দশকের পর দশক ধরে ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের মূল কৌশল ছিল মশার সংখ্যা কমানো এবং আক্রান্ত মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া। মশারি, ঘরে কীটনাশক স্প্রে ও কার্যকর ওষুধ—এসব ব্যবস্থায় কোটি মানুষের জীবন রক্ষা হয়েছে। তবু বাস্তবতা হলো, এখনও প্রতি বছর বিশ্বে অর্ধলক্ষাধিক মানুষের মৃত্যু হয় এই রোগে, যার বেশিরভাগই সাব-সাহারান আফ্রিকার শিশু।
এর পাশাপাশি মশার মধ্যে কীটনাশকের প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং ম্যালেরিয়া পরজীবীর ওষুধ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে বিজ্ঞানীরা নতুন করে ভাবছেন—শুধু মশা ধ্বংস করলেই কি ম্যালেরিয়া থামানো সম্ভব?
নতুন ধারণা: মশা থাকবে, কিন্তু রোগ ছড়াবে না
দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীরা একটি বিকল্প পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন—মশাকে এমনভাবে পরিবর্তন করা যাতে তারা আর ম্যালেরিয়ার জীবাণু বহন করতে না পারে। এই ধারণা এখন বাস্তবের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, জিনগতভাবে পরিবর্তিত মশা বাস্তব পরিবেশে ম্যালেরিয়ার পরজীবী দমন করতে সক্ষম। অর্থাৎ এটি শুধু পরীক্ষাগারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বাস্তব সংক্রমণ ক্ষেত্রেও কার্যকর হতে পারে।
‘জিন ড্রাইভ’: প্রযুক্তির মূল রহস্য
সাধারণত কোনো জীব তার জিনের অর্ধেক অংশ সন্তানের মধ্যে দেয়। কিন্তু ‘জিন ড্রাইভ’ এই নিয়ম ভেঙে দেয়। এই প্রযুক্তিতে এমনভাবে জিন পরিবর্তন করা হয়, যাতে তা প্রায় ৯০ শতাংশ বা তারও বেশি সন্তানের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
এর জন্য ব্যবহার করা হয় অত্যাধুনিক জিন সম্পাদনা প্রযুক্তি। এর ফলে কয়েক প্রজন্মের মধ্যেই একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য পুরো মশা জনসংখ্যায় ছড়িয়ে যেতে পারে।
দুই ধরনের কৌশল
গবেষণায় মূলত দুটি পদ্ধতি নিয়ে কাজ চলছে।
প্রথমটি হলো মশার সংখ্যা কমানো। এতে এমন জিন ব্যবহার করা হয় যা স্ত্রী মশার বংশবিস্তার ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। ফলে ধীরে ধীরে মশার সংখ্যা কমে যায়।
দ্বিতীয় পদ্ধতিতে মশাকে জীবিত রাখা হয়, কিন্তু তাদের শরীরে এমন পরিবর্তন আনা হয় যাতে ম্যালেরিয়া পরজীবী তাদের মধ্যে বেড়ে উঠতে না পারে। ফলে মশা কামড়ালেও রোগ ছড়াতে পারে না।
তানজানিয়ার বাস্তব গবেষণা
তানজানিয়ায় পরিচালিত একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় স্থানীয় মশাকে এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যাতে তারা রক্ত খাওয়ার পর শরীরে বিশেষ প্রোটিন তৈরি করে যা ম্যালেরিয়া জীবাণুকে ধ্বংস করে।
গবেষণায় ল্যাবের কৃত্রিম নমুনা নয়, বরং ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত শিশুদের রক্ত ব্যবহার করা হয়। দেখা গেছে, সাধারণ মশায় পরজীবী স্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও পরিবর্তিত মশায় তা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সংক্রমণ ছড়ানোর মতো অবস্থায় পৌঁছাতে পারে না।
কিছু পরীক্ষায় এমনও দেখা গেছে, পরিবর্তিত কোনো মশাই সংক্রমণ বহন করেনি।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই গবেষণায় স্থানীয় পর্যায়েই উন্নত জিন প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আক্রান্ত দেশগুলোকে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
সুবিধা ও ঝুঁকি
মশা ধ্বংস করার পরিবর্তে তাদের পরিবর্তন করা পরিবেশের জন্য তুলনামূলক কম ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ এতে পুরো একটি প্রজাতি বিলুপ্ত করার চেষ্টা করা হয় না।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিভিন্ন ধরনের পরজীবী ও তাদের ভিন্ন ভিন্ন রূপের বিরুদ্ধে কার্যকর জিন তৈরি করা কঠিন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
এই কারণে বিজ্ঞানীরা এমন প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছেন, যা প্রয়োজনে থামানো বা উল্টানো যায়।
চূড়ান্ত বাস্তবতা
এখনও পর্যন্ত কোনো জিনগতভাবে পরিবর্তিত মশা প্রাকৃতিক পরিবেশে ছাড়া হয়নি। এটি করতে হলে পরিবেশগত ঝুঁকি মূল্যায়ন, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন এবং জনগণের মতামত—সবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রযুক্তি একক সমাধান নয়। মশারি, ওষুধ, টিকা, নজরদারি—সবকিছুর সমন্বয়েই ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।
তবে ভবিষ্যতে যদি এটি নিরাপদ ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণিত হয়, তাহলে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এটি হতে পারে একটি শক্তিশালী নতুন অস্ত্র।












