একসময় সাইবার নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দুর্বল সফটওয়্যার, অসতর্ক ব্যবহারকারী আর অপরাধী হ্যাকারদের ক্রমাগত আক্রমণ। এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সাইবার অপরাধীদের এমন দক্ষতা ও গতি দিয়েছে, যা মানুষের পক্ষে একা অর্জন করা কঠিন। ফলে বছরের পর বছর ধরে অজানা থাকা সফটওয়্যারের নিরাপত্তাত্রুটি কয়েক দিনের মধ্যেই খুঁজে বের করা সম্ভব হচ্ছে। এ পরিস্থিতি শুধু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নয়, আধুনিক জীবনব্যবস্থার প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতের জন্যই নতুন বিপদ তৈরি করছে।
গত অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহকে অনেক বিশেষজ্ঞ তাই ‘ব্ল্যাক অক্টোবর’ বলে অভিহিত করছেন। সাধারণত সাইবার হামলা ও সফটওয়্যারের ত্রুটি শনাক্ত এবং সমাধান করতে প্রকৌশলীদের যে পরিশ্রম করতে হয়, সাম্প্রতিক সময়ে তার চেয়ে অনেক বেশি হারে নিরাপত্তাঝুঁকি সামনে এসেছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে সহজলভ্য এআই মডেল। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধীরা দ্রুত দুর্বলতা শনাক্ত, আক্রমণের পরিকল্পনা এবং একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ব্যবস্থায় হামলা চালাতে পারছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা এই ঝুঁকির ব্যাপ্তি বুঝিয়ে দিয়েছে। বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির এমন একটি ত্রুটি সামনে এসেছে, যার মাধ্যমে আক্রমণকারীরা সংশ্লিষ্ট কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারত। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সুপারমার্কেটে সাইবার অপরাধীদের নির্দেশে ফ্রিজার বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। আবার ইন্টারনেট নিরাপত্তার জন্য ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ সনদের ব্যক্তিগত চাবির দৈর্ঘ্য ছিল মাত্র একটি অঙ্ক—৪। অথচ সেটি হওয়ার কথা ছিল প্রায় ১০০ অঙ্কের।
এসব ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, এআইয়ের কারণে সাইবার নিরাপত্তায় যে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, বাস্তবে সমস্যাটি তার চেয়ে অনেক গভীর। একসময় মনে করা হয়েছিল, এআই যেমন অপরাধীদের সক্ষমতা বাড়াবে, তেমনি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদেরও আরও কার্যকরভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রতিরক্ষার তুলনায় আক্রমণকারীদের সক্ষমতা বাড়ার গতি অনেক বেশি।
প্রতিরক্ষার প্রযুক্তি সবার নাগালে নেই
সাইবার নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা পিছিয়ে পড়ার একটি বড় কারণ হলো, তাদের সবাই সবচেয়ে উন্নত এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক এ বছরের এপ্রিলে ‘প্রজেক্ট গ্লাসউইং’ চালু করে। এর মাধ্যমে নির্বাচিত কিছু প্রতিষ্ঠানকে তাদের উন্নত এআই মডেলের পূর্ণ সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়। শুরুতে এই উদ্যোগের সদস্যসংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও পরে বিষয়টি রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিবেচনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।
একই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল ওপেনএআই। তাদের ঘোষণায় উন্নত প্রযুক্তির সুযোগ আরও বিস্তৃত করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এখন নতুন সদস্য যুক্ত করার আগে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদনের প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে প্রতিরক্ষামূলক কাজে শক্তিশালী এআই ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো সহজ হচ্ছে না।
এতে একধরনের বৈষম্য তৈরি হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এসব উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি পাচ্ছে না, তাদের অনেককে আক্রমণকারীদের ব্যবহৃত একই ধরনের উন্মুক্ত এআই সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আবার কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে চীনা বিকল্প ব্যবহারের বিষয়েও সতর্ক। ফলে তারা কার্যত প্রযুক্তিগত অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে যাচ্ছে।
সাইবার প্রতিরক্ষায় উন্নত প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার তাই এখন শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক নীতির অংশ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ায় প্রতিরক্ষাকারীরা পিছিয়ে পড়লে তার প্রভাব শুধু কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত ব্যবসা, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। একটি জায়গার দুর্বলতা অন্য জায়গাতেও বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।
নিরাপত্তা সমাধানই কখনো হয়ে উঠছে ঝুঁকি
এআইয়ের আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো, নিরাপত্তা দুর্বলতা শনাক্ত করে তা সমাধানের প্রক্রিয়াও আক্রমণকারীদের জন্য নতুন তথ্য সরবরাহ করতে পারে। কোনো সফটওয়্যারের ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর সেটি ঠিক করতে যে হালনাগাদ ব্যবস্থা বা প্যাচ প্রকাশ করা হয়, হ্যাকারদের এআই মডেল সেই পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে আগের দুর্বলতা সম্পর্কে ধারণা পেতে পারে। অর্থাৎ নিরাপত্তা সমাধানের মধ্য দিয়েই আক্রমণের পথ প্রকাশিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সমস্যা আরও গুরুতর হয় যখন কোনো প্যাচ প্রকাশের আগেই তার তথ্য ফাঁস হয়ে যায়। তখন প্রতিরক্ষাকারীরা নিজেদের ব্যবস্থা হালনাগাদ করার সুযোগ পাওয়ার আগেই অপরাধীরা দুর্বলতার সুযোগ নিতে পারে। পিএইচপির সাম্প্রতিক ঘটনার মতো পরিস্থিতিতে এই ঝুঁকি বিশেষভাবে স্পষ্ট হয়েছে।
এআইয়ের কারণে পুরোনো ও সাধারণ নিরাপত্তা দুর্বলতাও এখন অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিন ধরেই ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত যন্ত্রপাতিতে পুরোনো সফটওয়্যার ব্যবহার, সহজে অনুমানযোগ্য পাসওয়ার্ড কিংবা নির্মাতার দেওয়া অপরিবর্তিত পাসওয়ার্ড রেখে দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আগে এসব দুর্বলতা খুঁজে বের করতে অপরাধীদের সময় ও শ্রম ব্যয় করতে হতো। এখন এআই দিয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাজার হাজার যন্ত্র পরীক্ষা করা এবং দুর্বলতা পাওয়া গেলে দ্রুত আক্রমণ চালানো সম্ভব।
অর্থাৎ প্রযুক্তিগত দুর্বলতা যতটা না নতুন, তা খুঁজে বের করা ও কাজে লাগানোর সক্ষমতাই মূলত বদলে গেছে। মানুষের অসতর্কতা আগেও ছিল, কিন্তু এখন সেই অসতর্কতাকে বড় পরিসরে কাজে লাগানোর হাতিয়ার অপরাধীদের হাতে পৌঁছে গেছে।
প্রতিরক্ষাকারীদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে
এই পরিস্থিতিতে সাইবার নিরাপত্তার ভারসাম্য বদলানো জরুরি। আক্রমণকারী ও প্রতিরক্ষাকারী—উভয়ের হাতে সমান ক্ষমতার প্রযুক্তি থাকলে প্রতিরক্ষাকারীরা কিছু স্বাভাবিক সুবিধা পান। একটি নিরাপত্তাব্যবস্থায় প্রবেশ করতে আক্রমণকারীদের সাধারণত একাধিক দুর্বলতার ধারাবাহিক ব্যবহার প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে প্রতিরক্ষাকারীদের কাজ হলো সেই দুর্বলতাগুলোর প্রতিটি খুঁজে বের করে সমাধান করা। একটি ত্রুটি বন্ধ করতে পারলেও পুরো আক্রমণপথ ভেঙে যেতে পারে।
কিন্তু এআইয়ের কারণে আক্রমণকারীরা এখন দ্রুত এবং একই সঙ্গে বহু ব্যবস্থায় দুর্বলতা খুঁজতে পারছেন। ফলে প্রতিরক্ষাকারীদের স্বাভাবিক সুবিধা যথেষ্ট থাকছে না। তাদের আরও উন্নত প্রযুক্তি, বেশি সম্পদ এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের উচিত সাইবার প্রতিরক্ষামূলক এআই কর্মসূচিতে নতুন প্রতিষ্ঠান যুক্ত করার ক্ষেত্রে আরও নমনীয় হওয়া। অন্তত অনুমোদনের প্রক্রিয়া দ্রুত করা দরকার। একই সঙ্গে আক্রমণকারীদের হাতে অত্যন্ত শক্তিশালী সাইবার অস্ত্র পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। চীনও নতুন এআই ব্যবস্থা প্রকাশের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ধ্বংসাত্মক সক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে এবং গবেষণাগারগুলোকে সে বিষয়ে সীমাবদ্ধতা মানতে বলছে।
তবে নীতিগত উদ্যোগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। যেসব সংস্থা এখনো নিয়মিতভাবে এআই ব্যবহার করে সফটওয়্যারের নিরাপত্তাত্রুটি খুঁজে বের করছে না, তারা ইতিমধ্যে পিছিয়ে পড়েছে। শুধু আক্রমণের পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর বদলে আগেভাগে দুর্বলতা শনাক্ত ও সমাধানের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এ কাজে অনেক ছোট প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামো পরিচালনাকারীর বাড়তি সহায়তা প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে ‘প্রজেক্ট ওয়াটারশেড ২৫০’-এর মতো উদ্যোগের মাধ্যমে অবকাঠামো সেবাদাতাদের মৌলিক সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের কর্মসূচির পরিসর বাড়ানো দরকার। কারণ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, পানি, পরিবহন ও অন্যান্য জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত তুলনামূলক ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতে সফটওয়্যার শিল্পের জন্য আরও বড় একটি সুযোগ তৈরি হতে পারে। গাণিতিক উপপাদ্য প্রমাণের মতো পদ্ধতিতে কোনো সফটওয়্যারের নির্দিষ্ট কোডের নিরাপত্তা আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হতে পারে। এতে কোডের নির্দিষ্ট অংশে অননুমোদিত প্রবেশের সুযোগ নেই—এমনটি গাণিতিকভাবে প্রমাণ করার পথ খুলবে। তবে এই পর্যায়ে পৌঁছাতে গবেষণা, বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
আধুনিক বাণিজ্য, অবকাঠামো ও মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ এখন ইন্টারনেটের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। এই নির্ভরতার ভিত্তি হলো—ডিজিটাল ব্যবস্থা নিরাপদ থাকবে। কিন্তু এআইয়ের কারণে আক্রমণকারীদের সক্ষমতা দ্রুত বাড়লেও প্রতিরক্ষাকারীরা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও সম্পদ না পেলে সেই আস্থার ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে, কিন্তু শুধু সচেতনতা দিয়ে বিপর্যয় ঠেকানো যাবে না। প্রতিরক্ষাকারীদের হাতে আক্রমণকারীদের চেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত সম্পদ এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে যে ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর আধুনিক সমাজ দাঁড়িয়ে আছে, সেটিই বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।












