ইরানকে ঘিরে আবারও সামরিক অভিযানের সাফাই গাইছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সাম্প্রতিক ভাষণ ও প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দাবি করা হচ্ছে, ইরান নাকি নতুন করে পরমাণু কর্মসূচি শুরু করেছে, কয়েক দিনের মধ্যেই বোমা তৈরির উপকরণ হাতে পেতে পারে এবং এমন ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে যা অচিরেই যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম হবে। তবে মার্কিন ও ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন, গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু পর্যবেক্ষকদের তথ্য বলছে, এসব দাবির বড় অংশই প্রমাণহীন বা অতিরঞ্জিত।
ক্ষেপণাস্ত্র হুমকি কতটা বাস্তব
ইরানের হাতে প্রায় দুই হাজার স্বল্প ও মধ্যপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। গত বছরের হামলার পরও তারা এই ভাণ্ডার অনেকটাই পুনর্গঠন করেছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানতে সক্ষম। কিছু উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ইউরোপের মধ্য ও পূর্বাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলেও বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে সরাসরি আঘাত হানতে সক্ষম আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ইরান এখনও বহু বছর পিছিয়ে আছে বলে মার্কিন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন সক্ষমতা পেতে এক দশক পর্যন্ত সময় লাগতে পারে বলেও পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে ইঙ্গিত ছিল। তবু ট্রাম্প সাম্প্রতিক ভাষণে বলেছেন, ইরান খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে পারবে এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও একই আশঙ্কা প্রকাশ করলেও সময়সীমা নিয়ে ভিন্ন ভাষা ব্যবহার করেছেন। প্রশাসনের ভেতরেই বক্তব্যের এই অসঙ্গতি প্রশ্ন তুলছে।
পরমাণু কর্মসূচি: বোমা কি সত্যিই কয়েক দিনের দূরত্বে
হোয়াইট হাউসের আলোচনাকারী প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ দাবি করেছেন, ইরান মাত্র এক সপ্তাহের দূরত্বে শিল্পমানের বোমা তৈরির উপকরণ পেতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তথ্য এবং মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্য ভিন্ন চিত্র দিচ্ছে।
গত জুনে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের প্রধান তিনটি পরমাণু কেন্দ্র নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহান মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইসফাহানে মজুত থাকা প্রায় ৪৫০ কেজি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ এখনও মাটির গভীরে চাপা পড়ে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেগুলো উদ্ধার করলেও তা ৯০ শতাংশ বিশুদ্ধতায় উন্নীত করে কার্যকর অস্ত্রে রূপ দিতে বহু মাস, এমনকি এক বছরেরও বেশি সময় লাগতে পারে।
মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, বর্তমানে ইরান সক্রিয়ভাবে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে—এমন প্রমাণ নেই। যদিও কিছু অসম্পূর্ণ স্থাপনায় সীমিত কর্মকাণ্ডের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, তবে নতুন পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্র স্থাপনের প্রমাণ মেলেনি। ফোরদো কেন্দ্র এখনও অচল বলে জানানো হয়েছে।
ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি ও রাজনৈতিক বিতর্ক
ট্রাম্পের ভাষণে ইরানের হুমকি তুলে ধরার ভঙ্গি অনেকের কাছে ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের প্রাক্কালের বক্তব্যের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। তখনও গণবিধ্বংসী অস্ত্রের অভিযোগ পরে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল। কংগ্রেসের কয়েকজন সদস্য ইতিমধ্যে সতর্ক করেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ শুরু করার আগে স্পষ্ট ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ জরুরি।
প্রতিনিধি পরিষদের গোয়েন্দা কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট জিম হাইমস বলেছেন, এখনই নতুন যুদ্ধ শুরুর পক্ষে শক্ত কারণ শোনা যায়নি। এমনকি ট্রাম্পের দলীয় কিছু আইনপ্রণেতাও ইরানের দ্রুত বোমা তৈরির দাবিতে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
সামরিক প্রস্তুতি ও উত্তেজনা
এর মধ্যেই পেন্টাগন মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ, যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জড়ো করছে, যা দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় সামরিক সমাবেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই পদক্ষেপ ও তীব্র ভাষণের ফলে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান তার স্বল্প ও মধ্যপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারকে প্রতিরোধমূলক শক্তি হিসেবে দেখছে এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি পরমাণু ইস্যুতে আলোচনার ইঙ্গিত দিলেও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে আলোচনার বাইরে রেখেছেন।












