ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কংগ্রেস ও বিরোধী দলের এমপিদের বিক্ষোভ মিছিল শেষ পর্যন্ত প্রায় আট ঘণ্টার নাটকীয় অচলাবস্থায় রূপ নেয়। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর একটি মন্তব্যের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয় এবং বিক্ষোভকারীরা আকাশবাণী ভবনের ভেতরে অবস্থান নেন।
সংসদ ভবন থেকে নির্বাচন কমিশনের দপ্তর ‘নির্বাচন সদন’-এর দিকে যাওয়ার পথে পুলিশ মিছিল আটকে দিলে এমপিরা সেখানে অবস্থান নেন। প্রায় ১০টা ৫০ মিনিটে শুরু হওয়া মিছিলের একপর্যায়ে রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রসহ কয়েকজন এমপি ব্যারিকেডের ওপর উঠে পড়েন।
এরপর একে একে বিরোধী দলের অনেক এমপিকে পুলিশ আটক করে বাসে তুলে নেয়। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, কেসি ভেনুগোপাল, অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন ও মনোজ কে ঝা-সহ কয়েকজনকে আটক করা হয়।
তবে রাহুল গান্ধীকে তখনও আটক করা হয়নি। তিনি প্রথমে সংসদের দিকে ফিরে যেতে শুরু করেন। হঠাৎ তিনি জানতে চান, ‘প্রিয়াঙ্কা কোথায়?’ তাকে জানানো হয়, প্রিয়াঙ্কা একটি পুলিশ বাসে রয়েছেন। তখন রাহুল তাকে বাস থেকে বের করে আনতে বলেন এবং মন্তব্য করেন, ‘এভাবে শেষ হতে পারে না।’

রাহুল পরে জানতে চান, সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব কোথায়। অখিলেশও আটক হয়েছেন জানতে পেরে তিনি একজন সহযোগীকে পরিস্থিতি ও পরবর্তী পরিকল্পনা জানাতে বলেন। শুরুতে ইন্ডিয়া গেটের দিকে যাওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও পরে কৌশল বদলান তিনি।
প্রিয়াঙ্কা বাস থেকে নামার পর রাহুল সরাসরি আকাশবাণী ভবনের গেটের দিকে এগিয়ে যান। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে সেখানে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে তার অচলাবস্থা তৈরি হয়। পরে তিনি জোর করে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, কংগ্রেস নেতা চরণজিৎ সিং চান্নি ও দীপেন্দর হুডাও তার সঙ্গে ভবনের ভেতরে ঢোকেন। সেখানে কিছু আকাশবাণী কর্মী রাহুলের সঙ্গে ছবি তুলতে দেখা যায়। পরে পুলিশ এলাকাটি ঘিরে ফেলে।
রাহুলদের উদ্দেশ্য ছিল আকাশবাণী ভবনের একটি গেট দিয়ে নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের দিকে যাওয়া। কিন্তু সেই গেট বন্ধ থাকায় তারা ভবনের ভেতরে একটি বটগাছের নিচে বসে অবস্থান নেন। পরে কেসি ভেনুগোপালসহ আরও কয়েকজন এমপি সেখানে যোগ দেন।
এদিকে কংগ্রেস ও বামপন্থী দলের কয়েকজন এমপি আকাশবাণী ভবনের বাইরে অবস্থান নিয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। জন ব্রিটাস, পি সান্দোষ কুমার, শশীকান্ত সেন্থিল ও শাফি পারাম্বিলসহ কয়েকজনকে পরে আটক করা হয়।
দুপুরের দিকে যুব কংগ্রেস ও এনএসইউআইয়ের কর্মীরাও আকাশবাণী ভবনে ঢোকার চেষ্টা করেন। তারা রাহুল গান্ধীর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও পুলিশ তাদের বাধা দেয়। কংগ্রেসের কয়েকজন এমপি ও রাহুলের সহযোগীরাও ভবনের ভেতরে অবস্থান করছিলেন।

সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে দফায় দফায় স্লোগান চলতে থাকে। তৃণমূল কংগ্রেসের ডেরেক ও’ব্রায়েন ও মহুয়া মৈত্রও পরে রাহুল ও অন্যদের সঙ্গে দেখা করতে আকাশবাণী ভবনে যান।
সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে পুলিশ আটক প্রক্রিয়া শুরু করলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। কংগ্রেস এমপিরা রাহুলকে ঘিরে মানবঢাল তৈরি করার চেষ্টা করেন। পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়। কেসি ভেনুগোপাল এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে তাকে ধাক্কা দেওয়া হয় এবং পরে পুলিশ তাকে টেনে সরিয়ে নেয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত রাহুল গান্ধীকেও আটক করা হয়। তবে পুলিশ তাকে বাসে তোলার পরও তিনি আটক এড়ানোর চেষ্টা করেন এবং একপর্যায়ে বাসের জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রায় আট ঘণ্টার এই ঘটনাপ্রবাহে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রতিবাদ নতুন মাত্রা পায়। সাধারণ একটি প্রতিবাদ মিছিল থেকে শুরু হওয়া কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত আকাশবাণী ভবনে অবস্থান, পুলিশের সঙ্গে টানাপোড়েন এবং একাধিক নেতাকে আটকের ঘটনায় পরিণত হয়।












