পঞ্চদশ শতকের ইউরোপীয় শিল্পকলার কথা উঠলে সাধারণত আমাদের মনে পড়ে ইতালির লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, জেনতিলে বেল্লিনি কিংবা সান্দ্রো বত্তিচেল্লির নাম। তাঁদের শিল্পকর্মে মানুষের মনস্তত্ত্ব, বাস্তবতার সূক্ষ্ম উপস্থাপন, দৃষ্টিকোণের দক্ষ ব্যবহার এবং কল্পনার অসাধারণ প্রকাশ রেনেসাঁর পরিচিত রূপ তৈরি করেছে। কিন্তু ইউরোপের উত্তর প্রান্তে, সুইডেনের মেলারেন হ্রদের আশপাশে, একই সময়ে আরেক শিল্পী সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে শিল্পকলার জগতে নিজের অবস্থান তৈরি করছিলেন। তাঁর নাম আলবার্টুস পিক্টর। গির্জার দেয়াল ও ছাদে আঁকা তাঁর অসংখ্য চিত্র শুধু ধর্মীয় কাহিনি তুলে ধরেনি, বরং পঞ্চদশ শতকের সুইডিশ সমাজের জীবনযাত্রা, পোশাক, বিশ্বাস, ভয় এবং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার এক জীবন্ত দলিল হয়ে উঠেছে।
পিক্টরের কাজের বিশেষত্ব এখানেই। তিনি ধর্মীয় শিল্পকে সাধারণ মানুষের পরিচিত জগতের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। তাঁর ছবিতে বাইবেলের চরিত্রদের পাশাপাশি দেখা যায় কৃষক, অভিজাত, সংগীতশিল্পী, শ্রমজীবী মানুষ এবং সমকালীন সমাজের নানা পরিচিত অনুষঙ্গ। ফলে তাঁর শিল্পকর্মের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, রেনেসাঁ কেবল ইতালিতে জন্ম নেওয়া কোনো শিল্পধারা ছিল না, যা পরে ইউরোপের অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। উত্তর ইউরোপেও নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বাস্তবতার ভিত্তিতে শিল্পকলার নবজাগরণ ঘটছিল।
জার্মান প্রভাবের মধ্যে বেড়ে ওঠা
চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকের সুইডেনকে অনেক সময় ‘জার্মান শতক’ বলে বর্ণনা করা হয়। এর পেছনে ছিল বাল্টিক অঞ্চল ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ায় জার্মান অভিবাসন, বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক প্রভাবের বিস্তার। হ্যানসিয়াটিক বাণিজ্য জোটের শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সুইডেনের নগরজীবন, স্থাপত্য, আইন, প্রশাসন এবং শিল্পকলায় জার্মান প্রভাব গভীর হয়েছিল।
আলবার্টুস পিক্টর এই সাংস্কৃতিক পরিবেশেই বেড়ে ওঠেন। তবে তাঁর জন্মস্থান ও পারিবারিক পরিচয় নিয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায় না। ধারণা করা হয়, তিনি ১৪৪০ সালের কাছাকাছি জন্মেছিলেন। দীর্ঘদিন গবেষকদের একটি অংশ মনে করতেন, তাঁর জন্ম জার্মানির হেসে অঞ্চলের ইমেনহাউজেনে। তাঁর কয়েকটি চিত্রের নিচে ‘আলবার্টুস ইমেনহাউজেন’ লেখা পাওয়া গেছে। তবে এটি তাঁর পারিবারিক পদবি, নাকি জার্মান বংশোদ্ভূত হওয়ার পরিচয়, তা নিশ্চিত নয়।
তিনি জার্মান অভিবাসীদের বংশধর হতে পারেন, সুইডিশ ও জার্মান পরিবারের মিশ্র উত্তরসূরি হতে পারেন, আবার পুরোপুরি সুইডিশও হতে পারেন। জার্মানিতে তাঁর কোনো নিশ্চিত চিত্রকর্ম বা সংশ্লিষ্ট নথি পাওয়া যায়নি। তাই তাঁর জাতিগত পরিচয়ের চেয়ে সুইডেনের শিল্পজগতে তাঁর ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
শিল্পী থেকে সফল ব্যবসায়ী
পিক্টরের জীবন সম্পর্কে প্রথম লিখিত তথ্য পাওয়া যায় সুইডেনের আরবোগা শহরে। ১৪৬৫ সালের নথিতে তাঁকে স্বাধীন নাগরিক এবং শিল্পীদের গিল্ডের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, তিনি শুধু দক্ষ শিল্পীই ছিলেন না, ব্যবসা পরিচালনায়ও যথেষ্ট বিচক্ষণ ছিলেন।
১৪৭৩ সালে তিনি আনা নামের এক বিধবাকে বিয়ে করেন। আনার আগের স্বামী জোহানও ছিলেন চিত্রশিল্পী। তাঁর মৃত্যুর পর পিক্টর স্টকহোমের পুরোনো শহর গামলা স্তানের কর্মশালার দায়িত্ব নেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পীজীবন আরও বিস্তৃত হয়।
তৎকালীন ইতালির অনেক শিল্পীর মতো পিক্টরও একাধিক কারুশিল্পে দক্ষতা অর্জন করেছিলেন। গ্রীষ্মকালে তিনি কর্মশালার সহকারীদের নিয়ে বিভিন্ন গির্জায় ছবি আঁকতেন। শীতকালে স্টকহোমে পরিচালনা করতেন সূচিকর্মের ব্যবসা। বিশেষ করে মুক্তা, মূল্যবান পাথর এবং সোনালি সুতা ব্যবহার করে ধর্মীয় পোশাক ও উপাসনালয়ের সামগ্রী তৈরিতে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল।
তিনি যেসব সামগ্রী তৈরি করতেন, তার মধ্যে ছিল পুরোহিতদের বিশেষ পোশাক, গির্জার আনুষ্ঠানিক চাদর, বেদির কাপড়, পতাকা ও অন্যান্য অলংকার। সংস্কার আন্দোলনের আগের সুইডেনে এসব সামগ্রীর চাহিদা ছিল যথেষ্ট। ফলে তাঁর ব্যবসা দ্রুত সমৃদ্ধ হয়।
জীবনের শেষ দিকে পিক্টর সুইডেনের অন্য কারুশিল্পীদের তুলনায় বেশি কর দিতেন। স্টকহোমের গামলা স্তানের নরপোর্ট এলাকায় তাঁর দুটি গুদামও ছিল। একজন শিল্পীর পাশাপাশি সফল উদ্যোক্তা হিসেবেও তিনি নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
গির্জার দেয়ালে সাধারণ মানুষের জীবন
প্রায় তিন দশকের কর্মজীবনে পিক্টর মেলারেন উপত্যকা এবং আশপাশের অঞ্চলের ৩৫ থেকে ৩৭টি গির্জা ও ধর্মীয় স্থাপনার দেয়াল ও ছাদে ছবি এঁকেছিলেন। বর্তমান সুইডেনের ভেস্টমানল্যান্ড, সোডারমানল্যান্ড এবং উপ্পসালা অঞ্চলের বিভিন্ন গির্জায় তাঁর কাজের সন্ধান পাওয়া যায়। তাঁর কর্মশালার সদস্যরা আরও উত্তরে লুলেও অঞ্চলের কাছাকাছি গামেলস্টাড পর্যন্ত গিয়েছিলেন। ১৪৯০-এর দশকে সেখানকার নেদারলুলেও গির্জার চিত্রসজ্জাতেও তাঁদের অংশগ্রহণ ছিল।
পিক্টরের কাজের পদ্ধতিও ছিল তাঁর পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইতালিতে অনেক শিল্পী ভেজা প্লাস্টারের ওপর রং প্রয়োগের পদ্ধতি ব্যবহার করতেন, যা বুয়োন ফ্রেস্কো নামে পরিচিত। কিন্তু পিক্টর বেশি ব্যবহার করতেন শুকনো চুনের প্রলেপের ওপর রং করার আল সেক্কো পদ্ধতি এবং বিভিন্ন ছাঁচের সাহায্যে নকশা আঁকার কৌশল। এতে তুলনামূলক কম সময়ে বড় পরিসরের কাজ করা সম্ভব হতো। উত্তর ইউরোপের সংক্ষিপ্ত গ্রীষ্মকালীন সময়ে গির্জার কাজ শেষ করার জন্য এই পদ্ধতি ছিল কার্যকর।
তাঁর শিল্পের উৎসও ছিল বিচিত্র। মধ্যযুগের ধর্মীয় চিত্রসংকলন, মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে লেখা গ্রন্থ এবং সমকালীন জার্মান শিল্পীদের কাজ থেকে তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। তবে পুরোনো ধর্মীয় চিত্রের কঠোর ও স্থির উপস্থাপনায় তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাঁর ছবিতে চরিত্রগুলোকে দেখা যায় বেশি গতিশীল, মানবিক এবং আবেগপূর্ণ অবস্থায়। আলো, ছায়া ও রঙের ব্যবহারে তিনি ধর্মীয় কাহিনিগুলোকে মানুষের কাছে আরও জীবন্ত করে তুলেছিলেন।
বিশেষ করে বাইবেলের কাহিনি আঁকার সময় তিনি নিজের সময়ের মানুষ ও পরিবেশকে ছবির মধ্যে নিয়ে আসতেন। ফলে তাঁর কাজের মধ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সমকালীন সুইডিশ সমাজের একটি স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি তৈরি হয়েছে।
পোশাক, সামাজিক শ্রেণি ও মানুষের মনস্তত্ত্ব
পিক্টরের চিত্রকর্মের দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকালে পঞ্চদশ শতকের সুইডেনের সামাজিক জীবন সম্পর্কে অনেক কিছু জানা যায়। অভিজাত নারীদের পোশাকের নকশা, কৃষকের হাতে কাঠের লাঠি, সাধারণ মানুষের মুখের উদ্বেগ কিংবা ধর্মীয় বিচারের ভয়—সবকিছুই তিনি নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন।
তাঁর ছবিতে সামাজিক শ্রেণির পার্থক্যও স্পষ্ট। অভিজাতদের গায়ে দেখা যায় পশমের অলংকারযুক্ত দীর্ঘ পোশাক, কৃষকদের পরনে সাধারণ জামা। আবার যিশুর মা মেরিকে তিনি দামি রেশমি বস্ত্রে উপস্থাপন করেছেন। মানুষের পেশা, আর্থিক অবস্থান, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী চরিত্রগুলোর মধ্যে পার্থক্য তৈরি করেছেন।
পোশাকের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। নারীদের পোশাকের ভাঁজ, পুরুষদের চুলের ধরন কিংবা মাথায় ব্যবহৃত টুপির নানা রূপ তাঁর ছবিতে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে আঁকা ছবির তুলনা করলে সুইডিশ সমাজে পোশাকের রুচি ও ফ্যাশনের পরিবর্তনও শনাক্ত করা সম্ভব। বিশেষ করে নানা আকার ও রঙের টুপি তাঁর চিত্রকর্মের একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
তবে পিক্টরের শিল্প কেবল বাস্তব জীবনের গম্ভীর চিত্রায়ণে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর ছবিতে হাস্যরস এবং সূক্ষ্ম ব্যঙ্গেরও উপস্থিতি রয়েছে। অসৎ বা ধর্মবিমুখ চরিত্রদের অনেক সময় অপরিচ্ছন্ন চেহারা ও অস্বাভাবিক দাড়িগোঁফ দিয়ে তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে লালচে রঙের শয়তানদের দেখা যায় বড় দাঁত বের করে হাসতে, যেন তারা সাধুদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।
অচেনা প্রাণী আঁকার ক্ষেত্রে অবশ্য তাঁর দক্ষতা সব সময় সমান ছিল না। তাঁর ছবির সিংহকে অনেক সময় বানর বা ভালুকের মতো দেখায়। আবার নবী ইউনুসকে গিলে ফেলা তিমির আকৃতিও বাস্তবের তিমির চেয়ে বড় দাঁতওয়ালা কুকুরের সঙ্গে বেশি মেলে।
সংগীত ছিল তাঁর চিত্রকর্মের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। ব্যাগপাইপ, বীণা, ঢোল ও হার্পের মতো বাদ্যযন্ত্রের উপস্থিতি দেখা যায় পৃথিবী ও নরক—উভয় জগতের দৃশ্যে। তাঁর আঁকা দেবদূতদেরও সংগীত পরিবেশন করতে দেখা যায়। হারনেভি গির্জার একটি ছবিতে হাস্যোজ্জ্বল একটি শূকরকে অর্গান বাজাতে দেখা যায়। এই অদ্ভুত দৃশ্যের মধ্য দিয়ে তিনি কী ধরনের নৈতিক ব্যঙ্গ করতে চেয়েছিলেন, তা নিয়ে নিশ্চিত ব্যাখ্যা নেই।
এসব বিচিত্র উপাদানকে একসূত্রে বেঁধেছে তাঁর আঁকা ফুল, লতাপাতা ও চিরসবুজ গাছের নকশা। ছাঁচ ব্যবহার করে তৈরি এসব অলংকরণ গির্জার স্থাপত্যের সঙ্গে চিত্রকর্মের সামগ্রিক সম্পর্ক তৈরি করেছে।
মৃত্যুর সঙ্গে দাবার লড়াই
পিক্টরের সবচেয়ে বিখ্যাত কাজগুলোর একটি হলো ‘মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলা’। ১৪৮০-এর দশকে স্টকহোমের প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তরে টেবি গির্জার ছাদে তিনি ছবিটি আঁকেন।
ছবিতে সবুজ পোশাক পরা এক নাইটের সামনে বসে আছে হলুদাভ রঙের একটি কঙ্কাল, যা মৃত্যুর প্রতীক। কঙ্কালটি হাসিমুখে দাবার বোর্ডে নিজের চাল দিচ্ছে। বিপরীতে নাইটের মুখে রয়েছে অসহায়ত্ব। সে যেন আরও কিছু সময় পাওয়ার আশায় অপেক্ষা করছে।
পঞ্চদশ শতকের জার্মানি ও ফ্রান্সে জনপ্রিয় মৃত্যুনৃত্য বা ডান্স ম্যাকাব্র ধারার সঙ্গে এই ছবির বিষয়বস্তুর মিল রয়েছে। ওই ধারার শিল্পকর্মে মৃত্যু কীভাবে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা নির্বিশেষে সবাইকে গ্রাস করে, তা তুলে ধরা হতো। পিক্টরের ছবিতেও একই সত্য প্রকাশ পেয়েছে।
দাবার বোর্ড এখানে মানুষের নিয়ন্ত্রণ ও কৌশলের সীমাবদ্ধতার প্রতীক। জীবনে মানুষ যতই পরিকল্পনা করুক, যত দক্ষতার সঙ্গেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করুক, মৃত্যুর অনিবার্য পরিণতি এড়ানোর কোনো উপায় নেই। ছবির ওপরে একসময় সুইডিশ ভাষায় লেখা ছিল, ‘আমি তোমাকে কিস্তিমাত করেছি।’ সময়ের সঙ্গে লেখাটি অনেকটাই মুছে গেছে।
এই চিত্রকর্মের প্রভাব অবশ্য মধ্যযুগীয় গির্জার সীমানায় আটকে থাকেনি। চার শতাব্দীরও বেশি সময় পর সুইডিশ চলচ্চিত্র নির্মাতা ইংমার বার্গমানের কল্পনায় এটি নতুন জীবন পায়।
লুথেরান ধর্মযাজকের সন্তান বার্গমান ছোটবেলায় তাঁর বাবার সঙ্গে উপ্পসালা অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামীণ গির্জায় যেতেন। সেখানে পিক্টরের আঁকা ছবিগুলো তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিশেষ করে মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলার দৃশ্যটি তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে।
১৯৫৭ সালে মুক্তি পাওয়া বার্গমানের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দ্য সেভেন্থ সিল’-এ এই ধারণা নতুনভাবে উপস্থাপিত হয়। ছবিতে ক্রুসেড থেকে দেশে ফেরা এক নাইট নিজের জীবন বাঁচানোর আশায় মৃত্যুর প্রতীক কালো পোশাক পরা এক চরিত্রের সঙ্গে দাবা খেলতে বসে। সমুদ্রতীরের সেই দৃশ্য পরবর্তী সময়ে ইউরোপীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্যে পরিণত হয়।
নিজের ছবিতেই শিল্পীর স্মৃতি
পিক্টর নিজের কাজের মধ্যেই নিজের পরিচয় রেখে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। লিড গির্জার একটি চিত্রে তাঁকে হাঁটু গেড়ে প্রার্থনারত অবস্থায় দেখা যায়। তাঁর পরনে রয়েছে সে সময়ের ফ্যাশন অনুযায়ী লম্বা ও সরু অগ্রভাগের জুতা, যা পোলেইন নামে পরিচিত ছিল। ছবির ওপরে লেখা, ‘আমাকে স্মরণ রেখো, আমি এই গির্জার চিত্রশিল্পী আলবার্টুস।’
তাঁর জীবনের শেষ দিকের তথ্য অবশ্য অনেক বেশি সাধারণ। ১৫০৯ সালে স্টকহোমের স্টোরকির্কান গির্জায় একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রার্থনায় অর্গান বাজানোর জন্য তাঁকে অর্থ দেওয়ার একটি রসিদ পাওয়া যায়। এরপর আর কোনো নথিতে তাঁর নাম নেই। ধারণা করা হয়, ওই বছরই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
রেনেসাঁর আরেকটি মানচিত্র
আলবার্টুস পিক্টরের শিল্পকর্মকে ইতালীয় রেনেসাঁর প্রচলিত মানদণ্ডে বিচার করলে তাঁর সীমাবদ্ধতা চোখে পড়তে পারে। তাঁর ছবিতে লিওনার্দোর মতো শারীরিক গঠনের নিখুঁত বিশ্লেষণ কিংবা বত্তিচেল্লির মতো আদর্শায়িত সৌন্দর্য নেই। তিনি প্রাচীন গ্রিক-রোমান শিল্পের অনুসরণেও নিজেকে নিয়োজিত করেননি। মধ্যযুগীয় গথিক শিল্পের ঐতিহ্যই ছিল তাঁর প্রধান ভিত্তি।
কিন্তু এই পার্থক্যই তাঁর শিল্পের গুরুত্ব নির্ধারণ করে। তিনি পুরোনো ঐতিহ্যকে পরিত্যাগ না করে তার ভেতর থেকেই নতুন প্রকাশভঙ্গি তৈরি করেছিলেন। তাঁর চিত্রকর্ম ছিল গির্জার স্থাপত্যের সঙ্গে যুক্ত, সাধারণ মানুষের জন্য নির্মিত এবং ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক অভিজ্ঞতা তুলে ধরার মাধ্যম।
তাঁর ছবিতে মানুষের শরীর, মুখের অভিব্যক্তি, চলাফেরা, প্রকৃতি এবং দৈনন্দিন আচরণের প্রতি যে মনোযোগ দেখা যায়, তা পরবর্তী সময়ের উত্তর ইউরোপীয় শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলে যায়। এই অর্থে তিনি ইতালীয় রেনেসাঁর অনুকরণকারী ছিলেন না; বরং নিজের অঞ্চলের সংস্কৃতি ও বাস্তবতা থেকে একটি স্বতন্ত্র শিল্পভাষা তৈরি করেছিলেন।
পিক্টরের গির্জার দেয়ালগুলো তাই শুধু ধর্মীয় কাহিনির ভান্ডার নয়। সেগুলোতে সংরক্ষিত আছে এমন এক সময়ের মানুষের পোশাক, সামাজিক সম্পর্ক, বিনোদন, ভয়, বিশ্বাস এবং মৃত্যুচিন্তা, যাদের দৈনন্দিন জীবন সম্পর্কে অন্য কোনো মাধ্যমে এত ঘনিষ্ঠ ধারণা পাওয়া কঠিন। তাঁর শিল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইউরোপের নবজাগরণকে শুধু ইতালির কয়েকজন মহান শিল্পীর কীর্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখা যায় না। স্ক্যান্ডিনেভিয়ার মতো দূরবর্তী অঞ্চলও নিজস্ব সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সেই বৃহত্তর পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল।












