সুরকার ম্যাক্স রিখটার এখন সমকালীন শাস্ত্রীয় সংগীতের অন্যতম পরিচিত নাম। তাঁর সংগীত শোনা যাচ্ছে চলচ্চিত্রে, টেলিভিশনে, কনসার্টে, এমনকি মানুষের ঘুমের ঘরেও। মার্কিন টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব অপরাহ উইনফ্রের বিশেষ আয়োজন থেকে শুরু করে অস্কার মনোনীত চলচ্চিত্র—সবখানেই রয়েছে তাঁর সংগীতের উপস্থিতি। কিন্তু কী এমন আছে তাঁর সুরে, যা তাঁকে এত বিপুলসংখ্যক মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে?
আগামী এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে অপরাহ উইনফ্রের ‘ইমার্সিভ সিম্ফনি অব সেনসেস’ অনুষ্ঠানের সংগীত পরিচালনা করবেন রিখটার। অনুষ্ঠানটি হবে স্ফিয়ার নামের বিশেষ আয়োজনকেন্দ্রে। চলচ্চিত্রের পর্দাতেও তাঁর উপস্থিতি রয়েছে। এ বছর অস্কার মনোনয়ন পাওয়া ‘হ্যামনেট’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনি। আর ঘুমের সময়ও অনেকের সঙ্গী তাঁর সুর। তাঁর সাড়ে আট ঘণ্টার দীর্ঘ সংগীতকর্ম ‘স্লিপ’ এখন পর্যন্ত দুই শ কোটির বেশি বার শোনা হয়েছে।
তবে শ্রোতাদের মনে সবচেয়ে গভীরভাবে জায়গা করে নিয়েছে সম্ভবত ‘অন দ্য নেচার অব ডেলাইট’। ২০০৪ সালে তৈরি ছয় মিনিটের এই সংগীতটি স্ট্রিং কুইন্টেট বা পাঁচটি তারযন্ত্রের জন্য রচিত। এর আবেগঘন সুর এক ডজনেরও বেশি চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘মাই ব্রিলিয়ান্ট ফ্রেন্ড’ ও ‘ব্ল্যাক মিরর’। সংগীতটি মানুষের প্রতিদিনের যাতায়াতকেও কখনো কখনো একান্ত ভাবনার সময়ে পরিণত করে। তাঁর নতুন অ্যালবাম ‘হোয়াইল দ্য ফ্লাড রেজেস’-এও এই সুরের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
একজন সংগীতকারের জন্য এমন সর্বব্যাপী পরিচিতি অর্জন করাই বড় সাফল্য। আর রিখটার যেহেতু শাস্ত্রীয় সংগীতের চর্চা করেন, তাই তাঁর জনপ্রিয়তা আরও উল্লেখযোগ্য।
জার্মানিতে জন্ম নেওয়া রিখটার বেড়ে উঠেছেন যুক্তরাজ্যে। লন্ডনের রয়্যাল একাডেমি অব মিউজিকে পড়াশোনা করেছেন। পাশাপাশি ইতালীয় আধুনিক সংগীতকার লুচিয়ানো বেরিওর কাছেও সংগীত শিখেছেন। তাঁর সংগীতে শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রভাব কেউ বুঝতে না পারলে তিনি নিজেই তা বুঝিয়ে দিতে পারেন। ইংল্যান্ডের কটসওল্ডসে নিজের স্টুডিওতে এক সাক্ষাৎকারে নতুন অ্যালবামের একটি সুর পিয়ানোয় বাজিয়ে দেখান। তাঁর মতে, সুরের একটি ক্রমধারা জোহান সেবাস্টিয়ান বাখের সংগীতের কথা মনে করিয়ে দেয়। শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ডেকা তাঁর সংগীত প্রকাশ করে।
তবে শুধু শাস্ত্রীয় সংগীতের কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে রিখটারের সংগীতের এই বৈচিত্র্য তৈরি হতো না। জার্মান ইলেকট্রনিক সংগীত দল ক্রাফটওয়ার্ক তাঁর অন্যতম প্রভাব। পাশাপাশি মার্কিন মিনিমালিস্ট সংগীতকার ফিলিপ গ্লাসের কাজ থেকেও তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। তাঁর স্টুডিওর পিয়ানোর পাশে সারি সারি পুরোনো ধরনের সিনথেসাইজার রাখা। সব মিলিয়ে জায়গাটিকে তাঁর ভাষায় মনে হয় যেন কোনো মহাকাশ অভিযানের নিয়ন্ত্রণকক্ষ।
সংগীতের প্রচলিত বিভাজন—শাস্ত্রীয় ও অন্যান্য ধারার সংগীত—তাঁর কাছে অদ্ভুত বলে মনে হয়। বর্তমান সময়ে এমন বিভাজনকে তিনি খুব একটা গুরুত্ব দেন না।
সংগীতের নানা ধারা থেকে প্রভাব গ্রহণ এবং নিজস্ব সৃজনশীল প্রবণতার সমন্বয় রিখটারকে সমকালীন সংগীতকারদের মধ্যে বিশেষ অবস্থানে নিয়ে গেছে। শাস্ত্রীয় সংগীতে দক্ষতার কারণে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালকদের পাশাপাশি নৃত্য পরিচালকদের সঙ্গেও কাজ করেন।
তাঁর নতুন অ্যালবাম ‘হোয়াইল দ্য ফ্লাড রেজেস’-এর সংগীতের একটি অংশ তৈরি হয়েছিল ‘ম্যাডঅ্যাডাম’ ব্যালে অনুষ্ঠানের জন্য। মার্গারেট অ্যাটউডের লেখা পৃথিবী ধ্বংসের পরবর্তী সময়ের এক কল্পিত জগৎ নিয়ে রচিত উপন্যাসত্রয়ী থেকে ব্যালেটি অনুপ্রাণিত। অ্যাটউডের আরেকটি বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল’।
আগামী এপ্রিলে প্যারিসের অর্কেস্ট্রা দ্য প্যারিস তাঁর রচিত একটি সেলো কনসার্তোর প্রথম পরিবেশনা করবে। চলচ্চিত্র ও মুঠোফোনে শোনার উপযোগী হলেও তাঁর সংগীত কনসার্ট হলও দর্শকে পূর্ণ করে। নরওয়ের বেহালাবাদক মারি সামুয়েলসেন, যিনি নিয়মিত রিখটারের সংগীত পরিবেশন করেন, তাঁর সংগীতকে বলেছেন অত্যন্ত ধ্যানমগ্ন ও পরিশুদ্ধ করার মতো। একই সঙ্গে তাঁর কাছে এই সংগীত সরল এবং জটিল।
সামুয়েলসেনের পর্যবেক্ষণ, রিখটারের সংগীত শুনতে আসা শ্রোতাদের বয়স প্রচলিত শাস্ত্রীয় সংগীতের কনসার্টের দর্শকদের তুলনায় কম। তাঁরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অনুভূতিও বেশি প্রকাশ করেন।
জনপ্রিয়তার পাশাপাশি সমালোচনাও
তবে রিখটারের সংগীতের এই আবেগঘন আবেদন সবার কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। সমালোচকদের একাংশ মনে করেন, তাঁর সংগীত অতিরিক্ত কোমল ও আবেগনির্ভর। শ্যাম্পেন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ক্রুগ এবং ফ্যাশন প্রতিষ্ঠান ক্রিশ্চিয়ান ডিওরের মতো ব্র্যান্ডের সঙ্গে তাঁর অংশীদারত্ব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের মতে, এসব সহযোগিতা তাঁর শিল্পকে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করার বদলে শ্রোতাকে প্রশান্তিতে ডুবিয়ে রাখে।
খ্যাতনামা সংগীত সমালোচক অ্যালেক্স রস লিখেছেন, বৈশ্বিক বিপর্যয়ের মতো বিষয় সামনে এলেও রিখটারের সংগীতে একধরনের কোমল নিয়তিবাদ এবং অসাড় আত্মসমর্পণের অনুভূতি তৈরি হয়।
অবশ্য তাঁর অনেক সংগীতকর্মেই রাজনৈতিক বক্তব্য রয়েছে। ২০২০ সালে প্রকাশিত ‘ভয়েসেস’ অ্যালবামে জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। রিখটারের ভাষায়, ‘স্লিপ’ হলো অতিরিক্ত শিল্পায়িত, তীব্র ও যান্ত্রিক জীবনযাপনের বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিবাদ। ‘ডে-লাইট’ তৈরি হয়েছিল এমন একটি অ্যালবামের অংশ হিসেবে, যেখানে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের বিরোধিতা করা হয়েছিল।
তবে এসব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট তাঁর সংগীতে অধিকাংশ সময় দূরবর্তী বাস্তবতা হিসেবেই উপস্থিত থাকে। শ্রোতাকে সরাসরি সংঘাতের মুখোমুখি করার বদলে তিনি যেন অন্য এক জগতের সম্ভাবনা তুলে ধরেন।
বিপর্যয়ের মধ্যেও আশার সুর
‘হোয়াইল দ্য ফ্লাড রেজেস’ অ্যালবামে উঠে এসেছে বিপর্যয়-পরবর্তী পৃথিবী, পরিবেশ ধ্বংস এবং করপোরেট লোভের পরিণতি। রিখটার জানিয়েছেন, তাঁর অন্যান্য কাজের তুলনায় এই অ্যালবামের সংগীতে রঙের ব্যবহার বেশি। এর পেছনে লেখিকা মার্গারেট অ্যাটউডের লেখার বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে।
অ্যালবামে পানির শব্দ, গুলির আওয়াজসহ বিভিন্ন কৃত্রিম ও ধারণ করা শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এসব শব্দ এক অচেনা ও বিপজ্জনক পৃথিবীর অনুভূতি তৈরি করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রিখটারের নিজস্ব সংগীতবোধই প্রাধান্য পায়। পিয়ানো, তারযন্ত্র এবং গির্জার প্রার্থনাসংগীতের মতো কোরাস কখনো কখনো ভৌতিক আবহের সুরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এগোয়। এসবের মধ্য দিয়ে যেন ইঙ্গিত পাওয়া যায়, শেষ পর্যন্ত ভালো কিছু টিকে থাকবে।
ফলে অ্যালবামের ধ্বংসাত্মক ও হতাশাব্যঞ্জক বিষয়বস্তু প্রথমে শ্রোতাকে অস্বস্তিতে ফেললেও শেষ পর্যন্ত একধরনের সান্ত্বনা দেয়।
রিখটারের সংগীতের একটি বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এটাই। তিনি অশুভ বা ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরার চেয়ে তার বিকল্প কোনো সম্ভাবনার কথা ভাবতে পছন্দ করেন।
তাঁর ভাষায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে মানুষ এখন নেতিবাচক খবর, ছবি ও গল্পে ডুবে আছে। তিনি বরং সেসব বিষয়কে উদ্যাপন করতে চান, যেগুলো এর বিপরীত। মানুষের এমন কিছু সাধারণ গুণাবলি রয়েছে, যা চিরকাল আমাদের সঙ্গে ছিল এবং ভবিষ্যতেও থাকবে, অথচ সহজেই আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।
চারদিকে যখন বিপর্যয়ের স্রোত, তখন ম্যাক্স রিখটারের সংগীত যেন শ্রোতাদের জন্য ভেসে থাকা একটি ভেলা। তাঁর বিপুল চাহিদার রহস্য সম্ভবত এখানেই।












