ লাখ মানুষকে একযোগে সক্রিয় করার কৌশলে তিনি এখন ব্রাজিলের বামপন্থীদের কাছে প্রায় নায়কে পরিণত হয়েছেন। তাঁর এই ডিজিটাল প্রচারকৌশল নজর কেড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বামপন্থী নেতাদেরও।
গত ২৫ অক্টোবর পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর সাও পাওলোর রাস্তায় সমর্থকদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে লুলা জানোনেসকে নিজের নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। তাঁকে ‘আমাদের সেনাপতি’ বলে উল্লেখ করেন ব্রাজিলের বামপন্থী এই নেতা।
জানোনেস একটি ছোট পরিবেশবাদী দলের সংসদ সদস্য। তবে নির্বাচনী প্রচারে তাঁর ভূমিকা ছিল অনেক বড়। লুলার পক্ষে হোয়াটসঅ্যাপে ‘লুলার আর্মি’ নামে একটি প্রচারমাধ্যম গড়ে তোলেন তিনি। দ্বিতীয় দফার ভোটের আগের তিন সপ্তাহে এই মাধ্যমে অনুসারীর সংখ্যা এক কোটির বেশি হয়ে যায়।
এই সাফল্যের কারণে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউমের মতো নেতারাও তাঁর কৌশল নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তাঁদের ধারণা, নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিক প্রচারে এই মডেল কাজে লাগানো সম্ভব।
জানোনেসের ভাষায়, এই কৌশল অন্য দেশেও প্রয়োগ করা সম্ভব এবং প্রয়োজনীয়। তাঁর বিশ্বাস, উগ্র ডানপন্থীদের রাজনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
হতাশা থেকে সংগঠিত ডিজিটাল প্রচার
গত ৪ অক্টোবর প্রথম দফার ভোটে প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ ফল করেন লুলা। এতে বামপন্থী শিবিরের অনেক সমর্থক হতাশ হয়ে পড়েন। তখনই মাঠে নামেন জানোনেস। ২০২২ সালের নির্বাচনের আগে ডানপন্থী প্রার্থীদের কঠোর ভাষায় আক্রমণ করার কারণে সহকর্মীদের কাছে তাঁর ডাকনাম হয়েছিল ‘ম্যাড ডগ’ বা পাগলা কুকুর।
তিনি সমর্থকদের আশ্বস্ত করেন, তাঁর নির্দেশনা মেনে চললে নির্বাচনের ফল ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব।
এরপর শুরু হয় সমন্বিত ডিজিটাল প্রচার। টেলিভিশনে লুলার প্রতিদ্বন্দ্বী ফ্লাভিও বলসোনারোর সাক্ষাৎকার প্রচারের সময় সমর্থকদের হাঁড়ি-পাতিল বাজানোর আহ্বান জানান তিনি। ইনস্টাগ্রামে ব্রাজিলের জাতীয় রঙের পোশাক পরে আঙুল দিয়ে ইংরেজি ‘এল’ অক্ষরের আকৃতি তৈরি করে ছবি প্রকাশ করতে বলেন। এই অক্ষর ছিল লুলার প্রতি সমর্থনের প্রতীক।
রাত গভীর পর্যন্ত সরাসরি সম্প্রচার চালাতেন জানোনেস। তাঁর শর্ত ছিল, দর্শকসংখ্যা অন্তত ১০ লাখ না হওয়া পর্যন্ত তিনি কথা বলবেন না। অনুসারীদের উদ্দেশে তাঁর নিয়মিত নির্দেশনা ছিল—ভিডিওতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে এবং সেটিকে যত বেশি সম্ভব মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।
অ্যালগরিদমকে কাজে লাগানোর কৌশল
জানোনেসের দাবি, পুরো প্রচারের পেছনে ছিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমকে প্রভাবিত করার পরিকল্পিত কৌশল।
তিনি অনুসারীদের নির্দেশ দেন, লুলার পক্ষে কোনো পোস্ট শেয়ার করার আগে তাতে মন্তব্য ও পছন্দের প্রতিক্রিয়া জানাতে হবে। এতে পোস্টটির প্রতি মানুষের আগ্রহ বা সম্পৃক্ততা বাড়বে এবং অ্যালগরিদম সেটিকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে।
অন্যদিকে, লুলার বিরুদ্ধে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্যের জবাব না দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ, নেতিবাচক মন্তব্য বা বিরোধিতাও কোনো পোস্টের প্রচার বাড়িয়ে দিতে পারে।
তাঁর দাবি, একই সময়ে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ যখন একই ছবি প্রকাশ করেন, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সেটিকে অস্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে শনাক্ত করে। তাঁর ভাষায়, বিমান দুর্ঘটনা কিংবা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার মতো ঘটনার সঙ্গে তুলনীয় মাত্রার কার্যকলাপ তৈরি হয়েছিল। এর ফলে অন্য পোস্টের প্রচার বাধাগ্রস্ত হয়। এভাবেই তাঁরা অ্যালগরিদমের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে সক্ষম হন বলে দাবি করেন জানোনেস।
শুধু ডিজিটাল প্রচারেই আসেনি জয়
তবে লুলার নির্বাচনী বিজয়ের পুরো কৃতিত্ব জানোনেসের প্রচারমাধ্যমকে দেওয়া যায় না। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে লুলাও নিজের প্রচারকৌশলে পরিবর্তন আনেন। দীর্ঘদিন প্রচলিত ধারায় প্রচার চালানোর পর তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বল্পদৈর্ঘ্যের ভিডিও প্রকাশ শুরু করেন।
নির্বাচনের আগে তাঁর সরকার সপ্তাহে দুই দিন ছুটির নিশ্চয়তা দিয়ে একটি সংশোধনী পাস করে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে থাকা করের ঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেয়।
তবে জানোনেসের ‘লুলার আর্মি’ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেভিড নেমার। তাঁর মতে, প্রথম দফায় ভোট না দেওয়া লুলাপন্থীদের দ্বিতীয় দফায় ভোটকেন্দ্রে ফিরিয়ে আনতে এই ডিজিটাল প্রচারযন্ত্র কার্যকর ছিল।
নেমারের ভাষায়, ইন্টারনেটের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে ব্যর্থ একটি নির্বাচনী প্রচারকে জানোনেস এমন একটি কণ্ঠ দিয়েছেন, যা অনলাইন দুনিয়ায় মানুষের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে।
ব্রাজিল ছাড়িয়ে বিশ্বরাজনীতিতে জানোনেসের কৌশল
জানোনেসের প্রচারপদ্ধতি এখন ব্রাজিলের সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর উদ্যোগ অনুসরণ করে বিভিন্ন দেশে হোয়াটসঅ্যাপভিত্তিক রাজনৈতিক দল ও প্রচারগোষ্ঠী তৈরি হচ্ছে। তাঁর কৌশল নিয়ে নির্দেশিকাও অনলাইনে ছড়াচ্ছে, যার মধ্যে ফরাসি ও জাপানি ভাষার সংস্করণ রয়েছে।
কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ তাঁকে পরামর্শ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ব্রাজিলের নির্বাচনের পরের সপ্তাহেই তিনি আর্জেন্টিনা সফর করেন এবং দেশটির পেরোনপন্থী বিরোধী শিবিরের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
দেশেও এই প্রচারযন্ত্র চালু রাখতে চান জানোনেস। তাঁর লক্ষ্য, রক্ষণশীলদের প্রাধান্য থাকা কংগ্রেসে লুলা সরকারের বিভিন্ন প্রস্তাব ও আইন পাসের পক্ষে জনমত তৈরি করা।
তবে নিজের কৌশল নিয়ে কিছুটা অস্বস্তিও রয়েছে তাঁর। বিশেষ করে বলসোনারোপন্থীদের পোস্টের জবাব না দিয়ে সেগুলো উপেক্ষা করার নির্দেশ দেওয়াটা তাঁর কাছে পুরোপুরি স্বস্তিকর ছিল না। তারপরও ব্রাজিলের বামপন্থীদের অনেকের মতো তাঁর বিশ্বাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ডানপন্থীরা বাড়তি সুবিধা পেয়ে এসেছে। সেই পরিস্থিতি বদলাতে প্রয়োজনে কঠোর কৌশল নিতে হবে।
নিজের প্রচারপদ্ধতির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জানোনেসের শেষ মন্তব্য, ‘আমার কৌশল যুদ্ধের কৌশল।’












