রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, লাখ লাখ মানুষের দেশত্যাগ, সেনা ও বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু এবং জন্মহার নজিরবিহীনভাবে কমে যাওয়ায় গভীর জনসংখ্যা সংকটে পড়েছে ইউক্রেন। পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশটির জনসংখ্যা ২০৪০ সাল নাগাদ কমে প্রায় আড়াই কোটিতে দাঁড়াতে পারে। এতে যুদ্ধ-পরবর্তী ইউক্রেনের অর্থনীতি পুনর্গঠন, শ্রমবাজার এবং রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্ব বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর ইউক্রেনের সরকারনিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ থেকে কমে ২ কোটি ৭০ লাখ থেকে ২ কোটি ৮০ লাখে নেমেছে। আরও ৩০ লাখ থেকে ৫০ লাখ মানুষ রাশিয়ার দখল করা এলাকায় রয়েছেন। এ ছাড়া লাখ লাখ ইউক্রেনীয় দেশ ছেড়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছেন।
যুদ্ধের কারণে দেশটির জনসংখ্যা কমার পাশাপাশি জন্মহারও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। ২০২০ সালে ইউক্রেনে নারীপ্রতি সন্তান জন্মদানের গড় হার ছিল ১ দশমিক ২। বর্তমানে তা কমে শূন্য দশমিক ৮ থেকে শূন্য দশমিক ৯-এ নেমেছে। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে যেখানে নারীপ্রতি গড়ে ২ দশমিক ১ সন্তান প্রয়োজন, সেখানে ইউক্রেনের বর্তমান হার সেই সীমার অনেক নিচে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটিতে জন্মের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি ছিল।
যুদ্ধ ও দেশত্যাগে কমছে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
১৯৯১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের সময় ক্রিমিয়া ও দনবাসসহ ইউক্রেনের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৫ কোটি ২০ লাখ। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটিতে জন্মের তুলনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি ছিল। তবে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন সেই ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির হিসাবে, যুদ্ধে দেশটির পাঁচ হাজার নয়, ৫০ হাজারের বেশি সেনা নিহত হয়েছেন। তবে একটি স্বাধীন হিসাব অনুযায়ী, নিহত সেনার সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এ ছাড়া হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। রাশিয়া ২০ হাজারের বেশি ইউক্রেনীয় শিশুকে দেশ থেকে সরিয়ে নিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে জনসংখ্যা কমে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ দেশত্যাগ। বর্তমানে ৫০ লাখের বেশি ইউক্রেনীয় বিদেশে বসবাস করছেন, যাঁদের অধিকাংশই ইউরোপে আশ্রয় নিয়েছেন। শীত মৌসুমে রাশিয়ার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও বাড়লে নতুন করে হাজার হাজার মানুষ দেশ ছাড়তে পারেন।
যুদ্ধ শুরুর পর ইউক্রেন ছেড়ে যাওয়া মানুষের মধ্যে দেশে ফেরার আগ্রহও কমছে। কিয়েভভিত্তিক সেন্টার ফর ইকোনমিক স্ট্র্যাটেজির হিসাবে, ২০২২ সালের শেষ দিকে বিদেশে থাকা ইউক্রেনীয়দের ৭৪ শতাংশ দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন। বর্তমানে সেই হার কমে ৪৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিদেশে থাকা শরণার্থীদের বড় অংশ নারী ও ৪৪ বছরের কম বয়সী। তাঁদের মধ্যে অনেকেই সন্তান জন্মদানের উপযুক্ত বয়সের। ফলে দেশত্যাগ শুধু বর্তমান জনসংখ্যা কমাচ্ছে না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সংখ্যাও সংকুচিত করছে।
কিয়েভের মিখাইলো পটু্খা ইনস্টিটিউট অব ডেমোগ্রাফির পরিচালক এলা লিবানোভার ভাষায়, ইউক্রেন শুধু মানুষ হারাচ্ছে না, হারাচ্ছে তার ভবিষ্যৎও।
সন্তান নিতে অনিশ্চয়তায় পরিবারগুলো
যুদ্ধের পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের অনেক দম্পতি সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। সামরিক বাহিনীতে যোগদান, যুদ্ধে প্রাণহানি, নিরাপত্তাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা পরিবার গঠনের পরিকল্পনাকে কঠিন করে তুলেছে।
জনসংখ্যাবিদ স্বেতলানা আকসিওনোভার মতে, সন্তান জন্ম দেওয়ার সিদ্ধান্ত যত দীর্ঘ সময় পিছিয়ে দেওয়া হয়, শেষ পর্যন্ত সন্তান জন্ম না হওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়ে।
২৫ বছরের কম বয়সী পুরুষদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ইউক্রেন সরকার। জনসংখ্যার ওপর যুদ্ধের প্রভাব কমানোও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। কিন্তু এরপরও লাখ লাখ তরুণ দেশ ছেড়েছেন। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২৩ বছরের কম বয়সী পুরুষদের দেশত্যাগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। দেশের ভেতরে থাকা অনেক তরুণও যুদ্ধের অনিশ্চয়তার মধ্যে পরিবার গড়তে আগ্রহী নন।
২০৪০ সালে জনসংখ্যা আড়াই কোটিতে নামার আশঙ্কা
ইউক্রেনের জনসংখ্যা পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন পূর্বাভাসে বলা হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরে যুদ্ধ শেষ হলেও জনসংখ্যা কমার প্রবণতা সহজে থামবে না।
দেশটির সবচেয়ে ছোট প্রজন্মগুলোর একটি হলো ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে জন্ম নেওয়া মানুষ। ফলে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই বড় ধরনের শিশুজন্মের ঢেউ বা বেবি বুম হওয়ার সম্ভাবনা সীমিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইউক্রেনের সরকার দুই বছর আগে যে জনসংখ্যা কৌশল গ্রহণ করেছিল, তাতে ২০৩০ সালের মধ্যে জনসংখ্যা সামান্য বাড়ার প্রত্যাশা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনায় ২০২৬ সালের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হওয়া এবং ১৯৯১ সালের সীমান্তে দেশটির নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার ধারণা ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের তুলনামূলক বাস্তবসম্মত পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী দুই দশক ইউক্রেনের জনসংখ্যা প্রতিবছর শূন্য দশমিক ৭ থেকে শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ হারে কমতে পারে। দখল করা ভূখণ্ড ফিরে না পাওয়ার পরিস্থিতি ধরে এই পূর্বাভাসে ২০৪০ সালে দেশটির জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখে নেমে আসার আশঙ্কা করা হয়েছে।
যুদ্ধ যদি ২০৩০-এর দশক পর্যন্ত গড়ায়, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে ১৯৯০-এর দশকে জন্ম নেওয়া লাখ লাখ মানুষ সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা পুরোপুরি বাদ দিতে পারেন। নারীপ্রতি সন্তান জন্মদানের হার শূন্য দশমিক ৬-এ নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জনসংখ্যাবিদ আকসিওনোভা। তখন দেশের তুলনামূলক নিরাপদ পশ্চিমাঞ্চলেই অধিকাংশ শিশুর জন্ম হবে। যুদ্ধের সম্মুখসারির এলাকাগুলো ধীরে ধীরে জনশূন্য হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে।
আর্থিক প্রণোদনায় জন্মহার বাড়ানোর চেষ্টা
জনসংখ্যা কমার গতি থামাতে ইউক্রেন সরকার সন্তান জন্মদানে আর্থিক সহায়তা বাড়িয়েছে। নতুন আইনে প্রতিটি নবজাতকের জন্য বাবা-মাকে ৫০ হাজার হৃভনিয়া বা প্রায় ১ হাজার ১০০ ডলার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি শিশুর প্রথম বছর প্রতি মাসে ৭ হাজার হৃভনিয়া সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
শিশু পরিচর্যার ব্যয় মেটাতে আরও কিছু কর্মসূচি চালু রয়েছে। ২০২৪ সাল থেকে নারীদের বন্ধ্যত্ব চিকিৎসার ব্যয়ও সরকার বহন করছে। সেনাসদস্যদের বিনা মূল্যে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু সংরক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যাতে যুদ্ধের কারণে ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট না হয়।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শান্তিকালেও শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে জন্মহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো কঠিন। যুদ্ধের মধ্যে নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে এ ধরনের উদ্যোগের কার্যকারিতা আরও সীমিত।
লিবানোভার প্রশ্ন, এমন পরিস্থিতিতে মানুষকে কীভাবে সন্তান নিতে উৎসাহিত করা সম্ভব?
রাশিয়ার কর্মকর্তারা ইউক্রেনের জনসংখ্যা সংকট নিয়ে প্রকাশ্যে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্যও করেছেন। রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ গত মে মাসে একে একটি জাতির ‘জৈবিক মৃত্যু’র প্রমাণ বলে মন্তব্য করেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের উপদেষ্টা আন্তন কোব্যাকভ ইউক্রেনে রুশ নাগরিকদের বসতি স্থাপনের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। এসব বক্তব্য ইউক্রেনের জনসংখ্যা সংকটকে ঘিরে রাশিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানের একটি দিক তুলে ধরছে।
পুনর্গঠনে বড় বাধা শ্রমিকের ঘাটতি
যুদ্ধ শেষ হলে ইউক্রেনের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হবে অর্থনীতি পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিকের জোগান নিশ্চিত করা। ইউরোপীয় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের হিসাবে, দেশটিতে ইতিমধ্যে প্রায় ২৫ লাখ শ্রমিকের ঘাটতি রয়েছে।
বিদেশি শ্রমিক আনার সুযোগ থাকলেও ইউক্রেনে নিবন্ধিত অভিবাসী শ্রমিকের সংখ্যা মাত্র প্রায় ৯ হাজার ৫০০। বিদেশি কর্মী নিয়োগে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশাসনিক জটিলতাকে বড় বাধা হিসেবে দেখছে।
তবে সরকার আপাতত দেশের ভেতরেই শ্রমশক্তি খোঁজার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। নারী, যুদ্ধফেরত সেনা এবং বাস্তুচ্যুত মানুষকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু যুদ্ধফেরত সেনাদের অনেকেই চাকরি পেতে সমস্যায় পড়ছেন। নারীদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। শিশু পরিচর্যার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিদেশি শ্রমিক নেওয়ার বিষয়ে ইউক্রেনের উপঅর্থমন্ত্রী দারিয়া মার্চাক বলেছেন, দেশের ভেতরে ও বিদেশে থাকা ইউক্রেনীয়দের কর্মক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানোর পরই বিদেশি শ্রমিক নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
তবে সেন্টার ফর ইকোনমিক স্ট্র্যাটেজির হ্লিব ভিশলিনস্কির মতে, যুদ্ধের পর দেশ পুনর্গঠনে শুধু ইউক্রেনীয় শ্রমিক দিয়ে প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হবে না। বিদেশি শ্রমিক নেওয়া দেশটির জন্য অনিবার্য হয়ে উঠবে।
যুদ্ধের মধ্যেও সন্তান নেওয়ার স্বপ্ন
এত প্রতিকূলতার মধ্যেও কিছু ইউক্রেনীয় পরিবার সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। খারকিভে বসবাস শুরু করা দারিয়া জানিয়েছেন, তিনি প্রেমিকের সঙ্গে নতুন করে পরিবার গড়ার পরিকল্পনা করছেন।
অন্যদিকে পূর্ব ইউক্রেনের দিনিপ্রোর কাছে দায়িত্ব পালনরত ৩০-এর কোঠার শেষ দিকে থাকা এক নারী সেনাসদস্য লিউদমিলা গত বছর থেকে ডিম্বাণু সংরক্ষণ করছেন। যুদ্ধের আগে তাঁর স্বপ্ন ছিল দুটি সন্তান নেওয়া। এখন তিনি তিনটি সন্তান চান।
ইউক্রেনের জাতীয় কবি তারাস শেভচেঙ্কোর একটি কবিতার ভাবার্থ তুলে ধরে তাঁর বক্তব্য, ‘একজন মৃতদের জন্য, একজন জীবিতদের জন্য, আরেকজন ভবিষ্যতে যারা জন্ম নেবে তাদের জন্য।’
যুদ্ধের মধ্যে এই আকাঙ্ক্ষা ইউক্রেনের জনসংখ্যা সংকটের বিপরীতে ব্যক্তিগত আশা ও জাতীয় ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টার প্রতীক হয়ে উঠেছে।












