জেফ্রি এপস্টিন কেলেঙ্কারির কেন্দ্রীয় ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া রবার্টস জিউফ্রে—যাকে এপস্টিন ডাকতেন “নাম্বার ওয়ান”— তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত আত্মজীবনী ‘নোবডিস গার্ল’ পাঠকদের সামনে এনেছে যৌন নিপীড়ন, ক্ষমতার অপব্যবহার ও আত্মমর্যাদার ভয়ানক লড়াইয়ের এক মর্মান্তিক দলিল।
আত্মহত্যার আগে লেখা এক বেদনাময় কণ্ঠ
৪১ বছর বয়সে অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের এক প্রত্যন্ত খামারে আত্মহত্যা করেন জিউফ্রে। মৃত্যুর আগেই তিনি লিখেছিলেন, “আমি হয়তো টিকে থাকিনি, কিন্তু আমার বোনেরা—‘সারভাইভার সিস্টারস’—আমার কণ্ঠ বয়ে নিয়ে যাবে।”
আত্মজীবনীর প্রকাশ-পর্বেই স্পষ্ট হয় যে এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রকাশিত তথ্যে রাজনীতি নয়, বরং ব্যক্তিগত বেদনা ও নির্যাতনের ইতিহাসই মুখ্য।
পারিবারিক সহিংসতা ও অসম্পূর্ণ সংশোধন
জীবনের শেষদিকে তিনি জানান, স্বামী, রবি জিউফ্রের হাতে তিনি ঘন ঘন গার্হস্থ্য সহিংসতার শিকার হয়েছেন। তিন সন্তানের হেফাজত নিয়ে চলছিল আদালতীয় লড়াই। আত্মজীবনীতে যাকে তিনি একসময় “উদ্ধারকর্তা” বলেছিলেন, মৃত্যুর আগে তাঁর সেই ধারণা বদলে গিয়েছিল।
বইয়ের সহলেখক সাংবাদিক অ্যামি ওয়ালেস এ অংশটি প্রাককথনে ব্যাখ্যা করেছেন, তবে মূল পাণ্ডুলিপি অপরিবর্তিত রেখেছেন।
শৈশব থেকেই নির্যাতনের শিকার
জিউফ্রে অকপটে লিখেছেন, তাঁর বাবা স্কাই রবার্টস শৈশবে তাঁকে যৌন নির্যাতন করতেন এবং বন্ধুবান্ধবদের কাছেও ‘বেচে দিতেন’। বয়স তখন মাত্র ৭ থেকে ১১। যদিও তাঁর বাবা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন, কিন্তু সহলেখক ওয়ালেস একাধিক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর বক্তব্য দিয়ে এই বর্ণনা সমর্থন করেছেন।
এ ঘটনায় জড়িত পারিবারিক বন্ধু পরবর্তীতে অন্য এক কিশোরীকে নির্যাতনের দায়ে দেড় বছর জেল খেটেছেন এবং ১০ বছর নিবন্ধিত যৌন অপরাধী ছিলেন।
এপস্টিনের অন্ধকার জগত ও ‘নোবডিস গার্ল’-এর ভেতরের ভয়
বইয়ের পরের অংশে উঠে এসেছে ‘লিটল সেন্ট জেমস আইল্যান্ড’-এর নরকসম বাস্তবতা—যেখানে অগণিত কিশোরীকে প্রভাবশালী পুরুষদের হাতে তুলে দেওয়া হতো।
এপস্টিনের সহযোগী ঘিসলেইন ম্যাক্সওয়েল, বর্তমানে টেক্সাসের এক নারীবন্দিশালায় ২০ বছরের সাজা ভোগ করছেন, বইটিতে এক ভয়ঙ্কর কিন্তু জটিল চরিত্র হিসেবে হাজির। একদিকে তিনি ছিলেন নির্যাতনের অংশীদার, অন্যদিকে কিছু মুহূর্তে মানবিকতার ভান।
প্রিন্স অ্যান্ড্রুর সঙ্গে জিউফ্রের কুখ্যাত ছবিটিও এখানে উঠে এসেছে—এপস্টিন নিজেই তুলেছিলেন সেই ফটোগ্রাফ। ২০২২ সালে অ্যান্ড্রু জিউফ্রের দায়ের করা ধর্ষণ মামলায় আপস করেন, যদিও কোনো অপরাধ স্বীকার করেননি।
শিশুকালের স্বপ্ন থেকে দুঃস্বপ্নের দিকে
১৯৮৩ সালে ফ্লোরিডার লক্সাহাচিতে জন্ম নেওয়া জিউফ্রে প্রাণীপ্রেমী এক মেয়ে ছিলেন—স্বপ্ন ছিল পশুচিকিৎসক হওয়ার। কিন্তু কৈশোরে তাঁর জীবন বদলে যায়। নির্যাতনের পর তাঁকে পাঠানো হয় “গ্রোয়িং টুগেদার” নামে এক ভয়ানক কেন্দ্রে, যেখানে তাঁকে জোর করে আত্মদোষ স্বীকার করানো হতো এবং একসময় তাঁকে নিজের বমি খেতেও বাধ্য করা হয়।
বড় হতে হতে তাঁর জীবনে ধর্ষণ পরিণত হয় “স্বাভাবিক” ঘটনায়—কখনো নির্মাণশ্রমিকের হাতে, কখনো দালালের হাতে, আবার কখনো ধনী ক্লায়েন্টের হাতে।
শেষে তিনি এসে পড়েন “মার-আ-লাগো”-তে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রাইভেট ক্লাবে, যেখানে তাঁর বাবা কাজ করতেন। সেখানে তোয়ালে বহনকারী হিসেবে কাজ শুরু করে তিনি ম্যাসেজের কাজে যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন দেখেন—যা পরে তাঁকে সরাসরি এপস্টিনের জালে টেনে আনে।
ভয়ানক বিবরণ ও অনামা ক্ষমতাধরদের ছায়া
বইটিতে এমন অনেক ঘটনার বিবরণ আছে, যা পাঠ করা কঠিন। জিউফ্রে বর্ণনা করেছেন — এমআইটি বিজ্ঞানী মারভিন মিনস্কির সঙ্গে যৌন সম্পর্কের কথা, যিনি তাঁর চেয়ে ৫৬ বছর বড়; মডেল স্কাউট জ্যঁ-লুক ব্রুনেলের আয়োজিত অর্গি, যিনি পরবর্তীতে এপস্টিনের মতোই জেলে আত্মহত্যা করেন; এবং এক প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী যিনি তাঁকে রক্তাক্ত করে দেন, যার নাম তিনি প্রকাশ করতে ভয় পেয়েছেন।
এক অমানবিক জগতেও মানবতার ছায়া
যত ভয়াবহ ঘটনাই তিনি বর্ণনা করুন না কেন, জিউফ্রে শেষ পর্যন্ত এপস্টিন সম্পর্কেও সহানুভূতির ইঙ্গিত দেন—তিনি মনে করেন, সম্ভবত শৈশবে এপস্টিনও নির্যাতনের শিকার ছিলেন।
এক সত্যিকারের আমেরিকান ট্র্যাজেডি
‘নোবডিস গার্ল’ কোনো রাজনৈতিক বই নয়—এটি এক নারীর অস্তিত্বের লড়াই, অপমানের পরও টিকে থাকার ইতিহাস। বইটি যেমন আত্মজৈবনিক, তেমনি সামাজিক দলিলও।
এপস্টিনপরবর্তী বিশ্বে ক্ষমতা, অর্থ ও যৌন শোষণের জটিল শৃঙ্খল উন্মোচনে সময় লাগবে, কিন্তু ভার্জিনিয়া জিউফ্রের গল্প ইতিমধ্যেই সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে উঠে আসা এক উজ্জ্বল মানবিক আর্তনাদ।
‘নোবডিস গার্ল’ পড়া মানে শুধু একটি নির্যাতিত নারীর স্মৃতিচারণ নয়—এটি আধুনিক সমাজের নৈতিক পতনের এক আয়না। প্রতিটি পৃষ্ঠায় বয়ে যায় এক নারীর অসীম বেদনা, কিন্তু সঙ্গে আছে তাঁর অবিচল সাহসের সাক্ষ্য।
# ভার্জিনিয়া_#জিউফ্রে,# জেফ্রি_#এপস্টিন,# ঘিসলেইন_#ম্যাক্সওয়েল, #যৌন_নির্যাতন, #আত্মজীবনী, #মার্কিন_সমাজ, সারাক্ষণ_রিপোর্ট












