যুদ্ধ শেষ হয়েছে পাঁচ দশকেরও বেশি সময় আগে। কিন্তু সেই যুদ্ধের ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে ভিয়েতনাম। যুদ্ধে নিহত হাজার হাজার মানুষের দেহাবশেষ কোথায় রয়েছে, তা আজও অজানা। এবার নিখোঁজ যোদ্ধাদের খুঁজে বের করতে দেশজুড়ে ৫০০ দিনের বিশেষ অভিযান শুরু করেছে ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট সরকার। লক্ষ্য অন্তত ৭ হাজার যোদ্ধার দেহাবশেষ উদ্ধার করা। তবে এই উদ্যোগ নতুন করে একটি পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনেছে—যুদ্ধের নিহতদের স্মরণে কি শুধু বিজয়ী পক্ষের যোদ্ধারাই মর্যাদা পাবেন?
গত মার্চে শুরু হওয়া এই অভিযানে দেশের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্র ও গণকবর খুঁজে দেখা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সাবেক রাজধানী সায়গন, বর্তমান হো চি মিন সিটির একটি পার্কে ব্যাপক খননকাজ চালানো হয়েছে। সেখানে ইতিমধ্যে ৭০০টির বেশি মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে।
একসময় ওই এলাকায় ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল। ১৯৬৮ সালের টেট অভিযানের সময় উত্তর ভিয়েতনামের বাহিনী দক্ষিণের বিভিন্ন এলাকায় আক্রমণ চালায়। পাল্টা হামলা চালায় দক্ষিণ ভিয়েতনামের সেনাবাহিনী ও তাদের মার্কিন মিত্ররা। সংঘর্ষে সেনা, গেরিলা যোদ্ধা ও সাধারণ মানুষ নিহত হন। অনেকের মরদেহ পরিবারের কাছে পৌঁছায়নি। তাঁদের অনেককেই গণকবরে সমাহিত করা হয়েছিল।
পার্কের মাটির নিচে যুদ্ধের স্মৃতি

হো চি মিন সিটির লে থি রিয়েং পার্কে এখনো চলছে দেহাবশেষ উদ্ধারের কাজ। একসময় এটি ছিল সমাধিক্ষেত্র ও যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত এলাকা। পরে সেখানে শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। বর্তমানে পার্কটির বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট ভিয়েতনামের পতাকা পুঁতে খননকাজ চালাচ্ছেন সেনাসদস্যরা।
খননকাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা। তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন যুদ্ধফেরত অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাও। ভিয়েতকং গেরিলা বাহিনীর সাবেক যোদ্ধা ও চিকিৎসক ডা. ত্রান ভ্যান বানও উদ্ধারকাজে সহায়তা করছেন।
১৯৮০-এর দশকে পার্কটি নির্মাণের সময়ও তিনি সেখানে কয়েকটি অচিহ্নিত কবর শনাক্ত করতে সহায়তা করেছিলেন। তখন ১৬টি মরদেহ পাওয়া গিয়েছিল। সেগুলোর অনেকটাই অক্ষত ছিল।
এবারের অভিযানে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি দেহাবশেষ পাওয়া যাচ্ছে। ডা. বান বলেছেন, এত বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো মাটির নিচে পড়ে আছেন, তা তিনি কল্পনাও করেননি।
যুদ্ধের সময় ১৯৬৮ সালে তাঁর পরিবারকে জানানো হয়েছিল যে তিনি মারা গেছেন। দক্ষিণে নিজের ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় তাঁর বেঁচে থাকার খবর পরিবার পায়নি। ১৯৭৬ সালে হ্যানয়ের উত্তরের নিজ গ্রামে ফিরে যাওয়ার পর সবাই জানতে পারে তিনি জীবিত।
তাঁর গ্রামের ২৯ জন যুদ্ধে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ২৬ জন আর ফিরে আসেননি। ডা. বান বলেন, এই হারানোর বেদনা তিনি সারা জীবন বয়ে বেড়িয়েছেন।
বিজয়ীদের জন্যই কি স্মরণ অভিযান?
ভিয়েতনাম সরকারের এই উদ্যোগের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো, অভিযানের মূল লক্ষ্য উত্তর ভিয়েতনামের পক্ষে যুদ্ধ করা যোদ্ধাদের খুঁজে বের করা। দক্ষিণ ভিয়েতনামের সাবেক সেনাসদস্যদের দেহাবশেষ শনাক্ত ও স্মরণ করার বিষয়টি এতে গুরুত্ব পাচ্ছে না।

যুদ্ধের পর থেকে দেশটির সরকার দক্ষিণ ভিয়েতনামের সাবেক সামরিক বাহিনীর স্মৃতিচিহ্ন ও স্মৃতিসৌধের অনেকগুলো ধ্বংস করেছে কিংবা অবহেলায় পড়ে থাকতে দিয়েছে। ফলে নতুন এই অভিযানকে অনেকে জাতীয় পুনর্মিলনের সুযোগ হিসেবে দেখলেও, এর সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
লে থি রিয়েং পার্কের উদ্ধার করা দেহাবশেষের মধ্যে উত্তর ভিয়েতনামের সেনা ও ভিয়েতকং যোদ্ধাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দুজন সাংবাদিকের মরদেহও থাকতে পারে বলে বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এমনকি দুই পক্ষের যোদ্ধাদের একই গণকবরে সমাহিত করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
কিন্তু সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা এই বিষয়টিকে বিস্তৃত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে আগ্রহী নন। সেনাবাহিনীর একটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত নিবন্ধে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সাবেক সেনাদের সঙ্গে উত্তর ভিয়েতনামের যোদ্ধাদের সমান মর্যাদা দেওয়ার দাবিকে ইতিহাস নতুন করে লেখার চেষ্টা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
উদ্ধারকাজের দায়িত্বে থাকা লেফটেন্যান্ট কর্নেল লে নগক হা বলেছেন, তাঁদের বিবেচনায় উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা সবাই মুক্তিবাহিনীর যোদ্ধা। তবে অন্য পরিচয়ের মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া গেলে তাঁদের কী করা হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অক্টোবরের শুরুতে পার্কটিতে উদ্ধার হওয়া ৭৩১ জনের দেহাবশেষ নিয়ে স্মরণানুষ্ঠান আয়োজন করে সরকার। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। তবে ওই সময় পর্যন্ত মাত্র একজনের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। যাঁদের শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, তাঁদের দেহাবশেষ নম্বরযুক্ত বাদামি কফিনে রাখা হয়। প্রতিটি কফিনে বিছিয়ে দেওয়া হয় ভিয়েতনামের লাল পতাকা।
অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। সেখানে প্রার্থনা, গান, বক্তব্য ও ধূপ জ্বালানোর মাধ্যমে তাঁদের স্মরণ করা হয়।

জাতীয় পুনর্মিলনের কঠিন প্রশ্ন
ভিয়েতনামে যুদ্ধের স্মৃতি এখনো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। উত্তর ও দক্ষিণের মানুষের মধ্যে যুদ্ধের সময়কার নির্যাতন, প্রাণহানি এবং যুদ্ধ-পরবর্তী অভিজ্ঞতা নিয়ে কখনোই পূর্ণাঙ্গ আলোচনা হয়নি। ফলে অতীতের কবর খোঁড়ার পাশাপাশি পুরোনো ক্ষোভ ও বিভাজনও নতুন করে সামনে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।
স্থানীয় একটি গির্জার ক্যাথলিক ধর্মযাজক ডমিনিক ত্রান মনে করেন, দেহাবশেষ উদ্ধারের উদ্যোগ অতীতকে নতুন করে বোঝার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে এটি মানুষের মধ্যে পুরোনো বিদ্বেষও উসকে দিতে পারে।
অন্যদিকে, যুদ্ধের সময়কার বিভাজন পেছনে ফেলে এগিয়ে যেতে চান অনেক স্থানীয় বাসিন্দা। পার্কের পাশে একটি কফির দোকানের মালিক নগুয়েন থান হিউ বলেন, মৃতদের মধ্যে কোনো শত্রু নেই। ক্ষত সারাতে হলে প্রত্যেক ভিয়েতনামিকে মর্যাদা দিতে হবে।

দেশটির বর্তমান নেতৃত্বও প্রবাসী ভিয়েতনামিদের, বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে এমন মানুষদের দেশে ফিরে উন্নয়নে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু অতীতের নিহতদের স্মরণে একই ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থান এখনো স্পষ্ট নয়।
ডা. বান মনে করেন, যুদ্ধের শিকারদের পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। তাঁর ভাষায়, যুদ্ধ কাউকেই রেহাই দেয়নি। যাঁরাই মারা গেছেন, তাঁরা সবাই ভিয়েতনামের মানুষ।
তাঁর মতে, এক পক্ষের প্রতি আরেক পক্ষের ঘৃণা ধরে রাখলে জাতীয় পুনর্মিলন ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
৫০০ দিনের এই অভিযান তাই শুধু নিখোঁজ মানুষের দেহাবশেষ উদ্ধারের কর্মসূচি নয়। এটি ভিয়েতনামের সামনে যুদ্ধের ইতিহাস, জাতীয় স্মৃতি এবং দুই পক্ষের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিভাজন কাটিয়ে ওঠার একটি কঠিন পরীক্ষাও হয়ে উঠেছে।












