এখন পরিস্থিতি কেমন?

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, বরিশাল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ময়মনসিংহ, পাবনাসহ আরও কিছু জেলায় শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।

ছোঁয়াচে এ রোগে ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু।

এর মধ্যে তিন ডজনেরও বেশি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে হামে আক্রান্ত হওয়ার কারণেই এই শিশুদের মৃত্যু হয়েছে কি না সেবিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয় বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

মূলত হামের দুই ডোজ টিকা না দেওয়া, শিশুদেরকে মায়ের বুকের দুধ ঠিকমতো পান না করানো, প্রয়োজনীয় কৃমিনাশক ঔষধ না খাওয়ানো এবং অপুষ্টির কারণেই নতুন করে হামের এই প্রকোপ শুরু হয়েছে বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা।

এতদিন শিশুদের বয়স নয় মাস হলে হামের প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হতো। কিন্তু এবছর নয় মাসের কম বয়সি শিশুদেরও হামে আক্রান্ত হতে দেখা যাচ্ছে।

“সাধারণত নয় মাস পূর্ণ হলে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা পায় শিশুরা। কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে যারা আক্রান্ত তাদের প্রায় ৩৩ ভাগ এই বয়সের আগেই আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ নয় মাসের কম বয়সীদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ বাড়ছে,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির প্রধান মোহাম্মদ শাহরিয়ার সাজ্জাদ।

সাধারণত সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় নয় থেকে ১৫ মাস বয়সী শিশুদের হামের দু’টি টিকা দেওয়া হলেও এর অতিরিক্ত হিসেবে প্রতি চার বছর পরপর হামের টিকা দেওয়ার যে বিশেষ কর্মসূচি নেওয়া হয়, ২০২৪ সালে তা হয়নি।

“২০২০ সালে করোনা, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন কারণে হামের টিকাদানের বিশেষ ক্যাম্পেইন হয়নি,” বলছিলেন মি. সাজ্জাদ।

চলতি বছরের শুরু থেকেই এই রোগটির প্রকোপের সম্ভাবনা প্রকাশ পাচ্ছিল। বিশেষ করে জানুয়ারির শুরুতে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও ঢাকার কিছু বস্তিতে রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়ছিল।

এরপর চলতি মাসেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভেন্টিলেশনসহ আইসিইউ সুবিধার অভাবে বেশকিছু শিশুর মৃত্যুর খবরে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে বিভিন্ন জেলার সিভিল সার্জনদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, হামের টিকা থাকলেও যক্ষা, পোলিও, নিউমোনিয়া, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, ধনুষ্টংকারসহ বেশ কয়েকটি রোগের টিকার সংকট রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও সংকটের কথা স্বীকার করেছে।

“আমাদের হেডকোয়ার্টারে টিকার যে স্টক সেটা সন্তোষজনক না। এটাতো আমরা অনেক দিন ধরেই বলছি,” বলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক মি. সাজ্জাদ।

সংকট মোকাবিলায় কী করছে সরকার?বি

আগামী জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে এক মাসব্যাপী হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করার পরিকল্পনা ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।

কিন্তু ইতোমধ্যেই বিভিন্ন জেলায় শিশুদের মধ্যে হঠাৎ সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সেটি এগিয়ে এনে আগামী পাঁচই এপ্রিল জরুরিভিত্তিতে হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার।

যেসব জেলায় হামের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি, টিকা প্রদানের ক্ষেত্রে সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি উপলক্ষ্যে বৃহস্পতিবার থেকে স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করেছে সরকার।

“আমরা আগামী রোববার থেকে ভ্যাক্সিনেশন ক্যাম্পেইন, ইমারজেন্সি ভ্যাক্সিনেশন ক্যাম্পেইন আমরা আগামী রোববার থেকে শুরু করব এবং আমরা ফিল্ড লেভেল স্টাফদের সমস্ত ছুটি (বৃহস্পতিবার থেকে) আমরা প্রত্যাহার করে নিলাম। কোনো ছুটি থাকবে না,” বুধবার সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলন বলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, আক্রান্ত শিশুদের এক তৃতীয়াংশেরই বয়স নয় মাসের কম। সে কারণে হামের প্রথম টিকা দেওয়ার বয়স নয় মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস নির্ধারণ করেছে সরকার।

বিশেষ কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে শুরু করে ১০ বছর বয়সি পর্যন্ত শিশুরা হামের টিকা নিতে পারবে বলে জানানো হয়েছে।

বিশেষ ক্যাম্পেইন পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে ৯০ লাখ ডোজ হামের টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী। টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে সিরিঞ্জের যে সংকটের কথা জানা যাচ্ছিল, সেটিরও সমাধান করা হয়েছে বলে জানান।

এছাড়া হামসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় টিকা কেনার জন্য জন্য নতুন করে ছয়শ’ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।

“যত ভয়াবহভাবে মিজেলস আমাদেরকে আক্রমণ করেছে, আমরা তার তার চেয়ে দ্রুত গতিতে কিন্তু একমোডেট করার চেষ্টা করেছি। কিছু ক্যাজুয়ালিটি হয়েছে। তবে অবশ্যই বলব এটা আমাদের অনেকটা সার্থকতা,” সাংবাদিকদের বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মি.   হোসেন।

বিবিসি নিউজ বাংলা