ব্রাজিল প্রাকৃতিক সম্পদ ও সম্ভাবনায় সমৃদ্ধ একটি দেশ। বিশাল ও ক্রমবর্ধমান তেলের মজুত, বিশ্বের সবচেয়ে বড় নদী আমাজন, বিস্তীর্ণ বনভূমি, জলবিদ্যুৎ, উর্বর কৃষিজমি এবং বিপুল খনিজসম্পদ—সব মিলিয়ে দেশটির অর্থনৈতিক সম্ভাবনা অসাধারণ। প্রায় ২২ কোটি মানুষের সৃজনশীলতা, উদ্যোগী মানসিকতা ও বৈচিত্র্যও ব্রাজিলের বড় শক্তি।
১৯৫০-এর দশকে নতুন রাজধানী ব্রাসিলিয়া নির্মাণের সময় শহরের সড়কগুলোকে উড়োজাহাজের আকৃতিতে সাজানো হয়েছিল। প্রতীকটি ছিল—ব্রাজিল যেন উড্ডয়নের জন্য প্রস্তুত। কিন্তু সাত দশক পরও সেই উড্ডয়ন পুরোপুরি ঘটেনি। বরং গত অর্ধশতকে ব্রাজিলের অর্থনীতি প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর পাশাপাশি বৈশ্বিক গড় প্রবৃদ্ধির তুলনাতেও অনেকটাই স্থবির থেকেছে।
৪ অক্টোবরের সাধারণ নির্বাচনও সেই পরিস্থিতি বদলের বড় আশা তৈরি করছে না। বরং ভোটারদের সামনে থাকা রাজনৈতিক বিকল্পগুলোই দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশার কারণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট Luiz Inácio Lula da Silva—যিনি লুলা নামে পরিচিত—প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ডানপন্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট Jair Bolsonaroর বড় ছেলে Flávio Bolsonaroর সঙ্গে। লুলার বয়স ৮১-এর কাছাকাছি। তিনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে এবং পরিবেশের বিষয়ে তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক অবস্থানে থাকলেও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা কিংবা সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে তার সরকারের সাফল্য সীমিত।
কর সংস্কারের কিছু উদ্যোগ ছাড়া বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংস্কার এগিয়ে নেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় কমানোর প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে লুলার অবস্থানও কঠোর নয়। ফলে তার মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় দেশটি গত প্রায় ২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় সরকারি ঋণের সুদ-সংক্রান্ত বোঝার মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে ৪৫ বছর বয়সী ফ্লাভিও বলসোনারো আরও ডানপন্থী ও জনতুষ্টিবাদী অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য মানুষের দায় অস্বীকার করেন, ভোটিং মেশিনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং লুলা জয়ী হলে নির্বাচনের ফল মেনে নেবেন কি না, সে বিষয়েও ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। সহিংস অপরাধীদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্তও হয়েছে, যদিও তিনি তা অস্বীকার করেছেন।
তার প্রচারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি হলো তার বাবাকে ক্ষমা করে দেওয়া। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাইর বলসোনারোকে ২০২২ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্র এবং লুলাকে হত্যার পরিকল্পনাসহ সংশ্লিষ্ট অপরাধে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বর্তমানে জনমত জরিপে লুলা ও ফ্লাভিওর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ ঘনিষ্ঠ এবং ফ্লাভিওর সমর্থন বাড়ছে। কিন্তু ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় দুটি কাঠামোগত সমস্যা—দুর্নীতি এবং লাগামহীন সরকারি ব্যয়—সমাধানের ক্ষেত্রে দুজনের কারও কাছ থেকেই বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা স্পষ্ট নয়।
ঋণই হতে পারে বড় বিপদের জায়গা
ব্রাজিলের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো সরকারি ঋণ। মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় ঋণের অনুপাত কমানোর সুস্পষ্ট পরিকল্পনা না থাকলে ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় ক্রমেই বাড়তে পারে। এতে ঋণের খরচ বাড়বে এবং উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের জন্য মূলধন সংকুচিত হবে।
সরকারি ব্যয় যত বাড়বে, মূল্যস্ফীতির চাপও তত বাড়তে পারে। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে উচ্চ সুদের হার বজায় রাখতে হবে। কিন্তু ঋণ কমানো এবং সুদের হার নামানোর জন্য সরকারি ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁট প্রয়োজন। সমস্যাটি হলো, ব্রাজিলের সরকারি ব্যয়ের প্রায় ৯২ শতাংশই আইন অথবা অত্যন্ত বিস্তারিত সাংবিধানিক বিধানের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক।
অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে ব্যয় কমানো সহজ নয়। আর প্রবৃদ্ধি শক্তিশালী না হলে সীমিত সরকারি সম্পদ নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হতে পারে।
এর প্রভাব সাধারণ মানুষের মধ্যেও হতাশা তৈরি করছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতি ধীর হয়ে গেলে এবং রাজনৈতিক অভিজাতরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত থাকলে চরমপন্থী রাজনীতির জন্য জায়গা তৈরি হয়।
দুর্নীতি আস্থার সংকট আরও বাড়াচ্ছে
ব্রাজিলের আরেকটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা দুর্নীতি। এটি শুধু অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, রাষ্ট্রের ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরও মানুষের আস্থা দুর্বল করে।
জাইর বলসোনারোর দণ্ড ঘোষণার কয়েক সপ্তাহ পর ‘ব্যাংকো মাস্টার’ নামে পরিচিত একটি কেলেঙ্কারি সামনে আসে, যা দ্রুত দেশটির সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত পৌঁছে যায়। পুলিশি তদন্তে আদালতের ১১ বিচারপতির মধ্যে পাঁচজনের সঙ্গে ওই কেলেঙ্কারির মূল হোতা হিসেবে আলোচিত ড্যানিয়েল ভোরকারোর যোগাযোগের বিষয় সামনে এসেছে।
এ ধরনের ঘটনা জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে সন্দেহ বাড়ায়। এর ফলে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের দায়ে দণ্ডিত জাইর বলসোনারোর ছেলের মতো প্রার্থীদের প্রতি মানুষের সমর্থন বাড়ার ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে।
বিকল্পের জায়গা কোথায়?
এই পরিস্থিতিতে তুলনামূলকভাবে বর্তমান সময়ের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কর্মসূচি দিয়েছেন রেনান সান্তোস। কঠোরপন্থী উদারনৈতিক রাজনীতির এই নেতা ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার ও সরকারি ব্যয় কমিয়ে ব্রাজিলকে বড় শক্তিতে পরিণত করার কথা বলছেন।
কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে তিনি কিংবা অন্য কোনো নতুন মুখ লুলা ও বলসোনারোর রাজনৈতিক সংগঠনের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করতে পারেননি। ফলে ব্রাজিল এমন একটি সম্ভাব্য সংকটের দিকে এগোচ্ছে, যার লক্ষণ অনেকটাই অনুমেয় হলেও রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশ বর্তমান ব্যবস্থার সুবিধা ছাড়তে আগ্রহী নয়।
ফলে বিপুল সম্পদ ও সম্ভাবনায় ভরা ব্রাজিলের ভবিষ্যৎ আরও অন্তত চার বছরের জন্য আটকে থাকতে পারে। তবে দেশটির সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
দেশটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এখনো কার্যকর। ফেডারেল পুলিশ ভোরকারো-সংক্রান্ত আর্থিক কেলেঙ্কারি এবং এর আগে অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের তদন্তে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। সংবাদমাধ্যম এখনো স্বাধীন, সক্রিয় এবং তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী। ব্রাজিলের কূটনৈতিক ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত।
এমনকি নানা সীমাবদ্ধতা ও বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট একজন অভ্যুত্থান-ষড়যন্ত্রকারীকে কারাগারে পাঠাতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।
সংকট কি পরিবর্তনের পথ খুলবে?
ব্রাজিলের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের সূচনা হতে পারে সরকারি ঋণ এবং ঋণের সুদের ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেলে। অর্থনীতি দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরিস্থিতি একটি দুষ্টচক্রে পরিণত হতে পারে—ঋণের বোঝা বাড়বে, ঋণের খরচ বাড়বে, মুদ্রার মূল্য কমতে পারে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত অর্থনীতি মন্দার দিকে যেতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতি ব্রাজিলের পুরোনো অর্থনৈতিক সংকটগুলোর কথা মনে করিয়ে দিতে পারে।
সম্ভবত এমন কঠিন সময় এলেই সাধারণ মানুষ এমন একজন নেতার দিকে তাকাবে, যিনি জনপ্রিয় না হলেও দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে কঠিন সিদ্ধান্তের প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে প্রস্তুত। কারণ ব্রাজিলের সামনে মূল প্রশ্ন শুধু কে প্রেসিডেন্ট হবেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো—প্রাকৃতিক সম্পদ, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় এত সমৃদ্ধ একটি দেশ কবে এমন একটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব পাবে, যে স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধার বদলে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারকে অগ্রাধিকার দেবে।
ব্রাজিলের সম্ভাবনা এখনো বিশাল। কিন্তু সম্ভাবনা বাস্তবে পরিণত করতে হলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ব্যয় সংস্কার, ঋণের বোঝা কমানো, সুদের হার নামানোর সুযোগ তৈরি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আসন্ন নির্বাচন সেই পরিবর্তনের দরজা খুলবে—এমন আশাবাদ করার মতো কারণ আপাতত খুব বেশি নেই।










