জীবিতদের বাঁচাতে মৃতদের গণনা
অ্যান্ড্রু মোসেরাই সিয়েরা লিওনের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে হেঁটে, নৌকায় চড়ে, এমনকি কোমরসমান পানিতে নেমেও মানুষের মৃত্যুর কারণ খুঁজে বেড়ান। তাঁর এই অনুসন্ধান থেকে পাওয়া তথ্য অনেক মানুষের জীবন বাঁচাতে সাহায্য করছে।
সিয়েরা লিওনের বোন্থে জেলায় সেগবেলেহ নামে একটি গ্রাম রয়েছে। দেশটির শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানি এতটাই কমে যায় যে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তখন গ্রামটিতে পৌঁছানোর একমাত্র উপায় হলো হাঁটুসমান পানির মধ্য দিয়ে প্রায় ১০ মাইল পথ পাড়ি দেওয়া। নদীর ওপারে রয়েছে মাত্র দুটি বাড়ি এবং প্রায় ১৫ জন মানুষের বসবাস।
হেলদি সিয়েরা লিওন বা হিল-এসএলের মাঠপর্যায়ের তত্ত্বাবধায়ক ও প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে অ্যান্ড্রু মোসেরাইকে এমন দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়। তাঁর কাজ হলো দৈবচয়নের ভিত্তিতে বাছাই করা শত শত জনপদে বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারগুলোর কাছে একটি কঠিন প্রশ্ন করা—এই বাড়িতে কি কেউ মারা গেছেন?
উত্তর যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে শুরু হয় আরও কিছু প্রশ্ন। ওই ব্যক্তি প্রথম কখন অসুস্থ হয়েছিলেন? তাঁর কি জ্বর, কাশি কিংবা পেট ফুলে যাওয়ার মতো কোনো উপসর্গ ছিল? তাঁকে কী কী ওষুধ দেওয়া হয়েছিল? এরপর কী ঘটেছিল?
কিছু জনপদ অ্যান্ড্রুর বসবাসের শহর বো থেকে অল্প দূরে। বো সিয়েরা লিওনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। আবার কোনো কোনো এলাকায় পৌঁছাতে নৌকায় নয় ঘণ্টা লাগে। কোথাও মোটরসাইকেলে যাওয়ার পর কাদার মধ্য দিয়ে কয়েক মাইল হাঁটতে হয়।
অ্যান্ড্রু নিজেকে সিয়েরা লিওনের ‘স্বাস্থ্যযোদ্ধা’ বলে পরিচয় দেন। তাঁর কাজের বিবরণ শোনার পর আমার মনে হয়েছে, এই পরিচয় তাঁর জন্য যথার্থ।
মৃত্যুর হিসাব রাখা কেন জরুরি
যে সমস্যার প্রকৃত অবস্থা জানা নেই, তার সমাধান করাও কঠিন। কিন্তু আফ্রিকার অধিকাংশ মানুষের মৃত্যুর কোনো আনুষ্ঠানিক হিসাব রাখা হয় না। আর যেসব মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়, সেগুলোর ক্ষেত্রেও মৃত্যুর কারণ উল্লেখ থাকে না।

সম্প্রতি পর্যন্ত সিয়েরা লিওনের অবস্থাও ছিল এমন। ফলে দেশটিতে কত মানুষ মারা যাচ্ছেন এবং কেন মারা যাচ্ছেন, তা বোঝার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষকদের বিভিন্ন মডেল ও অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হতো। এসব অনুমান অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে মিলত না।
এই কারণেই আমাদের ফাউন্ডেশন ২০১৯ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকেই হিল-এসএলকে অর্থায়ন করে আসছে।
সংস্থাটির জরিপকারীরা এমন একটি পদ্ধতিতে কাজ করেন, যার নাম ‘ভারবাল অটোপসি’ বা মৌখিক ময়নাতদন্ত। এ পদ্ধতিতে কোনো মৃত ব্যক্তির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠজনের সঙ্গে বসে তাঁর অসুস্থতার পুরো ইতিহাস শোনা ও নথিভুক্ত করা হয়। প্রথম উপসর্গ দেখা দেওয়া থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত সব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। পরে দুজন চিকিৎসক এসব তথ্য পর্যালোচনা করে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নির্ধারণ করেন।
হিল-এসএলের প্রথম দেশব্যাপী জরিপে সিয়েরা লিওনের প্রায় ৩ লাখ ৪৩ হাজার মানুষের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে ৮ হাজারের বেশি মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত হয়। জরিপের তথ্য থেকে জানা যায়, দেশটিতে ছোট শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ ম্যালেরিয়া।
যেসব দেশে নির্ভরযোগ্য মৃত্যুর নথি নেই, সেখানে মানুষ কেন মারা যাচ্ছে তা জানার জন্য মৌখিক ময়নাতদন্ত প্রায়ই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত উপায়। এটি গবেষকদের প্রাথমিক ধারণা দেয়, যা পরবর্তী পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা যায়। একই সঙ্গে কোন বিষয়গুলো নিয়ে আরও গভীর অনুসন্ধান করা দরকার, সেটিও চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।
অবশ্য এই পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। একজন মা-বাবা জরিপকারীকে বলতে পারেন, তাঁদের সন্তানের জ্বর হয়েছিল। কিন্তু শুধু এই তথ্য থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না, কোন রোগে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে।
মৌখিক ময়নাতদন্তকে আরও নির্ভুল করার পাশাপাশি মৃত্যুর কারণ জানার জন্য আমাদের ফাউন্ডেশন আরও উন্নত পদ্ধতিতেও সহায়তা করছে। এর একটি উদাহরণ হলো সিএইচএএমপিএসের ব্যবহৃত সীমিত পরিসরের চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক ময়নাতদন্ত। এটি শিশু ও মাতৃমৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে কাজ করা একটি নজরদারি নেটওয়ার্ক, যার সিয়েরা লিওনেও একটি কার্যক্রম রয়েছে।
দুটি পদ্ধতি একসঙ্গে ব্যবহার করলেই সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। মৌখিক ময়নাতদন্তের মাধ্যমে একটি পুরো দেশের তথ্য সংগ্রহ করে বিশেষজ্ঞরা কোন প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন তা নির্ধারণ করতে পারেন। আর সীমিত পরিসরের ময়নাতদন্ত সেই প্রশ্নগুলোর আরও নির্ভুল উত্তর দিতে সাহায্য করে।
‘এই তথ্য আমার জীবনে কী পরিবর্তন আনবে?’
অ্যান্ড্রুর কর্মজীবনের শুরুর দিকে এক তরুণ তাঁর কাছে একটি প্রশ্ন করেছিলেন। ওই তরুণের স্ত্রী সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন। তিনি অ্যান্ড্রুকে বলেছিলেন, ‘আজ আমার খাবার জুটবে না। আগামীকাল খাবার পাব কি না, সেটাও জানি না। আপনি আমার জন্য কী করবেন? এই তথ্য আমার জীবনে কী পরিবর্তন আনবে?’

অ্যান্ড্রু স্বীকার করেন, তখন ওই প্রশ্নের ভালো কোনো উত্তর তাঁর কাছে ছিল না। তবে এখন তাঁর কাছে উত্তর রয়েছে।
হিল-এসএলের গবেষণার ফলাফল এবং অন্যান্য গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য সিয়েরা লিওনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বুঝতে সাহায্য করেছে, ম্যালেরিয়ায় দেশটির কত শিশু মারা যাচ্ছে।
২০২৪ সালে গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স, ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় দেশটি শিশুদের ম্যালেরিয়ার টিকা দেওয়া শুরু করে।
এখন অ্যান্ড্রু যখন কোনো জনপদে যান, তখন মায়েদের তাঁদের সন্তানদের টিকাদান কার্ড নিয়ে আসতে বলেন। কার্ডে ম্যালেরিয়ার টিকা দেখিয়ে তিনি বোঝান, হিল-এসএলের সংগৃহীত তথ্যই এই টিকার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে সাহায্য করেছে।
তিনি মায়েদের বলেন, অন্য মানুষেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও তথ্য ভাগ করে নিতে রাজি হয়েছিলেন বলেই তাঁদের সন্তানরা এখন ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে বাড়তি সুরক্ষা পাচ্ছে।
এই কাজের পেছনে অ্যান্ড্রুর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও রয়েছে।
কৈশোরে তাঁর স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। কিন্তু মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার সময় সিয়েরা লিওনে ইবোলা মহামারি ছড়িয়ে পড়ে। তিনি দেখেছেন, মানুষ কীভাবে অসুস্থ প্রতিবেশী ও পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে কর্তৃপক্ষকে জানাচ্ছিল।
শুরুতে বিষয়টি তাঁর কাছে বিশ্বাসঘাতকতার মতো মনে হয়েছিল। কিন্তু এখন অ্যান্ড্রু বুঝতে পারেন, মানুষগুলো শুধু নিজেদের রক্ষা করার জন্য নয়, বরং পুরো সম্প্রদায়কে নিরাপদ রাখার জন্যই এমনটি করছিলেন।
জনস্বাস্থ্যের মূল দর্শনও এটাই। শেষ পর্যন্ত এই বিষয়টিকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি।
এর কয়েক বছর পর, সিএইচএএমপিএসের হয়ে মৌখিক ময়নাতদন্তের কাজ করার সময় অ্যান্ড্রুর নিজের দুই বছর বয়সী এক চাচাতো ভাই মারা যায়। কোনো রোগ নির্ণয় ছাড়াই শিশুটি দুই মাস হাসপাতালে ছিল। মৃত্যুর পর সীমিত পরিসরের ময়নাতদন্তে জানা যায়, যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
যেসব পরিবার মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে কথা বলতে চায় না, তাদের কাছে অ্যান্ড্রু এই অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
তাঁর ভাষায়, ‘প্রমাণভিত্তিক তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
নতুন প্রজন্মকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন অ্যান্ড্রু

হিল-এসএলে তথ্য সংগ্রহকারী হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন অ্যান্ড্রু। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজের দক্ষতা ও কাজের প্রতি নিষ্ঠার কারণে সবার নজরে আসেন। প্রথমে দলের নেতৃত্ব দেন, পরে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পান।
এরপর তিনি সিয়েরা লিওনসহ পশ্চিম আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের জরিপকারীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।
তাঁর স্ত্রী ইশার মতে, অ্যান্ড্রুর প্রকৃত প্রতিভা শিক্ষকতায়। তাঁর প্রশিক্ষণ নেওয়া জরিপকারী আলিউ ফাতোরমা বলেন, ‘তিনি বিষয়গুলো খুব সহজভাবে বুঝিয়ে দেন।’
নতুন প্রশিক্ষণার্থীদের অ্যান্ড্রু দুটি প্রশ্ন করেন—আপনি কে এবং আপনার দায়িত্ব কী?
নিজেই এর উত্তর দেন তিনি। বলেন, আপনারা জরিপকারী। আপনাদের কাজ মানুষের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তা নথিভুক্ত করা। কাউকে বিচার করা কিংবা রোগ নির্ণয় করা আপনাদের কাজ নয়।
মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য ছোট ছোট বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন অ্যান্ড্রু। তিনি বলেন, ‘তারা যা খায়, আমরাও তা খাই। তারা যেখানে ঘুমায়, আমরাও সেখানে ঘুমাই। তারা জুতা খুলে রাখলে আমরাও নিজেদের জুতা খুলে রাখি।’
হিল-এসএল দলের একটি স্লোগান রয়েছে—‘জীবিতরা যেন বেঁচে থাকতে পারে, সে জন্যই আমরা মৃত্যুর হিসাব রাখি।’
অ্যান্ড্রুর কাজের এর চেয়ে ভালো বর্ণনা আর হতে পারে না।













