দীর্ঘ জীবন পাওয়ার জন্য বড় কোনো পরিবর্তন সবসময় প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিনের ছোট ছোট কিছু অভ্যাসও শরীরকে সক্রিয় রাখতে এবং দীর্ঘমেয়াদে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, এমনই একটি সহজ অভ্যাস হলো—সম্ভব হলে লিফটের বদলে সিঁড়ি ব্যবহার করা।
প্রাথমিক চিকিৎসা ও ক্রীড়া-চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ হারিস ভাকিলের মতে, সিঁড়ি ব্যবহার করা প্রতিদিনের শারীরিক কার্যক্রম বাড়ানোর একটি সহজ উপায়। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
২০২১ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন পাঁচ তলা সিঁড়ি ভাঙার সঙ্গে কোনো সিঁড়ি না ওঠার তুলনায় যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি ৭ থেকে ৯ শতাংশ কম থাকার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
অল্প অল্প ব্যায়াম, বড় উপকার
চিকিৎসকেরা সিঁড়ি ভাঙাকে ‘এক্সারসাইজ স্ন্যাকিং’ বা দিনের বিভিন্ন সময়ে অল্প সময়ের শারীরিক পরিশ্রমের একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ আলাদা করে দীর্ঘ সময় ব্যায়াম না করেও দিনের বিভিন্ন সময়ে ছোট ছোট শারীরিক কর্মকাণ্ড যোগ হতে পারে।
সিঁড়ি ভাঙার সময় একই সঙ্গে হৃদ্যন্ত্র, ফুসফুস, পেশি, হাড় এবং শরীরের ভারসাম্য ব্যবস্থাকে কাজ করতে হয়। ফলে কোনো বিশেষ যন্ত্রপাতি ছাড়াই এটি শরীরের একাধিক ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখার একটি কার্যকর উপায় হতে পারে।
ক্রীড়া-অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ গিলেম গনজালেস-লোমাসের মতে, দীর্ঘায়ু শুধু একটি নির্দিষ্ট ব্যায়ামের ওপর নির্ভর করে না। বরং প্রতিদিনের অসংখ্য ছোট সিদ্ধান্ত ও অভ্যাস মিলেই দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ভিত্তি তৈরি করে। সিঁড়ি ব্যবহার সেই অভ্যাসগুলোর মধ্যে সহজে যুক্ত করা যায় এমন একটি পদক্ষেপ।
সিঁড়ি ভাঙলে শরীরে কী হয়?
সিঁড়ি ওঠার সময় শরীরের ওজন নিজের পেশিকেই বহন করতে হয়। ফলে এর মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে সক্রিয় হয়।
পেশির শক্তি বাড়ে: সিঁড়ি ভাঙার সময় উরুর সামনের পেশি, নিতম্ব, পায়ের পেছনের পেশি, পিণ্ডলি এবং শরীরের মধ্যবর্তী অংশের পেশিগুলো কাজ করে।
হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী: কয়েক ধাপ সিঁড়ি উঠলেই হৃদ্স্পন্দন দ্রুত বাড়ে। নিয়মিত এমন কর্মকাণ্ড কার্ডিওভাসকুলার সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমানোর সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষণা অনুযায়ী, একটানা সিঁড়ি ওঠাকে মাঝারি থেকে অপেক্ষাকৃত কঠিন মাত্রার শারীরিক পরিশ্রম হিসেবে ধরা যায়। বসে থাকার তুলনায় সিঁড়ি ওঠার সময় অনেক বেশি ক্যালরি খরচ হয়।
ভারসাম্য উন্নত হয়: প্রতিটি ধাপে শরীরকে এক পায়ের ওপর ভর সামলাতে হয়। এতে ভারসাম্য ধরে রাখার ক্ষমতা অনুশীলিত হয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে আগে থেকেই ভারসাম্য ও পেশির সক্ষমতা ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সমন্বয় ক্ষমতা বাড়ে: সিঁড়ি ওঠার সময় পায়ের সঠিক অবস্থান, মস্তিষ্কের নির্দেশ এবং পেশি ও অস্থিসন্ধির সমন্বয় একসঙ্গে কাজ করে।
চিকিৎসকদের মতে, মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে শরীরকে ওপরে তুলতে যথেষ্ট শক্তি প্রয়োজন। তাই অনেকের ক্ষেত্রে এক বা দুই তলা সিঁড়ি উঠলেই হৃদ্স্পন্দন দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
সিঁড়ি উঠতে কষ্ট হওয়া কখন উদ্বেগের বিষয়?
কয়েক তলা সিঁড়ি ওঠার পর হাঁপিয়ে যাওয়া সবসময় অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আগে যেটি সহজে করা যেত, হঠাৎ করে এক তলা সিঁড়ি উঠতেও যদি অস্বাভাবিক কষ্ট হয়, বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত।
এর পেছনে থাকতে পারে শারীরিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, পেশির শক্তি কমে যাওয়া, চলাফেরার সীমাবদ্ধতা, অস্থিসন্ধির ব্যথা বা বাত, ভারসাম্যের সমস্যা কিংবা অতিরিক্ত ওজন। কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্র বা ফুসফুসের সমস্যার সঙ্গেও এমন অসুবিধা সম্পর্কিত হতে পারে।
বিশেষ করে সিঁড়ি ওঠার সক্ষমতা হঠাৎ কমে যাওয়ার সঙ্গে যদি বুকব্যথা, মাথা ঘোরা বা অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট থাকে, তাহলে বিষয়টি উপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কীভাবে শুরু করবেন?
যারা নিয়মিত সিঁড়ি ওঠেন না, তাদের একসঙ্গে অনেকটা করার প্রয়োজন নেই। চিকিৎসকদের পরামর্শ হলো, নিজের শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী ধীরে শুরু করা।
শুরুতে সম্ভব হলে লিফটের বদলে এক বা দুই তলা সিঁড়ি ব্যবহার করা যেতে পারে। শরীর অভ্যস্ত হলে ধীরে ধীরে সিঁড়ি ওঠার পরিমাণ বাড়ানো যায়।
যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তারা দিনের বিভিন্ন সময়ে সিঁড়ি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারেন। একবারে দীর্ঘ সময় সিঁড়ি ওঠার বদলে দিনে কয়েকবার অল্প অল্প করে সিঁড়ি ওঠাও কার্যকর হতে পারে।
তবে হাঁটুর ব্যথা, ভারসাম্যের সমস্যা বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো শারীরিক সমস্যা থাকলে ধীরে এগোনো জরুরি। চিকিৎসকদের মতে, তীব্রতার চেয়ে নিয়মিত হওয়াটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু এক ঘণ্টার ব্যায়ামই যথেষ্ট নয়
দীর্ঘায়ুর কথা উঠলে অনেকে মনে করেন, প্রতিদিন এক ঘণ্টা জিম বা ব্যায়াম করলেই যথেষ্ট। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, দিনের বাকি সময় কীভাবে কাটছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ সময় একটানা বসে থাকার ঝুঁকি শুধু ব্যায়াম করলেই পুরোপুরি দূর হয়ে যায় না। তাই নির্দিষ্ট সময়ে ব্যায়ামের পাশাপাশি সারাদিনের ছোট ছোট নড়াচড়াও গুরুত্বপূর্ণ।
নিয়মিত চলাফেরা শুধু পেশির শক্তি ও সহনশীলতা বাড়াতেই সাহায্য করে না, শরীরের বিপাকীয় বিভিন্ন প্রক্রিয়াকেও সক্রিয় রাখতে পারে। এর মধ্যে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও রয়েছে।
তবে সিঁড়ি ওঠা সবার জন্য একইভাবে উপযোগী নাও হতে পারে। যাদের চলাফেরায় সমস্যা রয়েছে বা হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের কোনো রোগ আছে, তাদের নতুন করে সিঁড়ি ওঠার অভ্যাস শুরু করার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। প্রয়োজন হলে শুরুতে এক তলা অতিরিক্ত সিঁড়ি উঠে পরে লিফট ব্যবহার করার মতো ধীরে ধীরে অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘায়ুর কোনো একক ‘জাদুকরী’ উপায় নেই। কিন্তু প্রতিদিনের জীবনে লিফটের বদলে সিঁড়ি বেছে নেওয়ার মতো ছোট সিদ্ধান্ত শরীরকে নিয়মিত সক্রিয় রাখার একটি সহজ উপায় হতে পারে। আর দীর্ঘমেয়াদি সুস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে এমন ছোট ছোট অভ্যাসই সময়ের সঙ্গে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।












