ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কায় চরম নিরাপত্তা উদ্বেগে রয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। তবে আগের যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরোধী অস্ত্র ব্যবহার করায় পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বিশ্বজুড়েই উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধে বাহরাইনসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়। বাহরাইনের রাজধানী মানামায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান নৌঘাঁটির আশপাশে এখনো সেই যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন রয়েছে। ধ্বংস হয়ে যাওয়া যোগাযোগের অ্যান্টেনা, আগুনে পোড়া ভবন এবং ক্ষতিগ্রস্ত উঁচু ভবনের বিভিন্ন অংশে মেরামতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে।
ওই যুদ্ধে বাহরাইন লক্ষ্য করে ৭০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও আক্রমণকারী ড্রোন ছুড়েছিল ইরান। অধিকাংশ হামলা প্রতিহত করা গেলেও কয়েকটি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি একটি পানি পরিশোধন কেন্দ্র, তেল শোধনাগার এবং অ্যালুমিনিয়াম কারখানাও আক্রান্ত হয়।
এখন নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আরব সাগরের দিকে এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস থিওডোর রুজভেল্টের নেতৃত্বাধীন নৌবহর। সেখানে আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের আরও দুটি রণতরি বহর রয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল ও জর্ডানের সামরিক ঘাঁটিতে অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে ওয়াশিংটন। এসব সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে আরও প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
এ সপ্তাহে ইরানের কেশম দ্বীপে দেশটির বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের হামলার ঘটনাও নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। মার্কিন ড্রোন ও যুদ্ধবিমানের প্রতি হুমকির জবাবে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেও এর তাৎপর্য রয়েছে।
ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে চাপে পড়ার পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিদেশে নতুন করে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারেন—এমন আশঙ্কা রয়েছে উপসাগরীয় দেশগুলোর। একই সঙ্গে তারা মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত বাড়লে ইরানের প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তু হতে পারে তাদের ভূখণ্ডও। ইরান ইতিমধ্যে কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা না মেনে পাল্টা জবাব দেওয়ার হুমকি দিয়েছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রের সংকট। আগের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা বিপুলসংখ্যক প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। ফলে বিশ্বজুড়ে এসব অস্ত্রের মজুত এখন অনেকটাই কমে গেছে। ইউক্রেনসহ অন্যান্য যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত কিছু প্রতিরোধব্যবস্থা উপসাগরীয় দেশগুলোকে ড্রোন হামলা মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে। তবে ইরানের ড্রোন প্রযুক্তিও দ্রুত উন্নত হচ্ছে।
অন্যদিকে যুদ্ধবিরতির পর ইরান যে গতিতে আবার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত বাড়িয়েছে, তা ইসরায়েলের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদেরও বিস্মিত করেছে। ফলে নতুন সংঘাত শুরু হলে ইরানের হামলার সক্ষমতা আগের তুলনায় কতটা বেড়েছে, তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
নতুন হামলায় লক্ষ্যবস্তু খুঁজে পাওয়া কঠিন
আগের কয়েক সপ্তাহের বিমান হামলার পর নতুন করে বোমাবর্ষণ করে কতটা সামরিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আগের অভিযানে তুলনামূলক সহজে আঘাত করা যায়, এমন অনেক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। ২০২৫ সালেও ইরানের ফোরদো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানের প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা হয়েছিল। ওই হামলায় উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ প্রায় ৪০০ কেজি ইউরেনিয়াম মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হয়।
এখন ইরানের যেসব গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই মাটির গভীরে অবস্থিত। এর মধ্যে রয়েছে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর পরিচালিত ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা। এসব স্থাপনার প্রবেশপথে আগের দফায় হামলা হলেও পরে নতুন করে খননকাজ চালিয়ে সেগুলো সচল করার চেষ্টা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংসকারী বোমার মজুতও কমে আসছে বলে মনে করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ইরানের ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে পরিচিত একটি স্থাপনা নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে নতুন কোনো পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে। গ্রানাইট পাথরের অনেক গভীরে অবস্থিত হওয়ায় প্রচলিত বোমা দিয়ে সেটি ধ্বংস করা কঠিন হতে পারে। এ স্থাপনায় হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে—এমন আলোচনাও উঠেছে, যদিও এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
প্রতিরক্ষায় এগিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তুলনামূলক শক্তিশালী। আগের যুদ্ধে দেশটি সবচেয়ে বেশি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে। মোট ২ হাজার ৮০০টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দেশটিকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে আমিরাতকে বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকতে পারে।
তবে দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় একাধিক স্তরের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক রয়েছে। পাশাপাশি আক্রমণকারী হেলিকপ্টারে বসানো কামান, নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ইলেকট্রনিক যুদ্ধ সরঞ্জাম এবং সম্ভাব্য ইসরায়েলি লেজার অস্ত্রও তাদের প্রতিরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। আমিরাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত এবং দেশের নিরাপত্তা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
সৌদি আরবের জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন। দেশটির আয়তন বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে সব স্থাপনা একসঙ্গে সুরক্ষিত রাখা কঠিন। এ ছাড়া ইরানের পাশাপাশি ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীর হামলার ঝুঁকিও রয়েছে সৌদি আরবের।
উপসাগরীয় নিরাপত্তায় নতুন মেরুকরণ
যুক্তরাষ্ট্র ইরান থেকে দূরবর্তী ইসরায়েল ও জর্ডানের ঘাঁটিতে সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা মোতায়েন বাড়াচ্ছে। এতে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে।
সৌদি আরব এ ক্ষেত্রে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মক্কা চুক্তি করেছে। চুক্তির আওতায় দেশ দুটি সৌদি আরবে সেনা পাঠিয়েছে অথবা পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে প্রকৃত যুদ্ধ শুরু হলে তারা কী ধরনের সামরিক ভূমিকা পালন করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের হুমকি মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। কিন্তু দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বিরোধ ও আস্থার সংকটের কারণে দেশগুলো সম্মিলিত নিরাপত্তাব্যবস্থার পরিবর্তে নিজস্ব ও দ্বিপক্ষীয় সামরিক চুক্তির ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, ইরানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপসাগরীয় দেশগুলোর ঐক্য বাস্তবে কার্যকর হয়নি। নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে এই সমন্বয়হীনতা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বড় দুর্বলতা হয়ে উঠতে পারে।












