মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের স্যাটেলাইটভিত্তিক সেবা স্টারলিংক। সামরিক জান্তা সরকার অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়ায় বিদ্রোহী গোষ্ঠী, মানবিক সহায়তা সংস্থা, স্কুল ও হাসপাতালগুলো এই সেবার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। কিন্তু সম্প্রতি স্পেসএক্সের কিছু স্টারলিংক সংযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এসব এলাকার মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা নতুন ঝুঁকিতে পড়েছে।
এরই মধ্যে একটি আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ার পর সামরিক হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন।
স্টারলিংক বন্ধ, হামলার আগাম খবর পাননি শ্রমিকেরা
মিয়ানমারের থাইল্যান্ড সীমান্তের কাছে অবস্থিত মাও চি খনি অঞ্চলটি একসময় বিশ্বের অন্যতম বড় টাংস্টেন খনির জন্য পরিচিত ছিল। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ ও অব্যবস্থাপনায় খনিটির উৎপাদন কমে গেলেও এখনো ছোট ছোট শ্রমিক দল সেখানে টাংস্টেন উত্তোলন করে। পরে এই ধাতু থাইল্যান্ড হয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়। উড়োজাহাজ, ক্ষেপণাস্ত্র ও অর্ধপরিবাহী যন্ত্র তৈরিতে টাংস্টেন ব্যবহৃত হয়।
খনিটির অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে সামরিক জান্তা ও তাদের বিরোধী বিদ্রোহীদের সংঘাতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দুই বছর আগে বিদ্রোহীরা খনিটির নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সেখানকার আয় নিজেদের যুদ্ধের কাজে ব্যবহার শুরু করে। জবাবে সামরিক বাহিনী মাঝেমধ্যে খনি এলাকায় বিমান হামলা চালায়।
এ ধরনের হামলা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করতে বিদ্রোহীরা স্টারলিংক ব্যবহার করে একটি আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। সামরিক বিমানঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থান করা পর্যবেক্ষকেরা যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের খবর পেলে খনি এলাকার মানুষকে সতর্ক করতেন। এতে শ্রমিক ও বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় পেতেন।
কিন্তু গত ১ সেপ্টেম্বর সেই ব্যবস্থা কাজ করেনি। স্থানীয় এক বিদ্রোহী কমান্ডারের দাবি, স্টারলিংক টার্মিনালগুলোর একটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সতর্কবার্তা পৌঁছায়নি। পরে সামরিক বাহিনীর একটি যুদ্ধবিমান খনিতে বোমা হামলা চালায়। এতে পাঁচজন নিহত ও ছয়জন আহত হন।
জুলাই থেকে বন্ধ হচ্ছে স্টারলিংক সংযোগ
মিয়ানমারের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ ও বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় স্টারলিংক এখন যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সামরিক জান্তা সরকার এসব অঞ্চলের অনেক জায়গায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে রেখেছে। ফলে বিদ্রোহী বাহিনী থেকে শুরু করে মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোকেও স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
দেশটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্টারলিংক সেবা চালু নেই। তবে বিদেশ থেকে টার্মিনাল সংগ্রহ করে অবৈধভাবে সেগুলো মিয়ানমারে আনা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এসব ব্যবহারের বিষয়টি স্পেসএক্স অনেকটা উপেক্ষা করে এসেছে।
কিন্তু গত জুলাই থেকে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বেশ কিছু স্টারলিংক টার্মিনাল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিদ্রোহী, ত্রাণকর্মী ও শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক টার্মিনাল এখনো সচল থাকলেও কোন বিবেচনায় কিছু সংযোগ বন্ধ করা হচ্ছে, তা পরিষ্কার নয়।
স্পেসএক্স এ বিষয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে মিয়ানমারের কয়েকটি মানবিক সহায়তা সংস্থাকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের চাপের মুখে দেশটির প্রতারণাকেন্দ্রগুলোর ব্যবহার বন্ধ করতে তারা কাজ করছে। এসব কেন্দ্র স্টারলিংক ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতারণামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রতারণাকেন্দ্রগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও তাদের অর্থায়নকারীদের সঙ্গে কাজ করছে সরকার। একই সঙ্গে প্রযুক্তিটির বৈধ ব্যবহারকারীদের জন্য সংযোগ চালু রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
মানবিক সহায়তা সংস্থাগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একটি বিশেষ অনুমোদিত তালিকা বা ‘হোয়াইটলিস্ট’ থাকার গুঞ্জন রয়েছে। তবে সেই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে কী করতে হবে, তা এখনো সংশ্লিষ্টদের কাছে পরিষ্কার নয়।
স্কুল-হাসপাতালের সেবাও ব্যাহত
মিয়ানমারে স্টারলিংক শুধু বিদ্রোহীদের যোগাযোগের মাধ্যম নয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রবাসে অবস্থানরত গণতন্ত্রপন্থী জাতীয় ঐক্য সরকার বা এনইউজি তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় দূর থেকে স্কুল ও হাসপাতাল পরিচালনায় এই সেবা ব্যবহার করছে। সামরিক বাহিনীর বিমান হামলার ঝুঁকির কারণে এসব এলাকায় বড় স্থাপনা গড়ে তোলা কঠিন। তাই দূরবর্তী যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হচ্ছে।
এনইউজির অধীন হাসপাতালগুলো বিদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে রোগীদের পরামর্শ ও চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে। অন্যদিকে, শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করছে।
কিন্তু টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমছে। একটি এনইউজি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সেখানে ২৭০ জন শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল। এর মধ্যে ৪০ জন ইতিমধ্যে পড়াশোনা বন্ধ করে দিয়েছে।
স্টারলিংক বন্ধের পেছনে কী কারণ
স্টারলিংকের সংযোগ বন্ধের কারণ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি গোপনে মিয়ানমারের কিছু এলাকায় আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা স্থাপনে সহায়তা করেছিল। এসব ব্যবস্থায় স্টারলিংক ব্যবহার করা হয়।
তবে স্পেসএক্স শুরু থেকেই মিয়ানমারে তাদের টার্মিনাল ব্যবহারের আইনি দিক নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। সংশ্লিষ্ট এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ করে তাদের প্রযুক্তি প্রাণঘাতী কোনো কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।
এদিকে, মিয়ানমারে স্টারলিংক ব্যবহার করে চালানো ড্রোন হামলার কোনো স্পষ্ট প্রমাণ বিশ্লেষকেরা পাননি। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়নও সীমিত। ত্রাণকর্মীদের দাবি, নতুন একটি স্টারলিংক টার্মিনাল চোরাই পথে মিয়ানমারে আনতে সর্বোচ্চ ৮ হাজার ৫০০ ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে। ফলে বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোনে এ ধরনের ব্যয়বহুল যন্ত্র যুক্ত করা বিদ্রোহীদের জন্য সহজ নয়।
তবে স্টারলিংক বন্ধের সিদ্ধান্ত শুধু বিদ্রোহীদের যোগাযোগব্যবস্থায় প্রভাব ফেলছে না, সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষার ব্যবস্থাকেও দুর্বল করছে। মাও চির ঘটনা তারই উদাহরণ।
প্রযুক্তিটির সামরিক ব্যবহার ঠেকানোর উদ্দেশ্যে সংযোগ সীমিত করা হলেও এর ওপর নির্ভরশীল বেসামরিক মানুষ, শিক্ষার্থী ও রোগীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে প্রতারণা দমনের উদ্যোগের প্রভাব পড়ছে শিক্ষা, চিকিৎসা ও আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থায়ও। মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ এলাকায় স্টারলিংক বন্ধের এই বাস্তবতা এখন প্রযুক্তি ব্যবহারের নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার মধ্যে জটিল প্রশ্ন তৈরি করেছে।












